ভোটের ফাঁকে কর্ণফুলীতে নতুন অবৈধ স্থাপনা

চট্টগ্রাম : ভোট নিয়ে প্রশাসনের ব্যস্ততার সুযোগে কর্ণফুলী নদীর তীরে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। ২৮টি পিলারের এ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে মাত্র এক মাসে। অবৈধভাবে আগে নির্মিত মৎস্য আড়তের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে নতুন এ স্থাপনা। ২১ নভেম্বর কাজ শুরু করে ভোট শেষের দুদিন আগে দালান তৈরির এ কাজ শেষ করা হয়। দিন-রাত শ্রমিক লাগিয়ে এটা নির্মাণ করে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। একই জায়গায় আগে ১৮৮টি কক্ষ তৈরি করে মৎস্য আড়ত বানায় এ সমিতি। তাদের দাবি, বন্দর থেকে জায়গা লিজ নিয়ে স্থাপনা করছে তারা। অন্য দিকে পরিবেশবাদীদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কর্ণফুলী নদীর তীর কেউ লিজ দিতে পারে না, কেউ তাতে স্থাপনাও নির্মাণ করতে পারে না। তালিকা করে কর্ণফুলী নদীতীরের অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এর আগে নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। কিন্তু সেটি আমলে না নিয়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় স্থাপনা হচ্ছে একের পর এক।
নদীতীরে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত চার একর জায়গা প্রথমে দখল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরে ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা দর ধরে ১৫ বছরের জন্য এ জায়গা বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাছে ইজারা দেয় তারা। এরপর এ জায়গায় মৎস্য আড়ত করে তা ক্রমে সম্প্রসারণ করছে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রথমে ১৮৮টি কক্ষের মৎস্য আড়ত করলেও ভোটের মাসে আরও ২৮টি পিলার বাড়িয়ে আটটি নতুন কক্ষ করা হয়েছে। এ স্থাপনার পাশে নদীতীরে খালি থাকা জায়গায় অন্য আরও স্থাপনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। অথচ নদীতীর দখল করে গড়ে ওঠা এ মৎস্য আড়ত উচ্ছেদ করতে আন্দোলন করেছিলেন প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এ স্থাপনার পক্ষে অবস্থান নেন। এটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিও পালন করেন তারা। কিন্তু মহিউদ্দিনের মৃত্যুর পর মৎস্য আড়তের বিরোধিতাকারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ সুযোগে এখন আবার নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পেছনেই হয়েছে নতুন এ স্থাপনা। ২৮টি পিলার দিয়ে নতুন করে আটটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। বরফকল কিংবা স্টোর হিসেবে এ ঘরগুলোব্যবহৃত হতে পারে বলে জানালেন স্থানীয়রা। শতাধিক আড়তের (গদি) একটির মালিক জাফর আলম। তার মালিকানায় আছে ১২ ফুট বাই ১৪ ফুট আয়তনের একটি আড়ত। তিনি জানান, সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতির কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে এসব আড়ত কিনতে হয়েছে তাদের। জায়গা নিয়ে ঝামেলা থাকায় তারা কোনো ডকুমেন্ট ছাড়াই এ টাকা পরিশোধ করে ব্যবসা করছেন। নতুন করে এখন আরও স্থাপনা তৈরি করা হবে এখানে। এরই অংশ হিসেবে ভোটের ফাঁকে আটটি নতুন কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আগে পাঁচটি একতলা ভবন ও একটি দোতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ইউ আকৃতিতে তৈরি হওয়া একতলা ভবনের দোকানগুলোতে করা হয়েছে মাছের আড়ত। আর দোতলা ভবনটি শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ওরফে বাবুল সরকার বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জায়গাটি ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। আমরা তাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে কিছু মাছের আড়ত তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছি। এটি অবৈধ কি না, তা দেখবে প্রশাসন। নতুন করে স্থাপনা করার বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন তিনি। পরে বলেন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পরিচালনার সুবিধার্থে নতুন করে কিছু কক্ষ বাড়ানো হয়েছে। এতে কারও কোনো আপত্তি ছিল না।
স্থানীয়রা জানান, যে জায়গা নিয়ে কোটি টাকার এ বাণিজ্য হচ্ছে, সেটির প্রকৃত মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে একটি প্রতিবেদন দেন সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আছিয়া খাতুন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী স্থানের যে জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত নদীশ্রেণির জমি। খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা কী বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইজারা বা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে, তা বোধগম্য নয়। এ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কর্ণফুলী নদীর পাশের জমিতে স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কাজ অব্যাহত রাখলে উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ করে ফৌজদারি মামলা করারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। পাশাপাশি ইজারা প্রদানের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকেও চিঠি দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসনের চিঠিতে কর্ণফুলী নদী নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, কর্ণফুলী তীরবর্তী স্থানে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখতে হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৬ সালের ৬ জুন নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও নদীতীর লিজ দিলে কিংবা স্থাপনা তৈরি করা হলে তা হবে আদালতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতের এ নির্দেশনা বলে যেকোনো সময় এ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষমতাও রাখে জেলা প্রশাসন।
এ দিকে, কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তার এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তিন মাসের মধ্যে অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু এ নির্দেশনা অমান্য করে বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ভরাটকৃত জায়গা ১৫ বছরের জন্য লিজ দেয়। জেলা প্রশাসনও সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, কর্ণফুলীর তীরে দুই হাজার ১২১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে তালিকা তৈরি করেছি আমরা। এ তালিকা ধরে পত্রিকায় নোটিশও দেওয়া হয়েছে। ফান্ড পেলে শিগগির আমরা অভিযান শুরু করব। অন্য দিকে বন্দরের সচিব ওমর ফারুক এর আগে বলেন, সাধারণত কর্ণফুলী নদীর হাই ওয়াটার মার্ক (সাধারণ জোয়ারে নদীর পানি যে সীমানা স্পর্শ করে) ১৫০ ফুট পর্যন্ত বন্দরের এখতিয়ারাধীন। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাও বন্দরের কাজ। এ চিন্তা থেকে তাদের জায়গাটি লিজ দেওয়া হয়েছে।