ভালবাসার ধ্রুপদ মন্ত্রে শুদ্ধ হোক ধরণী

সামনেই ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালবাসা দিবস। প্রায় ১৮শ’ বছর আগের ঘটনা আজও অমলিন। বিশুদ্ধ প্রেমের আখ্যান হয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে ভ্যালেনটাইন’স ডে’র ইমেজ। দেশে দেশে মহাসমারোহে উদযাপিত হচ্ছে ভ্যালেনটাইন’স ডে। তবে বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ভ্যালেন্টাইন’স ডে নিয়ে যতটা উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনায় মাতামাতি করতে দেখা যায়, ভালবাসার মূল চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে অশান্ত বিশ^টাকে শুদ্ধ ও শান্তিময় করে তুলতে আগ্রহ ততটা দেখা যায় না। ভালবাসার মর্মবাণী নিয়ে কেউ আর এখন মাথা ঘামায় না।
আমেরিকার লেখক জন আপডাইক একসময় ভ্যালেনটাইন’স ডে নিয়ে বলেছিলেন- ‘উই আর মোস্ট এ্যালাইভ হোয়েন উই আর ইন লাভ অ্যা- উই আর মোস্ট এ্যালাইভ অন ভ্যালেনটাইন’স ডে।’ অনেকেই মনে করে থাকেন, ভ্যালেনটাইন কোন কাল্পনিক চরিত্র। কল্পনায় ভালবাসার মহত্ব আরোপ করে এই চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু রোমান ক্যাথলিক চার্চ কাল্পনিক ভ্যালেনটাইনকে স্বীকার করে না। রোমান ক্যাথলিক চার্চের মতে, সেন্ট ভ্যালেনটাইন কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়। রীতিমত রক্তমাংসের একজন সামাজিক মানুষ। তিনি ছিলেন একজন ধর্ম প্রচারক এবং ভালবাসার দেবতা-স্বরূপ। তৃতীয় শতাব্দীতে এই ভালবাসা ছড়িয়ে দিতে গিয়েই শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে তার মৃত্যু হয় রোমে।
ভ্যালেনটাইন’স ডে নিয়ে আজও বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত আছে। রোমের স¤্রাট ক্লডিয়াস দ্বিতীয় মনে করতেন, বিয়ে করলে কিংবা ভালবাসায় পড়লে সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়বে, তাদের মনোস্খলন ঘটবে। তাই তিনি সৈনিকদের বিয়ে অথবা নারীসঙ্গ নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেনটাইন স¤্রাটের এই আদেশ মানতে পারেন না। তিনি ভালবাসাহীন মানবজীবন এবং ভালবাসাহীন কোন পৃথিবী ভাবনায় নিতে না পেরে যুবক-যুবতীদের ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের বিয়েতে উৎসাহিত করতে থাকেন। স¤্রাট ক্লডিয়াস ভ্যালেনটাইনের এই ঔদ্ধত্য মানতে না পেরে তাকে জেলে পুড়েন এবং মৃত্যুদ- দেন।
ভ্যালেনটাইন’স ডে’র আরেকটি মতবাদে বলা হয়েছে- স¤্রাট ক্লডিয়াস ভ্যালেনটাইনকে যে জেলে অন্তরীণ রাখেন, সেই জেলারের মেয়ে ছিল অন্ধ। ভ্যালেনটাইন বিস্ময়করভাবে সেই মেয়েটির চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনেন! অনেকেই মনে করেন, মেয়েটিকে ভ্যালেনটাইন ভালবেসেছিলেন। এবং ভালবাসার শক্তির চমৎকারিত্বেই মেয়েটি দৃষ্টি ফিরে পায়! আরেক মতে, ভ্যালেনটাইন যে মেয়েটির প্রেমে পড়েন, মৃত্যুর পূর্বে তিনি ঐ মেয়েটিকে একটি প্রেমপত্র লিখেন এবং তার নিচে স্বাক্ষর করেন- ‘তোমারই ভ্যালেনটাইন।’
এর বাইরে ভ্যালেনটাই’স ডে নিয়ে আরও একটি মতবাদ রয়েছে। ৫ম শতাব্দীতে অগ্নি উপাসকরা জমির উর্বরতার প্রতীক হিসেবে অত্যন্ত ধুমধাম করে ১৫ ফেব্রুয়ারি পালন করতেন। বিষয়টি ভালভাবে নিতে পারতেন না তৎকালীন পোপ সেলাসিয়াস প্রথম। ১৫ ফেব্রুয়ারিকে ম্লান করে দিতে তিনি তার আগের দিন, ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেনটাইন’স ডে পালন প্রবর্তন করেন।
মত যেটিই সঠিক হোক বা গ্রহণযোগ্য, সবটার মধ্যেই সেই শ্বাশত বাণী- ভালবাসা এবং ভালবাসা। ধর্মযাজক ভ্যালেনটাইন পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস করতেন মানুষে-মানুষে ভালবাসায়। প্রায় সব ঐতিহাসিক ঘটনাতেই ভিন্নতা পাওয়া যায় তথ্য-উপাত্ত এবং ব্যাখ্যায়। তবে ভ্যালেনটাইন’স ডে’র ভিন্নতার মধ্যেও যে ঐক্যতানের ঝংকার হৃদয়ে প্রবেশ করে, তা কেবলই ভালবাসার অমীয় বাণী। এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ৪৯৬ খৃস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। ইতিহাস স্বীকৃতি দেয় যে, সেন্ট ভ্যালেনটাইন ভালবাসার প্রাচীন বীর। এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দার্শনিক সক্রেটিস যেমন প্রাণ দেন, তেমনি ভালবাসার স্বীকৃতি আদায় করতে গিয়ে প্রাণ দেন সেন্ট ভ্যালেনটাইন।
ভ্যালেনটাইনস ডে নিয়ে, জানা যায়, রোমানদের মাঝে আরও অনেক গল্প চালু আছে। গল্প যত রকমই থাক, নিশ্চিত সে সবের শেষ কথাও ভালবাসা। আজকে ভ্যালেনটাইন’স ডে’র রঙ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। পাশ্চাত্যের ইউরোপ-আমেরিকার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ঢুকে পড়েছে একদা রক্ষণশীল বাংলাদেশের অন্দর-মহলেও। বাংলাদেশ আজ আধুনিক ভ্যালেনটাইন’স ডে’র প্লাবনে প্লাবিত। বাঙালি জীবন আদি ভালবাসা- লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চ-ীদাস-রজকীনীর উপাখ্যান রসে ভরপুর হয়ে আছে। তবে বাঙালি-মনে ভালভাবে ভালবাসার রঙ মাখিয়ে দেন মূলত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। অবশ্য শরৎ বাবুর প্রেম কেবল কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়!
অবশেষে বাঙালি জীবনে ভালবাসার ঢেউ বইয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। রবীন্দ্রনাথ বললেন- ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি-এই সুরে কাছে দূরে- জলে স্থলে বাজায়, বাজায় বাঁশি-ভালোবাসি, ভালোবাসি।’ নজরুল সাম্যের গান গেয়ে বাঙালিকে মানবিক ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ করলেন। মানবিক ভালবাসার বীজমন্ত্রেই সকল ভালবাসার অঙ্কুরোদ্গম। শুদ্ধ-সুন্দর করে বাঁচার নামই ভালবাসা। নিজের জীবনের প্রতি ভালবাসা, অন্যের জীবনের প্রতিও। বড় বড় ঋষি-মনীষী সবাই মানুষকে ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ভালবাসা থাকলে যুদ্ধ থাকে না, ধ্বংস থাকে না। দুর্ভিক্ষ, মহামারি থাকে না। ভালবাসা থাকলে শান্তি সভ্যতা মানবতা ন্যায়নিষ্ঠা সমুন্নত থাকে। যারা মানুষকে ভালবেসেছেন তারাই মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। মানুষকে ভালবেসেই মানুষ জীবন দিতে পারেন। বন্দিত্ব অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে সত্য স্বাধীনতা আনতে পারেন। ভালবাসা বন্ধনে জড়ায়। শত্রুকে মিত্র বানায়। ভালবাসা মানুষকে সাহসী করে। বীর বানায়। বাংলাদেশে যে ভাষার লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সবই ভালবাসার ফসল।
তবে ভালবাসাও লালন করতে হয়। পরিচর্যা লাগে ভালবাসা সজীব ও পুষ্ট রাখতে। অমানবিকতার চর্চায় ভালবাসা ক্লিষ্ট হয়। আজ বিশ্বব্যাপী নির্মল সেই ভালবাসার আকাল। বাংলাদেশেও ভালবাসার বৈরী বাতাস। এখন মুখে ভালবাসা, আর মনে ঘৃণা-হিংসা-বিদ্বেষ। এখন ভালবাসার অমৃতের কথা বলে ঘৃণার হলাহল পরিবেশন করা হয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সেই ভালবাসার স্থলে এখন কেবল উদ্দামতা, উন্মাদনা, সোরগোল। ভালবাসার আসল রঙ এবং মানবিক মূল্যবোধ অনেকটাই বিবর্ণ এবং ফিকে। তাকে হরণ করেছে বিকৃত নকল ভালবাসা। মানবিক মূল্যবোধের জায়গা দখল করে নিয়েছে বাণিজ্যিক মূল্যবোধ।
এখন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ভালবাসা ভুলে হুল্লোরে মাতামাতি চলছে। শত শত কোটি ডলারের কার্ড আর ফুল বিক্রি হচ্ছে। সে কার্ডের রঙে ভালবাসার রঙ নেই। ফুলে নেই ভালবাসার সৌরভ। বেনিয়াদের পকেট ভরছে, ভালবাসা মহিমান্বিত হচ্ছে না।
এবারের ভ্যালেন্টাইন’স ডে’তে আমাদের প্রার্থনা হোক মানুষের ভেতর প্রকৃত ভালবাসা ফিরে আসুক। প্রেমিক ভ্যালেন্টাইনের ভালবাসার চেতনা নিয়ে যেন আমরা এবার বিশ্ব ভালবাসা দিবস উদযাপন করতে পারি। এবারের ভ্যালেন্টাইনস ডে’তে যেন আমরা একটি ক্ষুধামুক্ত, যুদ্ধমুক্ত সুন্দর মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার শপথ নিতে পারি। সবার জীবনে সফল ও সার্থক হোক বিশ্ব ভালবাসা দিবস।