মতি মিয়াঁ এবং চেয়ারম্যানের বাঁ- হাত…

জাকিয়া শিমু :

করিম ব্যাপারীর উঠোনের দক্ষিণ পাশের সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বয়োবৃদ্ধ কয়েতবেল গাছের গুঁড়ির সাথে শক্ত করে চোরকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মানুষের ঢল নেমে আসে করিম ব্যাপারীর উঠোনজুড়ে। গাঁয়ের লোকের বিনোদনের রসদ কম। সামান্য উপলক্ষে শত মানুষের মুহূর্তে জড়ো হওয়া অতি তুচ্ছ ঘটনা। নদীর এপার-ওপারের গ্রামগুলো থেকেও মানুষজন ছুটে আসতে শুরু করেছে। মহিলারা হাতের কাজ ঝেড়ে ফেলে কোলের বাচ্চাকে মাটি থেকে জাপটে কোলে তুলে ঢলের সাথে মিশে যায়। গাঁয়ের বয়োবৃদ্ধরাও কম যায় না, তাদের হাঁটার লাঠি ঘোড়ার বেগে ছুটে চলে। সবেমাত্র বর্ষার পানি নেমে যাওয়া ধানক্ষেতের দু’পাশের আলের এবড়োখেবড়ো অমসৃণ আধশুকনো কাদাপথ ভেঙে জোর পায়ে মানুষের মিছিলের সাথে এরাও সমানতালে ছুটে চলে। ছুটে আসা মানুষের চোখেমুখে রহস্যজনক উৎকণ্ঠা। চোরÑসে যেন ভিনগ্রহের এলিয়েন!

চোরদর্শনে অনেকেরই মনের আক্ষেপ মেটে না। এ তো চোর নয়, পাশের গাঁয়ের মতি মিয়া। আধপাগলা মরাধরা মানুষ। কেউ কেউ খুব হতাশও হয়। চোর দেখলে গুটিকয় চড়থাপ্পড় দিলে পঙ্গুরও পুরুষত্ব বাড়ে। কেউ কেউ মনে করে, এ ছাড়া নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব-কর্তব্য বলেও একটা কথা থেকে যায়! কিন্তু আধপাগলা মতি মিয়াকে মেরে সে হাউস মোটের ওপর মেটে না! তার পরও যে মতি পাগলার কপালে কিলঘুষি, লাথিঝাঁটা জোটেনি, তা কিন্তু নয়। অতি উৎসাহীরা হাঁটু ভাঁজ করে বসে নেই। এর মধ্যে কয়েক প্রস্ত কিল-ঘুষি তার কপালে জুটে গেছে। আঘাতের জেরে মতি মিয়ার বাম চোখ লাল গোল্লার মতো ফুলেফেঁপে টসটসে হয়ে আছে। শরীরজুড়ে কিল-ঘুষি, নখের আঁচড়ের চিহ্ন, বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে। কিন্তু তাতেও সবার মন ভরছে না। তাকে নিয়ে অবশ্য ইতিমধ্যে ব্যবসাপাতিও ঢের জমে উঠেছে। গাঁয়ের বাজার থেকে বাদাম, আইসক্রিম, আচারের খুচরা দোকানপাট এরই মধ্যে করিম ব্যাপারীর উঠোন সেঁটে বসে গেছে। কেউ একজন মতি মিয়ার প্রতি দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে বাদামের ঠোঙ্গা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। মতি মিয়াকে ফুরফুরা মেজাজে দু’হাতের শক্ত বাঁধন সামান্য ঢিলে করে বাদাম ছুঁলে খোসা ফুঁ দিয়ে খেতে দেখা যায়। বাচ্চারা তাতে দারুণ মজার রসদ খুঁজে পেলেও অনেকের, বিশেষ করে বদরুল চেয়ারম্যানের চেলাদের মেজাজ বিগড়ে যায়। তাদের একদল এরই মধ্যে চেয়ারম্যানের কাছে ছুটে গেছে। এটাই মোক্ষম সময় মতি মিয়াকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার।

চেয়ারম্যান সাহেব বাড়িতে নেই। পাশের গাঁয়ে বিকেলে সালিস বসবে। সালিসের আগে দু’পক্ষের সাথে তার গোপন কায়-কারবার সারতে হয়। এটা অবশ্য তার আর দশটা অলিখিত নিয়মের একটা! গাঁয়ের লোকও এসবে এখন অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়ে গেছে। টাকাকড়ির হিসাব-নিকাশের ঝক্কিঝামেলা তাকে পোহাতে হয় না। তার সুযোগ্য চেলারা তাকে এসবের পথ বাতলে দিতে তার সাথে সদাসর্বদা-সদর্পে লেপ্টে থাকে। সূর্যের চেয়ে বালুর তেজ বেশিÑএসব কাজ দেখভাল করতে চেয়ারম্যানের চেয়ে চেলারা সরস বেশি।

চেয়ারম্যান সাহেব বাদী কিংবা বিবাদীর উঠোনে বসে বাড়ির লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার গল্প শোনেন। তার মন ভারাক্রান্তের ভারে ন্যুজবুজে হয়। মাঝেমধ্যে জায়গা বিশেষ জনদরদি চেয়ারম্যানের চোখজোড়ায় রাজ্যের অশ্রুজল জমে দিঘির জলের মতো টলমল করে। সহজ-সরল গাঁয়ের লোক তাতে খুশিতে উদ্বেলিত হয়। এমন জনদরদি চেয়ারম্যান পেয়ে তারা কেউ কেউ সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়। এ সুযোগে তার চেলারা বাড়ির মুরব্বিকে গোপনে আলাদা করে ডেকে নিয়ে চেয়ারম্যানের সম্মানীর বিষয়ে একটা বিহিত করে। চেয়ারম্যানের খায়-খরচের একটা ব্যাপার আছে! মান্যগণ্য মানুষ! দু’পক্ষের মাঝে যে বেশি সম্মানী দেয় সালিসের জিত তার পক্ষে যায়। ন্যায়-অন্যায় হিসাব-নিকাশের অযাচিত বাড়তি সময় জনদরদি চেয়ারম্যানের হাতে নেই!

মতি মিয়াকে কয়েক প্রস্ত উত্তম-মধ্যম দেওয়া হয়েছে। সে এখন অনেকটাই ক্লান্ত। ক্লান্তিতে তার চোখের কোণে একসমুদ্র ঘুম জমেছে। কিন্তু চারপাশের লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুমানোর ফুরসত মেলা ভার। কার্তিক মাসÑবেলা নাই উঠতে, বেলা পড়ে যায়। মতি মিয়ার পেটে গত রাত থেকে তেমন কিছুই পড়েনি, উপোস হয়ে আছে, সামান্য কটা বাদাম জুটেছে বটে! পেট ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করে। চেয়ারম্যানের লোকেরা মতি মিয়ার বিচারের ফয়সালা মাইকযোগে ঘোষণা দিয়েছে। তাতে মানুষের ভিড় কিছুটা হলেও কমতে শুরু করে।

বাদ আসর মতি মিয়ার বিচার শুরু হবে এবং বিচারের রায়ও মাইকে ঘোষণা এসেছে। মতি চোরার হাত কেটে ফেলা হবে। অবশ্য চোরের ভাগ্যে ধর্মমতে এমন বিচার ধার্য করা হয়েছেÑতাতে মনুষ্যের হাত নেই। গাঁয়ের মৌলভি সাহেবকে সামনে রেখে চেয়ারম্যানের লোকেরা ফয়সালা দিয়েছে, যদিও মৌলভি সাহেব মাথা নিচু করে অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মৌলভি সাহেবের মাথা উঁচু-নিচুতে চেলাদের মাথাব্যথা নেই। সবই তাদের মর্জি। গাঁয়ের সাধারণ জনগণের কথা সামান্য চিন্তায় রেখে মৌলভি সাহেবকে উপস্থিত রেখে বিচারের রায় ঘোষণা হয়েছে। তাতে ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রয়োজনবোধ করার আক্ষেপ কারও (মৌলভির) থাকলেও সে সুযোগ দেওয়া হবে নাÑচেলাদের কড়া নির্দেশ। চেয়ারম্যান এবং তার চেলাদের উপরে কথা বলার হিম্মত এ এলাকায় কারো নেই। গুটিকয় মুরব্বি অবশ্য রায় ঘোষণায় নাখোশ হন কিন্তু চেলাদের গর্জনে তাদের মুখে ‘রা’ ফোটার জো থাকে না। মহিলারা দ্রুত পায়ে বাড়ির ফিরতি পথে পা বাড়ায়। চটজলদি কোনোমতে কুটাবাছা-রান্নাবাড়া শেষে আসর ওয়াক্তের আগে ফিরতে হবে বলে কথা।
মতি মিয়া ছিঁচকে-ছেঁচড়া টাইপের চোর। ভবঘুরে, বোকাসোকা-আলাভোলা চেহারার, ধরন-সুরতে তা ফুটে ওঠে বৈকি। বয়স ঠিকঠাকমতো বলার জো নেই, কুড়ি-একুশ হবে হয়তো। সারা দিন টইটই করে মাঠে-ঘাটে, ঝোপঝাড়ে, নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের ক্ষেতের আল ধরে ঘুরঘুর করে, সময়-সুযোগমতো আনাজপাতি কোঁচড়ে খুব কৌশলে চালান করে দেয়। তবে স্থানীয় বাজারহাটে তার আনাগোনা একটু-আধটু বেশিই। বিশেষ করে, যখন পেটে খুব ভোগ লাগে। চা-পুরির দোকান ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে সময়-সুযোগমতো দু-একটা লুঙ্গির তলে গুঁজে আড়ালে-আবডালে চলে যায়।

কেউ কেউ অবশ্য তাকে ডাকখোঁজ করেও খাওয়ায়। চেয়েচিন্তে এবং কখনো ছেঁচড়া চুরি করে দিন কাটালেও তার নিজস্ব কিছু রীতিনীতি আছে। সেসব অবশ্য বুঝদার মানুষদের বোধের শিকড় ধরে ঠিক ঠিক নাড়া দেয়।

সে ভুলেও নিজ গ্রামে চুরি করে না। নিজের প্রয়োজনের বাড়তি কিছুতে তার আগ্রহ নেই। আজকের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু সে জোগাড় করেÑমানুষের এঁটো ঘেঁটে। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে দিনের আলোতে চেয়ে-চিন্তে, হাতটানে যেটুকু পায়, তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে। রাতে সে ঘরের বাইরে বেরোয় না। বহুবার সে চুরি করে ধরা খেয়েছে এবং উত্তম-মধ্যম শেষে ছাড়াও পেয়েছে। কিল-ঘুষি তার কাছে নস্যি। কিন্তু গত বছর ভরা বর্ষা রাতে উত্তরপাড়া বদরুল চেয়ারম্যানের গাঁয়ে ঘটল এক অঘটন। চারদিকে বর্ষার জল থইথই করে। এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি যেতে গলা-কোমর জল, কোথাও কোথাও ডুবসাঁতার। খুব নিদানে না পড়লে কেউ কারো বাড়ির সীমানা মাড়ায় না আর রাত হলে তো কথাই নেই। (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)