ভোজ না দিলে বিয়ে নয়

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : সামরিক দিক দিয়ে বিশ্বের এক পরাশক্তিতে পরিণত দেশ ভারত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিপুল অগ্রগতি লাভ করেছে। কিন্তু সেই ভারতেরই কোনো কোনো রাজ্যে বিভিন্ন উপজাতির লোকেরা বিবাহ ছাড়াই সংসার করছে বছরের পর বছর। তারা এতই হতদরিদ্র যে, বিয়ের ভোজ দিতে পারে না, আর সেজন্য তাদের বিয়েও হয় না। এ বিস্ময়কর ঘটনার ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দি টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ভারতের ঝাড়খÐ রাজ্যের জুমলা জেলার চরকাতনগর গ্রামের রাজু মাহলি ও মানকি দেবী ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক সাথে ঘর করছেন। হাঁটু পর্যন্ত দারিদ্র্যে নিমজ্জিত এ দম্পতি তাদের বিয়ের ভোজের আয়োজন করতে পারেননি। তাই তারা তাদের বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতি পাননি। বিয়ের স্বীকৃতি পেতে হলে তাদের সমাজে বিয়ের ভোজের আয়োজন করা অত্যাবশ্যক। অবশেষে গত ১৪ জানুয়ারি ৪০ বছর বয়সে আরো ১৩২ জনের সাথে ‘নিমিত’ নামে একটি এনজিওর উদ্যোগে আয়োজিত গণবিবাহ অনুষ্ঠানে তারা চ‚ড়ান্ত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তারা সবাই এত দরিদ্র যে, বিয়ের অনুষ্ঠানের অত্যাশ্যকীয় অংশ হিসেবে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে তারা খাওয়াতে পারেননি।

ঝাড়খÐে ওরাঁও, মুন্ডা ও হো উপজাতির মধ্যে বিবাহ ছাড়া দম্পতির বসবাস সাধারণ ব্যাপার। কোনো জোড়া যদি বিয়ের খরচ জোগাড় করতে না পারে তারা একত্রে মিলিত হয় ও সংসার জীবন শুরু করে। স্থানীয় ভাষায় তাদের ‘ধুকুয়া’ বলা হয়। নারী তার পছন্দের লোকের সাথে বাস করার জন্য সমাজের অনুমোদন পায়। কিন্তু স্ত্রী বলে আখ্যায়িত হওয়ার পরিবর্তে সে ‘ধুকুনি’ নামে অভিহিত হয় যার অর্থ এমন নারী যে বিয়ে ছাড়াই সংসার করছে। এ বিবাহের আয়োজনকারী এনজিও বলে, বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে তাদের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হিসেবে।

মাহলি বলেন, আমি ছোট এক খÐ জমি চাষ করি। আমার সঙ্গিনীকে বিয়ে করার মত টাকা আমার ছিল না। আমাদের একটি কিশোর ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। এনজিও ‘নিমিত’ যখন আমাদের বিয়ের কথা বলল, আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম।

‘নিমিত’-এর সচিব নিকিতা সিনহা ১২ জানুয়ারি বলেন, ‘ধুকুয়া’ নারীরা যদিও পুরুষের মতই পরিবারের অংশ; কিন্তু তাদের বা তাদের সন্তানদের কোনো অধিকার বা দেখানোর মতো কোনো সরকারি দলিল নেই। আমরা ২০১৬ সালে এ ধরনের ২১ জন দম্পতি ও ২০১৭ সালে ৪৩ জন দম্পতির গণবিবাহের আয়োজন করি। এ বছর দম্পতিদের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ হয়েছে।

এ গণবিবাহে উপস্থিত ছিলেন রাহুল টেটি। তিনি তার ছেলের বিয়ে দেখতে এসেছিলেন, তার হাতে ধরা ছিল আট মাস বয়সী নাতনি। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামে ধুকুয়াদের সন্তানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে না বা তাদের বিবাহ হয় না। তাদের নারী সঙ্গিনী যেকোনো অর্থেই তাদের স্ত্রী; কিন্তু তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে গণ্য করা হয়, তাদের সন্তানদের সাথে ব্যবহার করা হয় সমাজচ্যুতদের মতো।

সর্বশেষ গণবিবাহে বিভিন্ন ধর্মের দম্পতি ছিল। ৭৬ জন দম্পতি ছিল ঐতিহ্যবাহী সামা ধর্মের, ৩৬ জন ছিল হিন্দু ও ২০ জন ছিল খ্রিষ্টান। তাদের বাড়ি খুন্তি ও গুমলা জেলার বিভিন্ন বøকে। প্রতি দম্পতিকে ১০ জন করে অতিথি আনার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

বাসিয়া গ্রামের বুদ্ধিশ্বর গোপ আনুষ্ঠানিকভাবে তার ৪ বছরের সঙ্গিনী উর্মিলা দেবীকে বিয়ে করেন। তিনি বলেন, ভাত ও মাংস অথবা হাড়িয়ার (পচানো ভাতের তাড়ি) ভোজ ছাড়া গ্রামের মাথারা কোনো বিয়েকে স্বীকৃতি দেয় না। আমরা যে এখানে এসেছি ও এভাবে বিয়ে করছি, তাতে তারা খুবই অসন্তুষ্ট।

১২ বছরের সাংগাইন মানঝাইন তার সঙ্গী পুরুষকে বিয়ে করেছেন। তিনি বলেন, আমার পুরুষ পঙ্গু। আমাদের কোনো টাকা-পয়সা নেই। গ্রামের মাথাদের ভোজ খাওয়াতে না পারলে আমাদের বিয়ে হবে না। এক বছর আগে কর্তৃপক্ষ আমার দ্বিতীয় সন্তানকে তাদের নিরাত্তাধীনে নিয়েছে।

আরো ছাড়া বিবাহ ছাড়া বাস করতে বাধ্য হয় তাদের মধ্যে রয়েছে : ১. গারাসিয়া। এ উপজাতির বাস রাজস্থান ও গুজরাটে। তারা অধিকাংশই চাষি ও দিনমজুর। তাদের ছেলেমেয়েরা কিশোর বয়সেই বন্ধু খুঁজে নেয় ও একত্রে থাকতে শুরু করে। যদি তারা ভোজের আয়োজন করতে পারে তবেই তাদের বিয়ে হয়। ২. ডাং এ উপজাতির বাস গুজরাটে। অধিকাংশই সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে বাস করে। যখন ভোজের আয়োজন করতে পারে তখন তাদের বিয়ে হয়।

অনেকেরই কথা যে, এ ধরনের গণবিবাহ আসলে দম্পতিদের সমস্যার সমাধান করে না। উপজাতি অধিকার ও সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট ভাসভি কিরো টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, উপজাতীয় সমাজে ধুকুয়া দম্পতিকে মেনে নেয়। সম্পর্কের ভিত্তিতে একত্রে বাস করার ধারণা অনুমোদিত, কারণ সবাই বড় ভোজ দিতে পারে না। তাদের সাধ্য হলে তার ব্যবস্থা করে।

‘নিমিত’-এর খুন্তি জেলা সমন্বয়ক অনিল কুমার বলেন, আরো দম্পতির বিয়ের ব্যবস্থা করা এখনো দুঃসাধ্য ব্যাপার। বেশ কয়েকটি গ্রাম এ ধরনের বিয়েতে অংশ নিতে অস্বীকার করে বলেছে, দূরের শহরে নয়Ñ একটি বিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।