মতি মিয়াঁ এবং চেয়ারম্যানের বাঁ- হাত…’

জাকিয়া শিমু :

(গত সপ্তাহের পর)
আকাশে আষাঢ়ে পূর্ণিমার চাঁদ, ভরা যৌবনে ছলছলিয়ে ওঠে। ফকফকা জ্যোৎস্না, গাঁও-গেরামের বিস্তর জনপদ ডুবে আছে বর্ষাজলে। চাঁদের ঘোরলাগা আলোকছটা ঠিকরে পড়ছে বর্ষাজলের ছাদে। কুলসুম বেগমের বাহ্যে চাপলে ঘরের কপাট ডিঙ্গে দুয়ারে বের হয়। দুয়ারে কোমরজল। এক পাশে উঁচু মাচায় তার মুরগির খোঁয়াড় বেঁধে রাখা আছে। সেখানে চোখ পড়তে সে মরাচিৎকার জুড়ে দেয়। তার আস্ত খোঁয়াড় গায়েব। খোঁয়াড়, গোটা পনেরো মোরগ-মুরগিতে ঠাসা ছিল খোঁয়াড়, তার একমাত্র খেয়েপরে বেঁচে থাকার সহায়-সম্বল। নিশুতি রাতে কুলসুম বেগমের বুকফাটা প্রলাপে পড়শিদের ঘুম ভাঙলেও কারো কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। মাঝরাতে সাঁতারজল ভেঙে তার বাড়ি ছুটে আসা মহামুশকিলের কথা। অবশ্য ভোরের নীল আলো ফুটতে গাঁয়ের লোকের ঢল নামে তার বাড়ির দিকে। উঠোনজুড়ে কোষা নৌকা, কলার ভেলা এবং ভাটি নৌকায় ভরে যায়। চেয়ারম্যানের কানে শব্দের গতিতে সে ঘটনা পৌঁছে যায়। চেয়ারম্যানের লোকদের চোখ পড়ল মতি মিয়ার ওপর। চেয়ারম্যানের বাড়ির গোটা পাঁচেক বাড়ি উত্তরে মতি মিয়ার বাড়ি। কুলসুম বেগমের বাড়ি থেকে অবশ্য সে বাড়ির সীমানা ঢের দূরেÑগাঁয়ের একদম শেষ সীমানায়। চেয়ারম্যানের কান অবধি চুরির ঘটনা পৌঁছাতে গোটা এলাকায় চাউর হলোÑমতি মিয়া মুরগি চোর!

মতি মিয়াকে গত কদিন এ তল্লাটে দেখা যায়নি। তার মাত্রাছাড়া জ্বর চলছে। এমনিতে সাধারণত তাকে এপাড়ায়-ওপাড়ায় টইটই করে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তার একমাত্র বাহন বাবার আমলের একখানা মাটির ভাটিÑমটকি। গোলাকৃতি সে ভাটির ভেতর কোনোমতে দেহটাকে গুঁজে দিয়ে ছোট্ট বাঁশের বৈঠা বেয়ে জলের ছাদে ভেসে বেড়ায়। বিল-ঝিলে শাপলা কলমিলতা খুঁজে বেড়ায়। মাঝেমধ্যে এ-বাড়ি ও-বাড়ির দুয়ারে চালখুদ-কুটোনাটা চেয়েচিন্তে যে আনে না, তা নয়। কিন্তু গত বেশ কদিন হয় তাকে কেউ দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। জ্বরের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ঘরবন্দী হয়ে পড়ে। সংসারে অন্ধ মা আর একমাত্র বিয়ের লায়েক ছোট বোন। এক-আধপেট খেয়ে, না- খেয়ে কোনোমতে তারা দিন পার করছে।
চেয়ারম্যানের ডিঙিনৌকায় জ্বরে জবুথবু মতি মিয়ার দেহখানা টেনেহিঁচড়ে তার চেলারা তুলে নিয়ে আসে। চেয়ারম্যান সাহেবের উঁচু ভিটাÑজলের সমুদ্রে মাথা উঁচু করে সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষার জল তাকে কিংবা তাদেরকে কাবু করতে পারে না। উঁচু উঠোনের মধ্যিখানে মতি মিয়াকে বাঁশের খুঁটির সাথে শক্তেপুক্তে বেঁধে রাখা হয়। মতি মিয়া জ্বরের প্রকোপে প্রলাপ বকে যায়। চোখ বুজে আসে, শরীরে জ্বরÑথরথরিয়ে কাঁপন ধরায়। গতরে একখানা ছেঁড়াফুটা গামছা জড়ানো। সে বেহুঁশ হয়ে বাঁশের খুঁটিতে মাথা ঠেস দিয়ে কোনোমতে বসে থাকে। চারপাশে ঘিরে আছে গাঁয়ের লোকজন। তাদের চোখমুখ বেদনার ছাপছোপরে ঢেকে আছে। অবশ্য চেয়ারম্যানের কাছের লোকদের চেহারায় প্রতিহিংসার দাবানল দোজখি আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে। চেয়ারম্যান অতিমাত্রার পাকা লোক, ভেতরের লোলুপ্সা চেহারা বাইরের চেহারা সুরতে মাখতে দেন না। এ সুযোগে মতি মিয়াকে যদি একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া যায়!

সালিসের সময় বাদ জোহর। সময়ের আগেই বর্ষার জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে শ’ দুয়েক মানুষ জড়ো হয় চেয়ারম্যানের উঠোনে। চেয়ারম্যান এবং তার সাজানো সাক্ষীরা একত্রে ঘর থেকে বের হয়ে উঠোনে ফেরে। চেয়ারম্যানের সাথে মতি মিয়ার চোখাচোখি হতে মতি মিয়া একদলা থুতু চেয়ারম্যানের মুখ বরাবর ছুড়ে মারে। উপস্থিত জনগণ মুহূর্তে স্তম্ভিত হয়ে যায়। চেয়ারম্যানের লোকেরা মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে মতি মিয়ার রুগ্্ণ-শীর্ণ দেহের ওপর। চেয়ারম্যান হাসিমুখে এগিয়ে এসে তার দলের লোকদের সরিয়ে নেয়। ভেতরে তার প্রতিহিংসার আগুনের দলা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো লাফিয়ে ওঠে।
সাক্ষীদের চমৎকার বয়ানে মতি মিয়া মুরগি চোরায় সাব্যস্ত হয়। রায় অনুযায়ী মতি চোরার দুই হাত কবজি অবধি কেটে ফেলা হবে। সমস্যা বাধে অন্যখানে। সালিস কমিটি জুরিতে যায় কিন্তু তারা দুহাত কাটার পক্ষে সবাই একমতে পৌঁছাতে পারে না। বেশির ভাগ লোক এক হাত কাটার পক্ষে সায় দেয়। জুরি শেষে এবং সবার সম্মতিতে এক হাত এবং ডান হাত কাটার পক্ষে রায় হয়। চেয়ারম্যান সাহেবকে বেশ শাহি মেজাজে বিস্তারিত রায় পড়ে শোনাতে দেখা যায়। পড়া শেষে সালিস কমিটির স্বাক্ষরও যুক্ত করা হয়। চেয়ারম্যান সাহেব পাকা লোক, কাঁচা কাজে ফেঁসে যাওয়া লোক নন!

সালিস বেশ পাকাপোক্তভাবে শেষ হয়। কোনো ফাঁকফোকর নেই। এবং জনদরদি চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কুলসুম বেগমের জন্য আগামী ছয় মাস খরপোষের ব্যবস্থাসহ পানি নেমে গেলে খোঁয়াড় ও মুরগির ব্যবস্থাও করে দেওয়া হবে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সন্তোষজনক রায়ে কুলসুম বেগমের খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও তাকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখায়। নানা প্রশ্ন মাথায় এসে গোলমাল পাকিয়ে দেয়। উপস্থিত প্রায় সবার মনেও হাজারো প্রশ্ন জাগে। সেসব প্রশ্ন অবশ্য গলা অবধি এসে কৈ মাছের ত্রিকোনা কাঁটার মতো শক্তভাবে ধড়ে আটকে থাকে।

সাক্ষীদের ভাষ্যে মতি মিয়া একা নিশুতি রাতে খোঁয়াড়সহ মুরগি তুলে নেয়। খোঁয়াড় কুলসুম বেগমের বাড়ির পাশের পাটখেতে ফেলে রেখে মুরগি নিয়ে পালিয়ে যায়। সবার উপস্থিতিতে সাক্ষীর দেখানো পাটক্ষেত থেকে খোঁয়াড় তোলা হয়। ভেজা গামছায় মুরগির গলা পেঁচিয়ে শিবরামপুর হাটে নিয়ে মুরগি বিক্রি করে সে। চমকপ্রদভাবে মুরগি ক্রেতাকেও সালিসে হাজির করা হয়। ক্রেতা কীভাবে কখন কোথায় এবং কত দরদামে মুরগি কিনেছে, সেসব বিস্তারিত ময়না পাখির মতো গরগর করে বলে যায়। মতি মিয়া বিস্ময় দৃষ্টিতে ক্রেতার দিকে চেয়ে থাকে। জীবনে তার সাথে ক্রেতার এই প্রথম সাক্ষাৎ। ইহজীবনে কখনো স্বপ্নেও তাকে দেখেনি। সে স্তম্ভিত হয়ে নির্বিকার তাকিয়ে থাকে ক্রেতার দিকে, মুখের ভাষা হারিয়ে যায়। তীব্র ঘৃণায় আরেক দলা থুতু অবলীলায় মুখের ভেতর জমা হলে সে ক্রেতাকে লক্ষ করে ছুড়ে দেয়। চেলারা এ সুযোগে এবারও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার অবশ্য চেয়ারম্যান তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন না। মতি মিয়ার চোখের ঠিক নিচটা নীল হয়ে কদমফুলের আকৃতিতে ফুলে ওঠে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে। চোখের ঘোলাটে জ্যোতি ধীরে ধীরে নিছক অন্ধকারে ঢেকে যায়। সে জ্ঞান হারায়।

গুণীজন কয়, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। কিন্তু এখানে সহসা যা ঘটল, তাতে ধর্মের কল শুধু বাতাসে নড়লই না, সাজানো-গোছানো সমস্ত আয়োজন মুহূর্তে তছনছও হয়ে পড়ল। মজলিসে দুলাল মিয়া (চেয়ারম্যানের চেলাদের একজন) হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে। দুলাল মিয়ার ভেতরটা শামুকের খোলসের ভেতরের মতো নরমসরম, দয়ামায়ার অতলসমুদ্র। আদতে তা তার চলাফেরায় টের পাওয়ার জো নেই। পেটের দায়ে চেলামি করলেও এত বড় মিথ্যা রায় এবং মতি মিয়ার ভবিষ্যৎ ভাবনায় তার বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। তার প্রায়শ্চিত্তের কথা সে মুহূর্তে ভুলে যায়। সালিসে শত লোকের সামনে সে প্রকৃত সত্য ঘটনা গরগর করে বলে দেয়। সে নিজে এবং চেয়ারম্যানের দলের আরও ১০-১২ জন মিলে মুরগি চুরি করে এবং তা মতি মিয়াকে ফাঁসানোর জন্য। চেয়ারম্যান নিজে তাদের এ কাজে সাহায্য করে। মতি মিয়াকে চোর সাব্যস্ত করতে চেয়ারম্যানসহ তাদের এই জঘন্য কাজের বর্ণনা শুনে সালিসে উপস্থিত প্রায় সবাই স্তম্ভিত বনে যায়। চেয়ারম্যান জঘন্য খারাপ লোক, তা গাঁয়ের লোকের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয় কিন্তু সামান্য এক আধপাগলা ছেলেকে নিয়ে এমন নোংরা ষড়যন্ত্রে সবাই বাক্যহারা হয়ে যায়। চেয়ারম্যান কাজের তাড়া দেখিয়ে তড়িৎ গতিতে সালিস থেকে কেটে পড়েন এবং সে যাত্রায় মতি মিয়া ছাড়া পায়।

কিন্তু এবারের বিষয়-আশয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। মতি মিয়াকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। করিম ব্যাপারীর বড় ছেলে জানালার কাছে বসে ছিল। উঠোনে লম্বা তারের দড়িতে সাতসকালে কেঁচে দেওয়া কাপড় রোদের আঁচে শুকাতে দেওয়া হয়। মতি মিয়া পাকা চোর নয়। তার পরনে সেই কবেকার লুঙ্গিটা কয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। লোকজন তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। ভারি লাজলজ্জার কথা। এসব বিবেচনায় মতি মিয়া, সহসা একটা লুঙ্গি দড়ি থেকে টেনে নিয়ে তার কোঁচড়ে লুকিয়ে ফেলে। লুঙ্গিটা খুব কাজ দেবে এমন স্বস্তিদায়ক ভাবনায় যখন বাড়ির সীমানা ছেড়ে বের হবে, করিম ব্যাপারীর ছেলে পেছন থেকে তাকে জাপটে ধরে ফেলে। মতি মিয়া স্বভাবমতো নির্বিকার থাকে। কোনো রকম ছলচাতুরী না করে কোঁচড় থেকে লুঙ্গি বের করে করিম মিয়ার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু তাতে তার শেষরক্ষা হয় না।

করিম মিয়ার ছেলে মরা চিৎকার শুরু করলে বাড়ির লোকজন এগিয়ে এসে মতি মিয়াকে শক্তপোক্তভাবে বেঁধে ফেলে। চিৎকার-চেঁচামেচিতে আশপাশের লোক জড়ো হয়। বিস্তারিত শুনে চেয়ারম্যান তার দলের লোকদের সাথে নিয়ে ঝোড়ো মিটিং করেন। বিকেলের নির্ধারিত সালিস স্থগিত করেন। করিম ব্যাপারীকে তার কাছে ডেকে পাঠান। গোপন সলাপরামর্শ করেন।

করিম ব্যাপারী চেয়ারম্যানের কাছের লোক। সে পরপর দুবার ইলেকশনে চেয়ারম্যানের পক্ষ হয়ে কাজ করে এবং তার গাঁয়ের লোকদের চেয়ারম্যানের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করে। সে অবশ্য বেশ মোটা অঙ্কের টাকাও ইলেকশনে খরচ করে চেয়ারম্যানের পক্ষে ভোট ক্রয় করে। ইলেকশনের পর অবশ্য করিম ব্যাপারী চেয়ারম্যানের খোশনজরে থেকে যায়। করিম ব্যাপারীর পড়শির সাথে জমিজিরাত ভাগ-বাঁটোয়ারের সময় চেয়ারম্যান তার পক্ষ নিয়ে তাকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে এবং এ গাঁয়ের নামে সরকারি বন্দোবস্তের দান-খয়রাত চেয়ারম্যান করিম ব্যাপারীর সাথে সব সময় ভাগজোক করে খায়। করিম ব্যাপারী অকৃতজ্ঞ নয়, সেসব প্রাপ্তির কথা তার স্মরণে আছে। তা ছাড়া আসছে শীতে নামার ডেঙ্গাটার একটা বিহিত করতে হবে। চেয়ারম্যানের সুনজর না পেলে বহু টাকার সম্পদ ডেঙ্গাটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। সে চেয়ারম্যানের কথামতো ছেলেকে সাজানো ঘটনা বার কয়েক কণ্ঠস্থ করায়। ছেলেটা বরাবরই একটু সহজ-সরল। শিখিয়ে দেওয়া বুলিও ঠিকঠাকমতো আওড়াতে পারে না। সালিসে যাতে বিপদ না হয়, সেদিক থেকে চেষ্টার কমতি রাখা হয় না।

মতি মিয়ার মতো সাধারণ আধপাগলা এবং তার হাঁটুর বয়সী ছেলের সাথে চেয়ারম্যানের রেষারেষির বিষয়টা তার খুব কাছের দু-চারজনের কাছে জানা থাকলেও গাঁয়ের বাদবাকিরা তেমন খোলাসা করে কিছুই জানে না। তবে একদম যে ঠাহর করতে পারে না, তা কিন্তু নয়। সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা তথাকথিত শিক্ষিত অন্ধের চেয়ে একটু বেশিই বটে, কারণ তারা মানবিক চোখ দিয়ে এখনো পৃথিবী দেখে। তাদের বিবেকবোধ, শেষ রাত্তিতে আকাশের বুকে জেগে থাকা নক্ষত্রের মতো এখনো জ্বলজ্বল করে জ্বলে আছে বলেই পৃথিবীতে এখনো সত্যের জয় হয়। অথচ বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষ ‘শিক্ষিত’ নামক তকমা গলায় ঝোলানোর আগেই মানবিকতা বিষয়টা খুইয়ে ফেলে। চেয়ারম্যানের কুকর্মে গাঁয়ের মানুষ অতিষ্ঠ হলেও এসব করিম ব্যাপারীদের জন্য তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না। চেয়ারম্যান শুধু চাল, গম চুরি করেই ক্ষান্ত হয় না; গ্রামের বউ-ঝিরাও এর কুদৃষ্টি-কুকর্ম থেকে রেহাই পায় না।

বছর দুই আগে একদিন ভরসন্ধ্যায় চারদিক নিষক কালো অন্ধকার করে আষাঢ়ি বৃষ্টি নামে। এমন বর্ষণ, দুহাত দূরের জিনিসও দৃষ্টিগোচর হয় না। মুহূর্তে গ্রামের মেটে পথেঘাটে হাঁটুজলে ভরে যায়। মতি মিয়া বাড়ির অদূরে স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে আটকা পড়ে। এমন ঘোর বর্ষণ থামার কোনো লক্ষণ নেই। কিন্তু সহসা মতি মিয়ার বাড়ির জন্য মনটা অতিরিক্ত ছটফট করে ওঠে। মুহূর্তে দোকানের বাঁশের ঝাঁপ সবার অলক্ষ্যে সামান্য ফাঁক করে সে রাস্তায় নেমে পড়ে।
কাকভেজা হয়ে সে বাড়ি ফেরে। বাড়ির সীমানা ঘেঁষতে ঝড়ের বাতাসের সাথে মায়ের বুকফাটা চিৎকারের শব্দ কানে আসে। মতি মিয়া দৌড়ে ঘরের কাছে যায়। দুহাতে কপাট আঘাত করে কিন্তু কেউ ভেতর থেকে কপাট খোলে না। কপাটে কান রাখতে ভেতরে ধস্তাধস্তির আওয়াজ ভেসে আসে। মতি মিয়া শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দোরে আঘাত করলে ভগ্নপুরোনো ঘুণে খাওয়া দোর ভেঙে গড়িয়ে পড়ে। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার! চেয়ারম্যান এবং তার সাথে তার এক চেলাÑবোনের শরীরের ওপর জোর-জবরদস্তি করছে। মা এক হাতে তার হাঁটার লাঠির ওপর ভর করে অন্য হাত সামনে বাড়িয়ে জমাটবাঁধা অন্ধকারে মেয়েকে খুঁজছেন। মুহূর্তে মতি মিয়ার দীর্ণশীর্ণ শরীরে অসুরের শক্তি ভর করে। এক ঝটকায় মায়ের হাতের লাঠি টেনে নিয়ে চেয়ারম্যানের মাথা বরাবর আঘাত করে বসে। চেলা মুহূর্তে লাফ দিয়ে ঘরের বাইরে যেতে পারলেও চেয়ারম্যান লাঠির আঘাতে ঘুরে পড়ে যায়। আঘাতটা মাথায় না লেগে চেয়ারম্যানের বাঁ হাতের কনুইয়ে লাগে। আঘাতের তীব্রতায় কনুয়ের হাড় ভেঙে টুকরো হয়ে যায়। ঘটনা বিভিন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়া হলেও সেই থেকে মতি মিয়ার প্রতি চেয়ারম্যানের ক্রোধের বহ্নি দাউদাউ করে জ্বলছে।

মাইকে ঘোষণার পরপরই লোক জমায়েত শুরু হয়। করিম ব্যাপারীর উঠান উপচে মানুষের ঢল নামে। জায়গা সংকুলানে চেয়ারম্যানের কথামতো মতি চোরাকে স্থানীয় খেলার মাঠে সরিয়ে নেওয়া হয়। মতি মিয়ার দু’পায়ে এক ফোঁটা জোর নেই শীর্ণ দেহটাকে বয়ে নিয়ে যেতে। তাকে পেছনে হাতবাঁধা অবস্থায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় খেলার মাঠে। পা দুখানা আধঝোলা হয়ে দুলতে থাকে পথের জলকাদায়। মানুষের মিছিলের ঢলও মতি চোরার পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যায় মাঠের দিকে। মতি চোরার অন্ধ মা এবং ছোট বোনকে দেখা যায় মানুষের মিছিলের সাথে সাথে এগিয়ে যেতে। মায়ের এক হাতে লাঠি, অন্য হাত সামনে বাড়িয়ে ছেলেকে ছুঁয়ে দেখার বুকফাটা আকুতি। ছোট বোনের চোখের অশ্রুধারা শুকিয়ে গালের ওপর কালো আস্তরণ হয়ে ঢেকে আছে।

বিশাল মাঠের কোনাকাঞ্চিও লোকে লোকারণ্য। সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ভয় ও আতঙ্কের ছাপ। ভয়ংকর তামাশা দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেতে অনেকে অবশ্য ঔৎসুক্য হয়ে অপেক্ষা করছে। চেয়ারম্যানের উপস্থিতি টের পেয়ে তার চেলাপ্যালাদের কণ্ঠে ঝরে আনন্দের উষ্মা! তাদের মিলিত কণ্ঠের জয়ধ্বনিতে চেয়ারম্যান দুহাত শূন্যে দোলাতে দোলাতে মানুষের ঢলের ভেতর হয়ে তার নির্দিষ্ট আসনে এসে বসেন।

সালিসে চার গ্রামের গণ্যমান্য লোকসহ শ’ পাঁচেক লোকের বেশি জমায়েত হয়। বিচারকাজ শুরু হয়। বিপক্ষ দলের লোকের অভাব না হলেও মতি চোরার পক্ষের লোকের কোনো সাড়াশব্দ নেই। মা-বোনকে মাঠের পুব পাশে ভয়ক্লেশে জড়োথরো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মতি চোরকে কেন্দ্র করে যেভাবে লোক দাঁড়িয়ে আছে, সার্কাস দেখার মতো উৎসুক চোখে মতি চোরার মা, বোনকেও সেভাবে লোকে বেষ্টন করে আছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। করিম ব্যাপারীর বড় ছেলেটা বাপের স্বভাবের কিছুই পায়নি। শেখানো তরজমা ঠিকঠাকমতো বলতে পারল না। জনসম্মুখে সাধারণ লোকের পক্ষে তরতাজা মিথ্যা বলা সহজ কাজ নয়। চেয়ারম্যান করিম ব্যাপারীর দিকে বিষধর গোখরা সাপের মতো শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। করিম ব্যাপারী ভয়ে কুঁকড়ে যায়। আসছে মাঘে মাঝের চকের মাছের ডেঙ্গাটারÑকার্ত্তিক ঘোষের সাথে একটা ফয়সালা হওয়ার কথা ছিল। চেয়ারম্যান তাকে ধরাবান্ধা কথাও দিয়েছেন। বর্ষায় পানি নেমে গেলে ডেঙ্গায় প্রচুর মাছ আটকা পড়ে। সেসব মাছ শীতের শেষে গায়েগতরে বেড়ে বিশাল আকৃতির হয়। শহরগঞ্জ থেকে মাছের ব্যাপারীরা এসে চড়া দামে মাছ কিনে নিয়ে যায়। একদাগে মোটা অঙ্কের টাকা হাতে আসে। টাকাটা এবারও হাতছাড়া হলো বলে। পোলা হইছে স্বভাবচরিতে শতভাগ মায়ের মতো। করিম ব্যাপারীর ঘরের বউয়ের ওপর চরম রাগ ওঠে। রাগে তার শরীর কাঁপে।

মায়ের সোনার বালা মতি মিয়ার কোঁচড় থেকে কীভাবে উদ্ধার হলো! সে ঘটনার একমাত্র সাক্ষী করিম ব্যাপারীর ছেলে, সবিস্তারে বর্ণনা করে। ‘সোনার বালা’র স্থলে তার মুখ ফসকে ‘লুঙ্গি’ শব্দটা বেরিয়ে আসে। সে মুহূর্তে বাবার অর্থাৎ করিম মিয়ার দিকে চোখ পড়তে সে সাথে সাথে তার ভুল বুঝতে পারে এবং শোধরে নেয়। পরবর্তীতে সে আবার ‘সোনার বালা’ বলতে গিয়ে ‘লুঙ্গি’ শব্দটা উচ্চারণ করে অর্থাৎ একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি করে। সালিসজুড়ে হাসির হিড়িক পড়ে। নেংটা ছেলেপুলেও হাসিতে গড়াগড়ি যায়। সাক্ষী বার কয়েক গলা-খাঁকারি দেয়, গলায় মরুভূমির তৃষ্ণা ঠেকে। সামনে রাখা সিলভারের পানির জগ মুহূর্তে গলায় ঢেলে পেছনের রাস্তা দিয়ে সে বাড়ির পথ ধরে পালিয়ে বাঁচে। করিম ব্যাপারীকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা যায়। তবে লুঙ্গিটা যে মতি মিয়ার কোঁচড়ে পাওয়া গেছে, সে তথ্যে বিন্দুমাত্র গাঁজাখুরি নেই। এ রকম চুরি মতি মিয়া অহরহ করে এবং তা গাঁয়ের লোকে যেমন জানে, মতি মিয়া নিজেও তা স্বীকার করে।
চেয়ারম্যান সাহেব চতুর লোক। সঠিক কাজটি কখন কোথায় কীভাবে করতে হবে, সে বিষয়ে তার চেয়ে ভালো অত্রাঞ্চলে কেউ পারঙ্গম আছে বলে জানা নেই। এসব চতুরতার কারণে পরপর তিনবার চেয়ারম্যানের পদে তিনি সদর্পে টিকে আছেন। উঁচুমহলের সাথে তার লাইনঘাটও বেশ পরিষ্কার। এসব কারণে এ অঞ্চলে তার উপরে কথা বলার হিম্মত কেউ সামনাসামনি দেখায় না। করিম ব্যাপারীর ছেলেকে নিয়ে হাস্যরসের মধ্যপথে চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ালে সালিসে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। চেয়ারম্যান সময়ক্ষেপণ না করে সোজাসুজি রায় ঘোষণা করেন, ‘লুঙ্গি চুরির অপরাধে মতি চোরার ডান হাতের কবজি অবধি কর্তন করা হবে!’ রায় ঘোষণার মুহূর্তে সালিসে গুঞ্জন ওঠে। সামান্য একটা লুঙ্গি চুরির দায়ে হাত কাটা পড়বে, এমন রায় একমাত্র চেয়ারম্যানের চেলারা ছাড়া কারও পক্ষে মেনে নেওয়া সহজ হয় না। যদিও কেউ চড়া গলায় চেয়ারম্যানের কথার বিপক্ষে কিছু বলতে সাহস করে না কিন্তু অন্যায় রায় মেনে নিতেও অনেকের বোধে আঁচড় লাগে। মতি চোরা একদলা থুতু আগের মতো চেয়ারম্যানকে লক্ষ করে ছুড়ে মারে। চেয়ারম্যান অবশ্য তাতে কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ করেন না। চেয়ারম্যানের পক্ষের লোকেরা হর্ষধ্বনি দেয়। রায় কার্যকরের সমস্ত আয়োজন চেয়ারম্যানের পক্ষের লোকেরা আগেভাগে ঠিক করে রেখেছিল, যাতে দ্রুত তা কার্যকর করা যায়।

শেষ মুহূর্তে গুঞ্জন পাল্টা গুঞ্জনের মাঝে সাদামাটা অতি সাধারণ বেশের একজন মানুষকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, যিনি এতক্ষণ মাথা নিচু করে খুব মনোযোগ দিয়ে চেয়ারম্যানসহ বাদবাকিদের বক্তব্য শুনছিলেন। তিনি স্থানীয় হাইস্কুলের দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক। আশপাশের চৌদ্দ গাঁয়ের লোক এ যুগেও তাকে পরম সমীহ করে চলে। তিনি অত্রাঞ্চলের বাতিঘর। সাধারণ মানুষ অতি আগ্রহ নিয়ে তার ভাষ্য শোনার অপেক্ষায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু চেয়ারম্যানের লোকেরা বরাবরের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মতি মিয়াকে ইতিমধ্যে টেনেহিঁচড়ে মাঠের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে রায় কার্যকর হবে।

প্রধান শিক্ষকের ঠোঁটে বিদ্রƒপের হাসি ভেসে ওঠে। তিনি মতি মিয়াকে ফেরত আনার নির্দেশ দেন। মতি মিয়াকে চেয়ারম্যানের পাশে দাঁড় করানো হয়। সালিসে দ্বিতীয়বার পিনপতন নীরবতা। প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘বিচার অবশ্যই উচিত হয়েছে। তাতে কারো কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু মতি মিয়ার হাত কাটার আগে বিচারের রায় প্রদানকারীর হাতটা কি স্বস্থানে থাকার কথা?’ তিনি সালিসে উপস্থিত শত মানুষের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। এ সময় সালিসে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা দেখা যায়। তারা সমস্বরে চেয়ারম্যান এবং তার চেলাদের শাস্তি দাবি করেন। জনগণের ইচ্ছানুযায়ী, প্রধান শিক্ষক রায় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘মতি মিয়ার হাত যদি কাটতেই হয়, তবে চেয়ারম্যানের হাত আগে কাটা হবে।’

এ যাত্রায়ও রক্ষা পায় মতি মিয়া।

-ফ্লোরিডা, ইউএসএ