ভাসমান সেতু ডুবিয়ে দিয়েছে দুর্ভোগ

যশোর : রাজনীতিসহ দেশের অধিকাংশ অঙ্গনে যখন ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে বিভেদের কালরেখা, যখন ক্রমশই আমরা প্রত্যেকে একা হয়ে যাচ্ছি, পরস্পরের মাঝে তুলে দিচ্ছি দেয়াল, তখন সব বিভেদ ভুলে গিয়ে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ রেখে একসঙ্গে পথচলার জন্য পথ তৈরি করে এক অনবদ্য নজির স্থাপন করেছেন প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলের মানুষ। দশে মিলে যে অসম্ভবকেও জয় করা সম্ভব এ আপ্তবাক্যটি তারা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন কৃতকর্মে। আর সেই সফলতার সংবাদ ছাপা হয়েছে বিলেতের বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা বিবিসিতেও।
গ্রামের নাম ঝাঁপা। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার এই গ্রামটির তিন পাশে বাঁওড়। পাশের কোনো গ্রামে কিংবা জেলা-উপজেলায় যেতে হলে পৌনে এক কিলোমিটার প্রস্থের বাঁওড় পাড়ি দিতে হয় নৌকায়। রাত ১০টার পর কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ১৫ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত গ্রামটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাঁওড়টি ইজারা দিয়ে সরকার বছরে অর্ধকোটিরও বেশি টাকা আয় করলেও গ্রামবাসীর কষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নেয়নি কখনো। সমস্যা সমাধানে স্বপ্ন দেখেনি স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক দলের নেতা। তাতে দমে যাননি এলাকাবাসী। সরকারের কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে তারা নির্মাণ করেছেন এক হাজার ফুট লম্বা একটি ভাসমান সেতু। সেতুর মূল কাঠামোসহ ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন দিন-রাত চলছে রঙের কাজ। অভিনব সেতুটি একনজর দেখতে নৌকা-ট্রলার ভাড়া নিয়ে শত শত মানুষ এখন সেখানে ভিড় করছেন।
ভাসমান সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, নদীতে প্লাস্টিকের ড্রামের তৈরি ফেরির ওপর ভারী ড্রেজার মেশিন রেখে পানি-বালু
উত্তোলনের দৃশ্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। পরে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা এলাকায় সেনাবাহিনীর তৈরি ভাসমান সেতু এবং ভারতের বনগাঁয় ছোট আকৃতির ভাসমান সেতু আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। একপর্যায়ে ইন্টারনেটে সার্চ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্মিত ভাসমান সেতু দেখে যাচাই-বাছাই করি। পরে পরিচিত কয়েক প্রকৌশলী আর স্থানীয় ওয়ার্কশপে কথা বলে আমরা সেতু তৈরির স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা অর্থায়ন। এ বিষয়ে চলতি গত বছরের ১৯ জানুয়ারি গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে আলোচনাসভায় মিলিত হই। সে দিনই সবাই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। এর পর আরও কয়েকটি সভা করে অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
তিনি বলেন, ‘সেতু তৈরির উদ্দেশ্যে ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ৬০ সদস্য মিলে ৫০ লাখ টাকার ফান্ড গঠন করে বাজার থেকে প্লাস্টিকের ড্রাম-রড কিনে বাঁওড়ের পাশে কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে কিছু লোক হতাশাজনক মন্তব্য করেছিল। তবে আমরা ভেঙে পড়িনি। আশা করছি, এ সপ্তাহেই চালু হবে দেশের বৃহত্তম এ ভাসমান সেতু।
ভাসমান সেতু তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থানীয় রাজগঞ্জ বাজারের বিশ্বাস ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, এক হাজার ফুট লম্বা এবং চার ফুট চওড়া এ ভাসমান সেতু নির্মাণে ৮৩৯টি প্লাস্টিকের ড্রাম, ৮০০ মণ লোহার পাত এবং ২৫০টি লোহার অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভাসমান সেতুটিকে একই স্থানে আটকে রাখতে দুই পাশ দিয়ে ৬০টি নোঙর বসানো হচ্ছে। ইতিপূর্বে এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও উদ্যোক্তাদের পরামর্শে তিনি এ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন বলেও জানান।
৫০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ভাসমান সেতু উন্মুক্ত হলে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইক ও নসিমন চলাচল করবে।
ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক লিটন হোসেন বলেন, সেতুটি গ্রামবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে করা হয়েছে। বাণিজ্যিক চিন্তা নেই। এত দিন নৌকায় পারাপারের জন্য মাঝিদের সপ্তাহে ৫ টাকা করে নগদ এবং বছরে এক মণ করে ধান ও ইচ্ছামাফিক মৌসুমি ফসল দিতেন গ্রামবাসী। একই খরচে গ্রামবাসী সেতুটি ব্যবহার করতে পারবেন। বাইরের এলাকার লোকজন নৌকায় পারাপারে যে টাকা দিত, এখনো তা-ই দেবে।
তিনি জানান, ঘাটে তিন পুরুষ ধরে দায়িত্বে থাকা চার মাঝি ওই টাকা সংগ্রহ করবেন। এতে মাঝিদের নির্দিষ্ট বেতন এবং সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে। তেমনি ধীরে ধীরে উদ্যোক্তারা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাবেন। সেতু নির্মাণের ব্যয় উঠে আসার পর এলাকাবাসী বিনামূল্যেই সেতুটি ব্যবহার করতে পারবেন। ঘাটের মাঝি অসিম দে বলেন, সেতুটি নির্মাণে তারাও আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন।
ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মেহেদী হাসান টুটুল বলেন, যশোরের জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাদের যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছেন। তবে সেতু নির্মাণে আমরা সরকারি সহযোগিতা চাইনি।