ভিন্ন রকম ঈদ: নেই কোলাকুলি নেই চাঁদ রাত

নিউইয়র্ক : জ্যাকসন হাইটসে ঈদের আগের দিন কেনাকাটা। ছবি-ঠিকানা।

ঠিকানা রিপোর্ট : করোনার বিধি নিষেধের কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের পর এবার ঈদুল আজহায়ও ভিন্ন রকমের ঈদ উদযাপন করলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ঘরে বসে এবং অনেকটা নিরানন্দেই দিন কেটেছে সবার।
ঈদুল ফিতরের সময় নামাজ আদায় করতে পারেনি মুসলমানরা। তখন নিউইয়র্কে ছিল করোনার মহাতাণ্ডব। সেই তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল অনেকের জীবন। অনেকেই হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জনকে। ঐ সময় কেউ যেন কাউকে চিনলেও এড়িয়ে যেতেন। যদিও অধিকাংশ মানুষ ঘরের মধ্যেই স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী ছিলেন। লকডাউনের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে পারেননি। অধিকাংশ মসজিদই ছিল বন্ধ। যেসব মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হতো সেসব মসজিদেও তালা লাগানো ছিল। ঈদুল ফিতর শেষে ঈদুল আজহা আসার আগ পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটি প্রায় খুলে দেয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে খাওয়ার নিয়ম নেই। সভা- সমাবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে।
নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র সীমিত আকারে ধর্মীয় উপাসনালয় খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সুযোগই গ্রহণ করেছে নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকার মসজিদগুলো। তারা নিউইয়র্ক সিটির ঘোষিত নিয়ম মেনেই ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিটি ঈদ জামাতেই ব্যবহার করা হয় মাস্ক। সেই সাথে বজায় রাখা হয় সামাজিক দূরত্ব। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে গিয়েই মসজিদগুলোতে বেশি বেশি করে জামাত হয়েছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের ঈদ ছিল অন্যরকম। এবারের ঈদে আগের মতো ছিল না কোনো উচ্ছ্বাস। তবে কোরবানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উৎসাহ ছিল লক্ষণীয়।
প্রতি বছরই ঈদের নামাজ শেষে সবাইকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন। এবার ঈদ জামাত শেষে যে যার মতো করে চলে গেছেন। অন্যান্য বছর নামাজে আসলেই অন্য রকম আনন্দ হতো। সবাই কুশল বিনিময় করতেন। কেউ কেউ বসে আড্ডা দিতেন। নামাজের সময় একই লাইনে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করতেন। এবার দূরত্ব বাজায় রেখেই সবাই নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে নীরবে সবাই চলেও গেছেন। ঈদের আনন্দ বা উচ্ছ্বাস কী তা যেন কেউ বুঝতেই পারেননি। মনে হচ্ছিলো নামাজ আদায় করতে পেরেছেন তাতেও আনন্দ। অন্যদিকে বিধি নিষেধের কারণে এবার ঈদে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। আবার করোনার ভয়ে নামাজে অন্যান্য বছরের তুলনায় মুসল্লিও ছিল কম। গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসে কয়েকদিন ধরে চলতো ঈদ আনন্দ, ঈদ উৎসব। এবার তা ছিল না। নিউইয়র্কে ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল চাঁদ রাত এবং মেহেদি রাত। চাঁদ এবং মেহেদি রাতে জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা এবং ব্রঙ্কসে হাঁটা যেত না। প্রবাসে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা কলেজ পড়–য়া ছাত্রীরা সকাল থেকে রাস্তার দুই পাশে টেবিল নিয়ে বসে পড়তেন। দুপুর থেকেই লোকজন বাড়তে থাকতো। আশপাশের স্টেট থেকেও লোকজন আসতেন হাতে মেহেদি লাগাতে এবং বাজার করতে। এক সাথে দুই কাজই হয়ে যেত। এমনও অবস্থা হয়েছে যে, লোকজনের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে পুলিশ রাস্তাও বন্ধ করে দিত। এবার সেই চিত্র দেখা যায়নি।
বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণেই মেহেদি লাগানোর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তারা বলেন, সিটির নিয়ম হচ্ছে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। হাতে মেহেদি লাগাতে গেলে তা করা সম্ভব নয়। তার উপরে কার করোনা আছে, কার নেই তাও বুঝার উপায় ছিল না। তবে বেশ কয়েকটি টেবিল নিয়ে বেশ কয়েকজনকে পোশাক বিক্রি করতে দেখা যায়। এই সব পোশাকের দোকানে মানুষের ভিড়ও ছিল। এই বছর এমনিতেই করোনা কাল, তার উপরে ছিল মানুষের ভীতি, যে কারণে সবাই ভিন্ন রকম ঈদ পালন করলেন। সেই সাথে যে যার বাসাতেই ঈদ করেছেন, যাননি আত্মীয়- স্বজনের বাসাতেও। অন্যান্য বছর নতুন প্রজন্মের শিশু -কিশোরদের আনন্দ ছিল বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়া, এবার তাও হয়নি। ছোটদের ঈদেও ছিল না খুব একটা আনন্দ।
বেশ কয়েকজন ঠিকানাকে জানান, প্রবাসে সাধারণত তারা এই ধরনের ঈদ এর আগে কখনো উদযাপন করেননি। সবাই নতুন প্রজন্মের শিশু কিশোরদের নতুন পোশাক পরিয়ে ঈদ জামাতে নিয়ে আসতেন। আবার কেউ কেউ দেখানোর জন্য তাদের সাথে নিয়ে যেতেন ফার্মে। যেখানে কোরবানির পশু কোরবানি করা হয়। তারা পশু কোরবানি দেখে খুবই আনন্দ পেত। এবারের ঈদে তারা সব কিছু থেকেই বঞ্চিত ছিল। বলতে গেলে তারা বাসার মধ্যেই বন্দী ছিল। একই অবস্থা ছিল নারীদেরও। তারাও কোথাও বেড়াতে যেতে পারেননি। বাসায় থেকে শুধু রান্নাবান্না করেছেন। তাদের কাছেও ঈদ ছিল অন্য রকম।