ভাবী আ’লীগে, দেবরের ঝোঁক বিএনপিতে

নিজস্ব প্রতিনিধি : দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই শিবিরেই যোগাযোগ রেখে চলছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। বিএনপি যদি শেষ সময়ে এসে নির্বাচন না করে, তাহলে পরিস্থিতির শুভ লক্ষণ দেখছে না জাতীয় পার্টির ভোট পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ। চতুর্থবারও সরকারকে সমর্থন দিয়ে ভোটে যাবে কি না, এ নিয়ে পর্দার আড়ালে হিসাব বুঝে নিচ্ছে দলটি। অতীতে সারা দেশে দলটির ৩০০ আসনে নির্বাচন করার প্রার্থী থাকলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তাতে ভাটা পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বর্তমানে জাপার একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, তারা সরকারের বলয় থেকে বের হতেও চেষ্টা করছে। আরেকটি অংশ সরকারের সঙ্গেই থাকতে চাচ্ছে। দেবর-ভাবির দূরত্বের বিষয় নির্বাচনের আগে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। ভাবি আওয়ামী লীগে থেকে গেলেও দেবরের বিএনপিতে আসার গুঞ্জন রয়েছে।
জাপার নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দলীয় ঝামেলা নিয়ে এখনো ভুগছে দলটি। একটি পক্ষ দলের চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরের বাইরে বলয় তৈরির চেষ্টা করছে। তারা দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। অন্যদিকে জি এম কাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনা ও নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে দলে নতুন বলয় তৈরি করেছেন। এ দূরত্বের মধ্যে নির্বাচনের আগে কোনো বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। দলের একাংশ ভেঙে বিএনপির সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রওশন এরশাদ আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকলেও জি এম কাদের বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে ছুটে যেতে পারেন-এমন আশঙ্কাই বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার জাতীয় পার্টিকে কাছে টানতে চাইছে বিএনপি। এরই মধ্যে দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে হয়েছে পর্দার আড়ালে কয়েক দফা আলোচনা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দলীয় বৈঠকের অপেক্ষায় রয়েছেন জি এম কাদের। গত বছর বিএনপির ইফতার মাহফিলে জাতীয় পার্টির নেতারা অংশগ্রহণ করেন। একইভাবে জাতীয় পার্টির ইফতারেও শামিল হন বিএনপির নেতারা। এ ছাড়া গত সপ্তাহে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও আড্ডায় বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে এক টেবিলে দেখা গেছে। এতে গুঞ্জন উঠেছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি কি আওয়ামী লীগ ছেড়ে জোট বাঁধবে বিএনপির সঙ্গে! এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এই সরকারের অধীনে রাতের বেলায় ভোট হয়েছে। তার এই বক্তব্য ক্ষমতাসীন দলকে ত্যাগ করার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে চায়। হিসাব বুঝে ভোটের মাঠেও থাকে চাঙা। বর্তমানে ২৬ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সংসদে দাপটের সঙ্গে রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদের ভোটে বিএনপির ভরাডুবি হলেও জাপা মনোনীত ২২ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে চারজন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যও রয়েছেন। এবার সেই দলটি সরকারের সঙ্গে থাকলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী শিবিরে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছে।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি বলেন, যেকোনো নির্বাচনই হোক না কেন, জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করবে। ইলেকশনের জন্য যদি কোনো আন্দোলনও করা প্রয়োজন পড়ে, দলটি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা-ই করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে মতভেদ ভুলে ঐক্য নিয়ে সামনে এগোনোর লক্ষ্যেই জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন এই সরকারের পরিবর্তন চায়। অনেক রাজনৈতিক দলও চায়। আর জাতীয় পার্টি সব সময় হিসাব করেই পা বাড়ায়। যেদিকে লাভ সেদিকেই তারা থাকবে। রাজনৈতিক সম্মানে কিছু বৈঠক হচ্ছে, তারাও ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, এবার জোটের বিষয়ে নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে। জনগণ পরিবর্তন চায়। দলীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনের আগেই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত-আমরা কাদের সঙ্গে থাকব।