ভিন গোলার্ধের ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান: এক ভাষা ও সংস্কৃতির সকল বাঙালির ঐক্য চাই

ঠিকানা রিপোর্ট: নাম থেকে শুরু করে আয়োজনের আঙ্গিক- সব কিছুতেই ব্যতিক্রমের ছোয়া। ‘ভিন গোলার্ধ’ নামটি আর দশটা চেনা জানা সংগঠনের সঙ্গে মেলে না। কোন আঞ্চলিকতার গন্ধ নেই। নেতৃত্বের লড়াই নেই, বিদ্বেষ নেই, ভাঙ্গা ভাঙ্গি নেই। মাতৃভাষা বাংলা বাংলা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির জন্য আকুতি, প্রবাসের বৈরী হাওয়ায় তাকে আঁকড়ে ধরে থাকা এবং এগিয়ে নেয়ার কল্যাণ আকাংখা ব্যতিত আর কিছু নেই। এরা দুইবাংলার মানুষ-বাঙালি। যারা পাসপোর্ট ভিসা, সীমানা, কাঁটাতার সব ডিঙিয়ে নোঙ্গর গেড়েছেন উত্তর আমেরিকার বন্দরে বন্দরে। তাই তারা দূর প্রবাসে গড়ে নিয়েছেন ‘ভিন গোলার্ধ’। বাংলা ভাষা চর্চা, শিল্প সাহিত্য, সংস্কতির আয়োজনে তারা নিবেদিত। সংগঠনের কাঠামো নেই, কর্ম আছে। সে কর্ম সর্বব্যাপি প্রশংসিত। আছেন বদিউজ্জামান নাসিম, পার্থ চৌধুরী, তাপসদের মত কিছু মানুষ যারা এর আয়োজনের পেছনে শ্রম দেন,সময় দেন, মেধা দেন, আর উজার করে দেন ভালবাসা। এদের প্রথম পরিচয় মানুষ। দ্বিতীয় পরিচয় বাঙালি। এই তাদের আসল পরিচয়। এরপর কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান। কেউ পশ্চিম বাংলার, কেউ বাংলাদেশের।
তাদেরই সেই ভিন গোলার্ধের একটি অনুষ্ঠান হয়ে গেল বস্টনের সেন্ট মাইকেল প্যারিস সেন্টারে। দিনটি ছিল ৩ আগস্ট, শনিবার। হল প্রায় ভর্তি নারী-পুরুষ। সময় ধরে অনুষ্ঠান শুরু। উপস্থাপনায় জয়তী ও মুন। খুব সংক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক ভাষায় ভিন গোলার্ধে, তাদের ক্রিয়াকর্ম, চিন্তাভাবনার কথা ব্যক্ত করেন বদিউজ্জামান নাসিম ও বিশিষ্ট বিদ্যুত পার্থ চৌধুরী। এ দু’জনকে বলা হয় ভিন গোলার্ধের প্রাণ পুরুষ। এই আয়োজনে সহযোগী হিসেবে আরও ছিলেন লিখন-এর কর্মকর্তারা।
বদিউজ্জামান নাসিম তার লিখিত বক্তব্যে সকলকে স্বাগত জানিয়ে বাংলার পঞ্চ কবির অন্যতম অতুল প্রসাদের একটি গানের বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, আমরা শুনতে পাই-‘ঘর বনাম বিশ্বঘরের’ কথা। এই বিশ্বঘরই চিরকাল ঘর ছাড়া করেছে মানুষকে। এবং আমরাও একদিন ওই একই টানে পা ফেলেছি ঘরের বাইরে। পৌঁছে গেছি গ্রাম থেকে গঞ্জে, দেশ থেকে অন্য মহাদেশে। মূলতঃ শ্রেয়তর জীবনের গোপন অভিলাষে আমরা ফেলে এসেছি স্বদেশ-ফেলে এসেছি বাংলার ফাল্গুন দিন,বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকার-বহু পশ্বাতে।
অতঃপর পশ্চিম পৃথিবীর তীব্র বিপুল আলোহাওয়া স্পর্শ রাখে আমাদের যাপিত জীবনে। কিছুটা বদলেও যায় জীবনের বহিরংগ-কখনো অনিচ্ছায়, কখনো অনুরাগে। ওই স্পর্শই ধীরে ধীরে আরও প্রবল হয়ে একদিন পৌঁছে যেতে চায়-আমাদের সত্তার গভীরতর স্তরে। আর তখনই টের পাই অদৃশ্য শিকড়ের টান। টের পাই-রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল, লালন, হাছন রাজা-পরানের গহীন গভীরে।
এই দূর প্রবাসে- দুই বাংলার অভিবাসীরা-বেঁচে থাকতে চাই আমাদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতির উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। বেঁচে থাকতে চাই-আমাদের অভিন্ন ভাষা-সঙ্গীত এবং পঙ্কক্তিমালার নির্দোষ অহঙ্কার নিয়ে। চাই, দুই বাংলার প্রবাসীদের ঘিরে একটি অভিন্ন মঞ্চ, আন্তঃযোগাযোগের একটি নিষ্কম্প সেতু। এই সুরটিই বেজে উঠুক-“দূর পরবাসে-দুই বাংলা” এই শিরোনামের আজকের আয়োজনে।
জনাব নাসিম শেষ করেন এ কথা বলে যে, দুই বাংলার প্রবাসীজনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হোক মিলিত কর্মকান্ডের একটি শক্তিমান সাংস্কৃতিক বলয়। সাহিত্যের প্রশ্নে-সঙ্গীতের প্রশ্নে-এই দূর দেশেও আমরা যেনো এ-পার-ওপার নামের রাজনৈতিক মানচিত্রের সংকীর্ণতার মধ্যে বন্দী হয়ে না থাকি। আমাদের অন্তরে যেনো জেগে থাকে লালনের সেই অমোঘ গান-‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখী/কেমনে আসে যায়?’ আমাদের স্মৃতিতে আমৃত্যু জেগে থাকুক রবীন্দ্রনাথ- ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার/পরানসখা বন্ধ “হে আমার’।
পার্থ চৌধুরী বলেন, বাংলা একটা শব্দ,একটা ভাষা, একটা চেতনা, একটা আবেগ, একটা ঐতিহ্য, একটা স্মৃতি, একটা দেশ। দুই বাংলার ইতিহাস আমাদের অস্থি মজ্জায়, আমাদের পূর্বসূরীদের হাসি গল্পে, আলাপে, ধমকে। ‘তাদের স্মৃতিচারণে মনের প্রস্তর ফলকে যেন গ্রাম বাংলার এক একটা খোদাই করা ছবি।
পার্থ চৌধুরীর কথায়, ‘একখানা ঘর দুই খানা হয়, দেয়াল দিলে মাঝে/কোন দেয়ালে আকাশ ভাগ হয় তাইতো বুঝি নাজে।” আমার অভিধানে গঙ্গাও আমার মা, পদ্মাও আমার মা।’ তাইতো বারে বারে ফিরে যাই ইতিহাস ভুগোলের কালাপানি পেরিয়ে আমার স্মৃতিপটে আঁকা সেই পুরনো বাংলায়। তিনি শেষ করেন স্বরচিত কবিতা ‘দূর প্রবাসে এক বাংলা’ দিয়ে।
দুই বাংলার স্বজনদের ‘ভিন গোলার্ধ’ নিয়ে আরও কথা বলেন, ঠিকানার প্রধান সম্পাদক মুহম্মদ ফজলুর রহমান, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অমিতাভ লালা।
সঙ্গীতে ছিলেন নিউইয়র্কের শফিউল্লাহ চৌধুরী হারুন, মহীতোষ তালুকদার, শান্ত নাগ, জুয়েল আলম, অঞ্জুমান চৌধুরী মুক্তা, অয়ন মুখার্জী, মৌলি লালা, ইরফান আহমেদ, বিদ্যুৎ রহমান,স্বপ্না রায়, সুমাক্ষী দাস,রাহুল রায় ও সুভাশীষ মুখার্জী। ছড়া পা ও কবিতায় মঞ্জুর কাদের, রাকা দত্ত, মৌ, নিলয়, মুখার্জী। ড্রামাতে দীপক দেব এবং ব্যাক স্ক্রিনে মেহেদী ইমাম।
সহযোগিতায় ছিলেন, ড. মনিষা রায়, ড. গৌরী দত্ত, সায়েমা খান, সচীন রায়, বিদ্যুৎ রায়,শান্তনা রায়, সৈয়দ নুরুজ্জামান, রীতা সরকার, ইলোরা, প্রিয়তা, মনির সাজি, জিয়াউল হাসান।
অনুষ্ঠানটির নিটোল আয়োজন ও চেতনা ভুলবার নয়।