ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্যাঁচে বাংলাদেশ

হাসিনাতে ভারতীয় গণমাধ্যমের ইউটার্ন ॥ ঢাকার মতিগতিতে মনঃক্ষুণ্ন দিল্লি

বিশেষ প্রতিনিধি : দিল্লি-বেইজিং দ্বন্দ্বের এক কঠিন সময়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থান ভারতের কাছে সুখকর ঠেকছে না। উপরন্তু রহস্যজনক ও চাতুরীপূর্ণ ঠেকছে। ভারত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধু। চীন উন্নয়ন ও কৌশলগত পার্টনার। কিন্তু আধিপত্যের এই বিশ্ব রাজনীতিতে হিসাবে গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। হাল বিশ্ব কূটনীতিতে বলা হচ্ছে, সমুদ্র যার শাসনে, সে-ই বিশ্ব শাসক। বিশ্বের সমুদ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারত মহাসাগর। বিশ্বের কনটেইনার শিপমেন্টের অর্ধেক এবং সমুদ্রবাহিত তেল বাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগ অতিক্রান্ত হয় এই মহাসাগর দিয়ে। যে কারণে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ভারত গত ৭ বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ তার মিত্রদের নিয়ে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে এই মহাসাগরটিতে। এতে আধিপত্যে একটুও ছাড় দিতে চায় না চীন।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানে বন্দর নির্মাণ আর মালদ্বীপ, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলছে দেশটি। এমনিতেই চীন-মার্কিন বাণিজ্যিক যুদ্ধের দামামার মধ্যে জুলাইতে ঘটেছে একাধিক ঘটনা। এছাড়া উইঘুর ও হংকংয়ের পরিস্থিতির কারণে চীনের ওপর নতুন করে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ওই দুটি ঘটনায় জড়িত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। করোনাভাইরাস নিয়েও দেশ দুটির মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ভারত-চীন-মার্কিন সম্পর্কের এ প্যাঁচ থেকে নিস্তার পাচ্ছে না বাংলাদেশও। আঞ্চলিক-উপআঞ্চলিক কূটনীতিতে ভৌগোলিক অবস্থানের সুবাদে কৌশলে সব পক্ষকে আয়ত্তে রাখা গেলেও এ ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র-কারো পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করা সম্ভব নয় বাংলাদেশের, যা এত দিন দক্ষতার সঙ্গে করে আসছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্র হিউস্টনে চীনের কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীনও চেংডুতে মার্কিন কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ওই কনস্যুলেট অফিসটি গোয়েন্দাকাজে ব্যবহৃত হয়। এ রকম উত্তাল সময়েও কৌশলের অন্ত করছেন না শেখ হাসিনা। সবার গুডবুকে থাকতে চান। আয়ত্তও করতে চান। ভারতের কাছে এটি পছন্দের নয়।
চীনকে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক নেওয়া পদক্ষেপসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক এ রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাইলেও পারছে না বাংলাদেশ। হিমালয় অঞ্চলে গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারত উত্তেজনার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ভারত মহাসাগর তথা দক্ষিণ চীন সাগর। অবস্থার অনিবার্যতায় এখন নতুন আঙ্গিকে এশিয়ান ন্যাটোর কথা বলা হচ্ছে। আর এর টার্গেট চীন। ভারত সে রকম কিছুই চায়। বাংলাদেশের চাওয়া ভিন্ন। কাউকে প্রতিপক্ষ করতে চান না শেখ হাসিনা। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মনোভাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ভারতের মনোভাব প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে নানাভাবে। বিশেষ করে, ভারতের গণমাধ্যমগুলোর কোনো কোনোটির ভূমিকা সম্প্রতি ইউটার্নের মতো।
স্পর্শকাতর কিছু জল্পনাও প্রচার করছে তারা। ভারতের বলয় থেকে নেপালের মতো বাংলাদেশও সরে যাচ্ছে-এমন একটি প্রচারণা চলছে ভারতের কিছু প্রভাবশালী পত্রিকায়। দুঃখজনকভাবে টেনে আনা হচ্ছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকেও। কোনো কোনোটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও আক্রমণাত্মক তথ্য চালাচালি করা হচ্ছে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির ঘোষণায় ক্ষুব্ধ ভারতীয় মিডিয়া। চীনের ‘খয়রাতি’ গ্রহীতা বলে বাংলাদেশকে শুধু হেয় করেনি, চ্যালেঞ্জও ছুড়েছে। এত দিন তারা কোনো ঘটনায় বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করলেও শেখ হাসিনাকে ঊহ্য রেখেছে। সরাসরি সমালোচনা করেনি। সম্প্রতি সেটা শুরু করেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে শেখ হাসিনার ফোনালাপের খবরের পর তা আরো বেড়েছে। শেখ হাসিনা পাকিস্তানপন্থী উপদেষ্টাদের ওপর ভর করছেন বলে অপপ্রচারটাও বেশ জোরালো। বাংলাদেশে চীনা প্রকল্প বাস্তবায়ন বেগবান হলেও সরকার ভারতেরগুলো পিছিয়ে দিচ্ছে, এমন অপপ্রচারও বাদ দিচ্ছে না। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না-এমন উষ্মাও প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। ২৬ জুলাই এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে ‘শেখ হাসিনা লক্ষণরেখা পার হয়ে গেছেন’ বলে ইঙ্গিতবহ মন্তব্য করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রিত বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে নিয়েও ভারতীয় পত্রপত্রিকায় নানামুখী উদ্দেশ্যমূলক তথ্যের ছড়াছড়ি। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া চেক দিতে কৌশল নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত দিতে পারে। ‘টু চেক বাংলাদেশজ চায়না ড্রিফট, ইউএস মে ডিপোর্ট মুজিব কিলিং সাসপেক্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া নির্ভর করছে চীনের মর্জির ওপর। এই হাইপ্রোফাইল খুনিকে হাতে পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে লেগে আছে শেখ হাসিনার সরকার। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ভারতের নেপথ্য ভূমিকাতেই শেখ হাসিনার ক্ষমতায় গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নতি হয়েছে। এর অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হলো ভারত চায় ঢাকাকে চীনাদের খপ্পর থেকে রক্ষা করতে।
এর আগে নাটকীয়ভাবে ভারত থেকে এনে কার্যকর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মাজেদের ফাঁসি। তাকে গ্রেফতারে ভারতীয় গোয়েন্দারা বাংলাদেশকে সহায়তা করেছেন বলে খবর প্রকাশ করেছে বলে সংবাদ প্রচার হয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই। গত ৬ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল তাকে। ডেকান হেরাল্ডসহ ভারতের গণমাধ্যমগুলো বলেছে, ক্যাপ্টেন মাজেদকে কৌশলে দেশে আনা এবং গ্রেফতারে ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দারা যৌথভাবে কাজ করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদকে খুঁজে বের করে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে একাধিকবার অনুরোধ করেছেন। মনমোহন সিং শেখ হাসিনাকে এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাস বাস্তবায়ন করেছেন নরেন্দ্র মোদি।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার নেপথ্যে-
গত কিছুদিন ধরেই চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাণিজ্যনীতি, করোনাভাইরাস, গুপ্তচরবৃত্তির মতো বিষয়ও রয়েছে। ২৪ জুলাই শুক্রবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে হিউস্টনে চীনের একটি কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা পদক্ষেপে চীনও চেংদুতে একটি মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধ করেছে। কিছুদিন ধরে ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী হওয়া সম্পর্কে সর্বশেষ আঘাত দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি কনস্যুলেট বন্ধের ঘটনা। বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির দেশের মধ্যে এই বৈরিতার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতির নেপথ্যের কারণ কী, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিদেশি মিশন বন্ধের ঘটনা অপ্রত্যাশিত কোনো বিষয় নয়। তবে এটা বিরল ও নাটকীয় পদক্ষেপ, যা থেকে ফিরে আসা কঠিন। কয়েক মাস ধরে করোনাভাইরাস, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, পাল্টাপাল্টি ভিসা নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতিকদের ভ্রমণে নতুন নিয়ম, বিদেশি সংবাদদাতা বহিষ্কারের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ধারাবাহিক বিবাদে সর্বশেষ কঠিন পদক্ষেপ নিতে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে। চলতি মাসের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) পরিচালক ক্রিস্টোফার ওরেইয়ের বক্তব্যে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে এই কঠোর ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি চীন এক দশক ধরে গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এটা রুখতে তারাও তদন্তের গতি বাড়িয়েছে, যদিও চীন এটাকে ‘বিদ্বেষপ্রসূত অপবাদ’ হিসেবে নাকচ করে দেয়। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের হঠাৎ কঠোর অবস্থানের বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ সংশয় প্রকাশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবামার সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের এশিয়াবিষয়ক শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড্যানি রাসেলের মতে, নভেম্বরে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখেই মার্কিন রাজনীতিতে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবে এটা করা হতে পারে।
এ ছাড়া নিজ দেশে করোনা মহামারি ঠেকাতে একেবারে ব্যর্থ ট্রাম্প ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য দোষ চীনের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন। তবে বড় কোনো সংঘাত বা সামরিক পদক্ষেপে জড়াতে চান না ট্রাম্প। আবার চীনও কোনো যুদ্ধ চায় না।