ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি মারা গেছেন

*একনজরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ৫ দশক

* বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন প্রণব মুখার্জি : রাষ্ট্রপতি

*প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

ঠিকানা অনলাইন : উপমহাদেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় (৮৪) মারা গেছেন। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় এ খবর নিশ্চিত করেছেন বলে ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে।

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ গত ১০ অগাস্ট থেকে দিল্লির আর্মি রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির আগের দিন রাতে বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। পরীক্ষা করাতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে। হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি করোনায় আক্রান্ত। বিষয়টি তিনি নিজেই টুইট করেছিলেন।

হাসপাতালে ভর্তির দিনই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অস্ত্রোপচার করা হয়। তারপর থেকেই তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নজরদারি করছিলেন। সোমবার সকালেও আর্মি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা। কোমায় থাকা প্রণবকে রাখা হয়েছিল ভেন্টিলেশন সাপোর্টে।

কনজরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ৫ দশক
১৯৬৯ সালে মেদিনীপুর বাই ইলেকশনে প্রচারের জোরে প্রণব মুখোপাধ্যায় একা হাতে জিতিয়ে দিয়েছিলেন ভি কে কৃষ্ণ মেননকে। তারপরই ইন্দিরা গান্ধীর নজরে আসেন তিনি। কার্যত ইন্দিরা গান্ধী হাত ধরেই জাতীয় কংগ্রেসে প্রবেশ তাঁর।
১৯৬৯ থেকে ২০০২ টানা রাজ্যসভার সদস্য বাংলার প্রণব মুখোপাধ্যায়। ইন্দিরা ঘনিষ্ঠ প্রণব মুখোপাধ্যায় ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা ক্যাবিনেটের কেন্দ্রীয় ডেপুটি শিল্প উন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন।

১৯৭৫-৭৭ যখন দেশে এমারজেন্সি তখনও ইন্দিরা ক্যাবিনেটে সক্রিয় ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৭ সালে দেশে ক্ষমতা বদলের পর “জনতা সরকার” শাহ কমিশন নিযুক্ত করে সেখানেও নাম জড়িয়েছিল তাঁর।

১৯৭৯ সালে রাজ্য়সভায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডেপুটি নেতা হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৮০ সালে জাতীয় কংগ্রেসের রাজ্যসভার প্রধান নেতা।

১৯৮২ থেকে ৮৪, একাধিক ক্য়াবিনেট পদের পরে অর্থমন্ত্রী হন প্রণব মুকোপাধ্যায়। তাঁর আমলেই ভারতের প্রথম IMF লোনের শেষ কিস্তি চুকিয়েছিল ভারত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে মনমোহনের নিযুক্তিপত্রে সই করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়।

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি রাজীব গান্ধীর থেকে অনেক অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইন্দিরা পুত্র। রাজীব আমলে ক্যাবিনেট থেকে বাদ পড়েন তিনি, তাঁকে পাঠানো হয় পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সামলাতে।

১৯৮৬ সালে নিজের দল প্রতিষ্ঠা করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। নাম দেন রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস। তিন বছর পরেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর মধ্যস্থতায় ফের জুড়ে যায় দুই কংগ্রেস। ঘরওয়াপসি হয় তাঁর। পরে প্রণব মুখোপাধ্যাকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর উত্তর ছিল, “৭, আরসিআর কখনওই আমার গন্তব্য ছিল না।” ৭ আরসিআর প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের ঠিকানা।

রাজীব গান্ধী মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে ফের বদল আসে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে। নরসীমা রাওর আমলে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসাবে ইন্ডিয়ান প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। নরসীমার সময়েই ১৯৫৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিদেশমন্ত্রকের দায়িত্বভার সামলেছেন তিনি।

সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সারা ভারত জাতীয় কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
২০০০ সালে ফের পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তারপর টানা ১০ বছর বহাল ছিলেন এই পদে।
জঙ্গীপুর লোকসভা থেকে জিতে ২০০৪ সালে লোকসভার নেতা হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ২০০৯ সালে ফের সেই কেন্দ্র থেকে জেতেন তিনি। ২০০৪ সালেই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন প্রণব মুখোপাধ্যায় কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস থেকে প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন।
মনমোহন জমানায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। প্রতিরক্ষা, ফের অর্থ এবং বিদেশ মন্ত্রী ছিলেন তিনি।
২০১২ সালে সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে রাষ্ট্রপতি ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি হন প্রণব মুকোপাধ্যায়। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই মেয়াদ শেষ হয় তাঁর নতুন রাষ্ট্রপতি হন রাম নাথ কোবিন্দ।
সম্মাননা:
দেশ:
২০০৮ সালে পদ্ম বিভূষণ
২০১৯ সালে ভারতরত্ন
বিদেশ:
২০১৩ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা
২০১৬ সালে ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য আইভরি কোস্টের গ্র্যান্ড ক্রস , আইভরি কোস্ট
২০১৭ সালে অর্ডার অব মাকারিওস ৩ এর গ্র্যান্ড কলার, সাইপ্রাস

অন্যান্য প্রাপ্তি:
Euromoney ম্যাগাজিনের সার্ভে অনুযায়ী ১৯৮৪ সালে সারা বিশ্বের সেরা অর্থ মন্ত্রী
২০১০ সালে ইমার্জিং মার্কেটস পত্রিকা অনুযায়ী ২০১০ সালের ফাইন্যান্স মিনিস্টার অব এশিয়া
দ্য ব্যাঙ্কার অনুযায়ী ২০১০ সালের ফাইন্যান্স মিনিস্টার অব ইয়ার

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন প্রণব মুখার্জি : রাষ্ট্রপতি
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সোমবার এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রণব মুখার্জি ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখার্জির ভূমিকা আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত তৈরিতে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তিনি বলেন, প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হল।রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি, উপমহাদেশের বরেণ্য রাজনীতিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে শোকে আপ্লুত ও স্মৃতিকাতর হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও শেখ হাসিনার নিজের বহু স্মৃতি প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) এক শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন রাজনীতিবিদ ও আমাদের পরম সুহৃদ হিসেবে প্রণব মুখার্জির অনন্য অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। আমি সবসময় মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতে নির্বাসিত থাকাকালীন প্রণব মুখার্জি আমাদের সবসময় সহযোগিতা করেছেন। এমন দুঃসময়ে তিনি আমার পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন এবং যেকোনো প্রয়োজনে আমার ছোট বোন শেখ রেহানা ও আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেশের ফেরার পরও প্রণব মুখার্জি সহযোগিতা এবং উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধু। যেকোনো সংকটে তিনি সাহস যুগিয়েছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারাল একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে আর বাংলাদেশ হারাল একজন আপনজনকে। তিনি উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।