ভেজাল দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?

বর্তমান বাংলাদেশ বলতে গেলে ভেজাল আর দূষণের সাগরে নিমজ্জিত। ভেজালযুক্ত পানি, খাদ্যদ্রব্য, শাক-শব্জি, ফল-মূল এমনকি ওষুধে সমগ্র বাংলাদেশ সয়লাব হয়ে গেছে। আর্দশ খাদ্য নামে অভিহিত দুধও আজ অখাদ্য প্রায়! শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর সবই দূষণে ভরা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি-বাকরি, ব্যাঙ্ক-বীমা, শিক্ষা ব্যবস্থা, চিন্তা-চেতনা, রাজনীতি সর্বত্রই দূষণের অবাধ রাজত্ব। সর্বমুখী দূষণের উপদ্রবে জনজীবন অতিষ্ঠ। মারাত্মক দূষণে রাজধানী ঢাকা আজ বসবাসের অযোগ্য নগরী। বাংলাদেশ সর্ব প্রকার দূষন ভ‚ষনে, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, ভ‚টান, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়েও অনেক এগিয়ে। এককথায় যাবতীয় দূষণের অভয়ারণ্য বাংলাদেশ।

আমরা সকলেই জানি, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তাই পানির অপর নাম জীবন। আর এ জীবন বাঁচাতে বিষেশত: ঢাকার মানুষ কি ধরনের পানি পান করছে ? পত্র-পত্রিকায় সাম্প্রতিক প্রকাশিত ঢাকা ওয়াসার সেবা ও ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের কেচ্ছা-কাহিনী এবং হাই কোর্টের রুল জারির মাধ্যমে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ওয়াসার অজুহাত ঢাকায় ভ‚স্তরের পানি নিচে নেমে নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বুড়ি গঙ্গা আজ মৃত প্রায়! বুড়ি গঙ্গা নদী পার হওয়ার সময় আজকাল নাকে-মুখে রুমাল চাপায়ও কড়া দুর্গন্ধ বন্ধ হয় না। বুড়ি গঙ্গা এখন আর এক উপাখ্যান, ইতিহাস ও অধ্যায়। বছরের পর বছর ধরে রাজধানীবাসী খাবার পানির জন্য হাহাকার করে, খালি কলস মিছিল হয়, অনশন হয়। কখনো ছবিতে দেখা যায় খালি কলস হাতে মানুষ দীর্ঘ সারিতে পানির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখা-লেখি হয়, কিন্তুু সমস্যার কোন সুরাহা আর হয়না। পানির অভাব লেগেই থাকে। সমস্যা সমাধানে বিগত চল্লিশ বছরেও নেয়া হয়নি কোন উপযুক্ত ও টেকশই র্দীঘ মেয়াদী ব্যবস্থা। বিদেশী লোনের টাকা, জনগণের ট্যাক্সের টাকা অনিয়ম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় অপচয় হয়। হয়না কেবল পর্যাপ্ত সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যব¯হা, ঘোচেনা পানির অভাব। কাজেই, আর সময় ক্ষেপন না করে জনগুরুত্বপূর্ণ সর্ম্পক বিষয় বিবেচনায় এখাতটিকে সরকার আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাদিকার দিবে, সমস্যাগুলো সমাধান করবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।

আর ভেজালযুক্ত এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে হয়, বিদেশে চিকিৎসায় যে কোন একটি বা দুটি ওষুধ দেয়া হোকনা কেন, তা দ্রুত যথাযথ কাজ করে। মোদ্দাকথা গুণগত মান ও পরিমাণ ঠিক থাকলে যে ফল দেয়ার কথা, ঠিক তাই পাওয়া যায়। অথচ বাংলাদেশে চিকিৎসকগণ
ভেজাল দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন? রোগীকে এক গাদা ওষুধ খাওয়ার পরার্মশ দিয়ে থাকেন? অনেকের ধারণা, ওষুধে ভেজাল থাকায় আবার কখনো রোগ ঠিকমত চিহ্নিত না করতে পারার কারণেও চিকিৎসকগণ উক্ত পন্থা অবলম্বন করেন! ভাবখানা এমন – যেন কোন না কোন একটা ওষুধে কাজ তো হবেই! আর আমরা অধম জনগণ জীবন বাঁচানোর তাগিদে গোগ্রাসে তা ঘিলতেই থাকি! অথচ, দেশের ডাক্তারগণ সরব হয়ে ভেজাল ওষুধ, ভেজাল ফল-মূল খাদ্যদ্রব্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় আসেন না, কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেন না। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও দূষণ যতবেশি, রোগ ততবেশি, রোগী বেশি। অতএব, ডাক্তার আর ক্লিনিকের যত রমরমা ব্যবসায়! ভেজালের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান যে পরিচালিত হয় না, তা নয়। তবে তা অতি নগণ্য। কেবল রমজান মাস এলে রীতিমত ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে বিভিন্ন কতৃপক্ষ। কিন্তুু, সরব ঘোষণা দিয়ে ভেজালকারীদের সর্তক করে অভিযান কেন? আবার বছরের অন্যান সময় নীরব ঢিল-ঢালা কার্যক্রম চলে কেন? অভিযান চালাতে হবে সাঁড়াশি এবং প্রতিনিয়ত যখন-তখন। তবেই না একটা সুফল আশা করা যায়।

আমরা অনেকেই জানি, বাংলাদেশে রোগ ও রোগীর তুলনায় চিকিৎসক সংখ্যা অনেক কম, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অপ্রতুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের পেশা আর আন্তরিক ও মানবিক নেই, চিকিৎসা সেবা খাত এখন প্রকট ভাবে বাণিজ্যিক খাত হয়ে গেছে। আর সরকারও যেন র্নিবিকার, কঠোর হস্তে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুুতকারী ও বিক্রেতাদের দমনের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করেছে না। মানুষের জীবন বলে তো কথা! মানুষ তার সর্বস্ব দিয়ে টাকা খরচ করেও চিকিৎসা পেতে ও বাঁচতে চায়। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাবে বিত্তবান এলিট শ্রেণী ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন ও তাদের সন্তানেদের অনেকেই বিদেশে নামী-দামী হাসপাতালে সরকারি খরচে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। সঙ্কট যাই থাক, চিকিৎসা পরিষেবা প্রার্থী সাধারণ মানুষ যেন সঠিক চিকিৎসা সেবা পান, তার নিশ্চয়তা সরকার নিশ্চিত করবেন। সাধারণ মানুষ যেন কোন অবস্থতায় কোন চিকিৎসা সেবা থেকে আর বঞ্চিত না হয়। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রতিনিয়ত প্রতিটি সেবাস্তরে অভিযান চালাতে হবে, কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিয়ে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুুতকারী ও বিক্রেতাদের দমন করতে হবে। আর চিকিৎসকগণ তাদের পেশাদারিত্বে আন্তরিক সেবার মনোভাব দেখিয়ে তার দায়িত্ব পালন করবেন, এটাই সর্বসাধারণের বড় আশা।

শব্দ ও বায়ু দূষণ এখন দেশের বড় বড় শহরে বড় রকম সমস্যা আকারে দেখা দিয়েছে। এর যন্ত্রণা-যাতনা আর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সরকারের চিন্তা-বাভনা খুব একটা আছে কিনা সন্দেহ। জনগণের দেয়া ট্রাক্স-ভ্যাটের টাকায় সরকারের সরকাররি কর্মকর্তা আমলা-মন্ত্রীরা থাকেন বিলাশ বহুল সাউন্ড প্রুফ বাড়িতে। তারা রাস্তায় চড়েন হাই-ফাই সাউন্ড প্রুফ এসি গাড়িতে, অফিস কক্ষও তথইবচ। অতএব, তারা শব্দ দূষণের কবলে পড়েন না, দূষিত বায়ু তাদের নাকে ঢোকে না। তাই, এ ব্যপারে তাদের মাথা ব্যাথাও নেই বললেই চলে। যতসব সমস্যা যেন কেবল অধম শহরবাসীদের ভোগর জন্য, আর ত্যাগের জন্য। এরা র্দুভোগ ভোগ করবে, আবার তার জন্য ত্যাগও করবে! হায়রে দুর্ভাগা দেশের দুর্ভাগা মানুষের ভাগ্য! অথচ, আমরা সকলেই জানি, এ দুর্ভোগ কেবল হ-য-ব-র-ল প্রকিৃতির এবং রাস্তায় চলাচলের অনোপযোগী যানবাহন ব্যবসায় নিয়োজিত একশ্রেণীর সুবিধাভোগী লোভী মানুষের সৃষ্ট। আর এই দূষণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত অদক্ষ ও বেপরোয়া সব গাড়ি চালকগণ। মানুষই বায়ু ও শব্দ দূষণ ঘটিয়ে মানুষকে পেষণ করে যন্ত্রণা দিচ্ছে, মারছে। এর দায় কি বিআরটিএ, ডিসিসি (উত্তর ও দক্ষিন) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়? তাদের কি করার কি কিছুই নেই? ঢাকা শহরকে বসবাসের অযোগ্য হতে প্রকারান্তরে তারা কি সাহায্য করছে না?

একজন অদক্ষ অসুস্থ মদ্যপ কিভাবে গাড়ি চালকের লাইসেন্স পেতে পারে? গাড়ির ইঞ্জিন অনেক পুরাতন, সমস্যাযুক্ত, কালো ধোঁয়া বের হয়, এ ধরনের গাড়ি রাস্তায় চলাচলের ফিটনেস সার্টিফিকেট পায় কিভাবে? এর উত্তর কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন। জনগণ ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়, দিচ্ছে এবং দিবে। তাতে আপনাদের বেতন-ভাতা আরাম-আয়েস বিলাসিতা হয় ও হবে। বিনিময়ে তারা শুধু কাঙ্খিত সেবা চায়, তাদের প্রাপ্য চায়, নাগরিক সুবিধা চায়, অধিকার চায়, তারা কারো দয়া-দাক্ষিণ্য চায় না। তাদের অবহেল করবেন না, শহুরে জীবনের ন্যায্য পাওয়ানাটুকু তাদের দিন। নতুবা, বঞ্চিতদের শ্লোগান আর হাহাকারে একদিন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠবে, পরিস্থতি আরো ঘোলাটে হযে উঠবে। তার আগেই, শব্দ ও বায়ু দূষনকারীদের বিরুদ্ধে অপনারা কঠোর হন, সকল ক্ষেত্রে সবার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করুন। আইনের শাসন জারি করুন, সুশাসন নিশ্চিত করুন। তাহলেই আমরা আশার আলো দেখতে পাব। অচিরেই একদিন দেখব ভেজাল ও দূষণ সমাজ থেকে উধাও হয়ে গেছে। মানুষ শহরগুলোতে প্রাণখুলে দম নিতে পারবে, বসবাসের সপ্ন দেখতে পাবে।
ঢাকা, বাংলাদেশ।