মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়!

শামসাদ হুসাম :

বিশ্বের মনুষ্য প্রজাতির ভিতরে পুরুষ এবং নারী দুই ক্যাটাগরির আদম সন্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই এই বিশ্বকে মনুষ্য সমাজের জন্য বসবাসের উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে সমানভাবে শ্রম এবং মেধা বিনিয়োগ করলেও, অধিকারের ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য ছিলো কেবল পুরুষদের। নারী হচ্ছে অধীনস্থ এক সম্প্রদায়, যারা কেবল পুরুষের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে দিনযাপনের গ্লানি বহন করতেন বছরের পর বছর। খুব সম্প্রতিক সময়ের এক নারীবাদী আন্দোলনের নমুনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী মহল কর্তৃক গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ আইনটি। অর্থাৎ নিজের শরীরের উপরও নিজের কোন অধিকার থাকবে না। সম্প্রতি ইরানে হিজাব না পরার কারণে মাসা আমিনি নামের এক তরুণীকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে পুলিশি নির্যাতনে। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের অনুশাসনের কথা বলে নারী নির্যাতনের এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে রেজা শাহ পাহলভীর শাসনামলের শেষের সময় থেকে, যখন আয়াতুল্লাহ খোমেনির হাত ধরে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের সূচনা। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মহিলাদের হিজাব পরে থাকার নির্দেশটাই ছিলো একটা বিপ্লব ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। যেসব মহিলার ধর্মীয় চেতনা ভিন্নমাত্রার, অর্থাৎ অন্য ধর্মাবলম্বী মহিলাদেরকে একইভাবে ইসলামের দোহাই দিয়ে কেন মাথার চুল হিজাব দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে? তাছাড়া ইসলামপন্থী মহিলাদেরকেই কেন ইসলামি বিপ্লবের অজুহাত খাড়া করে শাসক শ্রেণির লেলিয়ে দেয়া লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে আমিনির মতো নারীদের জীবন দিতে হবে? শাসক শ্রেণির কাছে এসব প্রশ্ন এখন অপরাধ বলে গণ্য, সে কারণে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার ঠিক তিনদিন পরে অর্থাৎ ২০ তারিখে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন মাসা আমিনি। এ মৃত্যুর মধ্যদিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বর্বর আইনটির বিরুদ্ধে শুধু মহিলা নন, ইরানের অনেক পুরুষও লাগাতার বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিয়েছেন। ইরানের বাইরেও এ ঘটনার প্রতিবাদে লাগাতার আন্দোলন অব্যাহত আছে। এসব কিছুই হচ্ছে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন।

বলা হয়ে থাকে দুনিয়ার প্রতিটি ধর্মই এসেছে মাুনষের মঙ্গলের কথা বলে। কিন্তু সত্য হচ্ছে- নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে পুরুষরাই ধর্মকে অধিক মাত্রায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং এখনও করছেন। হিন্দু ধর্মে নারীকে যতটা সম্ভব দমিয়ে রাখার ইচ্ছে নিয়েই এক সময়ে জলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা তো সদ্য বিধবা অসহায় এক নারীকে। সেই ধর্মে বিধবাদেরকে এখনও অমানবিকভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে জেরবার হতে হয়। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকারটা এখনও বাংলাদেশসহ কোন কোন দেশে স্বীকৃত নয়। অনেকাংশে মুসলমান সমাজেও একই অবস্থা। যদিও মুসলিম কেতাবে ঐ অধিকারটা রাখা আছে, তবে সেটা ঐ ‘কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই দশা’। এক সময় খ্রিস্টান ধর্মে মহিলাদের বলা হতো ‘নরকের দুয়ার’।

যে যুক্তরাষ্ট্রে এক সময়ে মহিলাদের ভোটাধিকার ছিলো না। ১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরীর পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি, বিপদজ্জনক কর্ম পরিবেশ, আর দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে যে সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন, সেই সমাবেশে সরকারের লেলিয়া দেয়া লাঠিয়াল বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণের কারণে অনেক মহিলা আহত হওয়া ছাড়াও গ্রেফতার বরণ করেছিলেন বেশ কয়েক জন। এসবই ঘটেছিলো নারীকে সমাজের অধিনস্ত প্রাণী হিসেবে বিবেচনার মাপকাঠিতে রাখার জন্য। আর গত ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই অধীনস্থ প্রাণী অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এক অবিশ্বাসী বিজয়ের মধ্যদিয়ে যেনো দেখিয়ে দিলেন, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন কেবল সময়ের দাবি। গত ৮ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউইয়র্কসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গর্ভনর নির্বাচিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন মহিলা। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- নিউইয়র্কেল ইতিহাসে প্রথম মহিলা গর্ভনর ক্যাথি হুকুল। গত বছর যৌন হয়রানীর অভিযোগে নিউইয়র্কের সাবেক গর্ভনর অ্যান্ড্রু কুমো যখন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন ভারপ্রাপ্ত গর্ভনর হিসেবে ক্যাথি হুকুল দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এবার ডেমেক্র্যাট পার্টির সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী লি জেলডিনের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

এছাড়া মিশিগানের সাবেক গর্ভনর গ্রেচেন হুইটমার নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভনর হয়েছেন।
আরাকান মাস-এর গর্ভনর নির্বাচতি হয়েছেন সারাহ হাকেবি স্যার্ন্ডাস। তার পিতা ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ঐ রাজ্যের গর্ভনর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সমকামি নারী মাউরা হিলি ম্যাসাচুসেটস-এর গর্ভনর নির্বাচিত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাট পার্টির মনোনয়ন নিয়ে এই বিজয় অর্জন করেন তিনি। এর আগের গর্ভনর ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির জেন সুইফট।
মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গর্ভনর পদে নির্বাচিত হয়েছেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভুত অরুণা মিলার। এছাড়া লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচতি হয়েছেন ক্যারেন ব্যাস।

এই ইতিহাসের পাশাপাশি আরো একটি অনবদ্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন মুসলিম প্রার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এখন পর্যন্ত ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছেন। সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী এবার নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন। এছাড়া ফেডারেল পর্যায়ে হাউজ অব রিপ্রেজেনটিটিভে তিনজন পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেনÑ আন্দ্রে কারসন, ইলহান ওমর ও রাশিদী তালিব কারসন। ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিব মার্কিন কংগ্রেসে প্রথম মুসলিম হিসেবে নির্বাচিত। কেইথ এলিমন মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার আসনটি ধরে রেখেছেন।

রাজ্য পর্যায়ে ২৯জন প্রার্থীও মধ্যে প্রায় সবাই প্রথম মুসলমান হিসেবে আইন সভায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে হলেনÑ ডেলাওয়ার রাজ্যেল মাদিনাহ উইলসন অ্যান্টিন, কলোরাডের রিপ্রেজেনটিটিভ ইমান যদেহ এবং ঐ রাজ্যের সিনেটর পদে সৌদ আনোয়ার।
জর্জিয়ায় সিনেটর পদে শেখ রহমান তার পদ ধরে রেখেছেন। এবার তার সাথে আরো দু’জন মুসলিম নারীÑ বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত নাবিলা ইসলাম এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত রোম্মন ফিলিস্তিনি জয়লাভ করেনে।

ভারতীয় বংশোদ্ভুত মুসলিম নাবিলা সৈয়দ ইলিনয়েস থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সী নাবিলা জেনারেল অ্যাসেম্বিলির সবচেয়ে কম বয়সী সদস্য।

এছাড়া ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত আবদেল নাসের রাশিদ ইলিনয়েস লেজিসলেচারে প্রথম মুসলমান সদস্য।
এছাড়াও টেক্সাসের রাজ্যসভায় প্রথম মুসলিম হিসেবে জয়লাভ করেছেন সুলেমান লালানি ও সোলেমান ভোজানি।
মেইনে দু’জন সোমালিয়ান-আমেরিকান জয়লাভ করেছেন। তারা হলেন- মানা আবদি ও দেকাধালাক। তারা দু’জনই মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
মিনোসেটায় বিজয়ী হয়েছেন প্রথম মুসলিম নারী জয়নাব মোহাম্মদ। সিনেটে তিনি একসাথে সোমালিয়ান মুসলিম নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারী।
ওহাইওতে আরেক সোমালিয়ান নারী মাত্র ২৬ বছর বয়স্ক মুনিরা আব্দুল্লাহ রাজ্যসভার প্রথম মুসলমান সদস্য নির্বাচিত।
মুসলমানদের এই বিজয় এক অবিরস্মীয় ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানব সমাজের দৃষ্টিতে বাংলাদেশী বাঙালিরা হলেন আরো এক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে চারজন বিজয়ী হয়ে আরো এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। তারা হলেন- জর্জিয়া থেকে শেখ রহমান, নাবিলা ইসলাম, কানেকটিকাট থেকে মাসুদুর রহমান এবং নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে আবুল খান। ইতিহাসের গতিধারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এসব মানুষ নিশ্চয় একদিন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখবে। সেদিনের প্রত্যাশায় আমরা।
এখানে আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি রাজ্যের স্থানীয়, রাজ্য ও ফেডারেল এবং বিচার বিভাগে এবার ৮২ জন মুসলিম প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে ২০ জন পুনঃনির্বাচিত ও ১৭৮ জন নতুন ছিলেন। গত ২০২০ সালে এই সংখ্যাটি ছিলো ৭১ জনের মতো। আর এবার ৮২ জন!

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা এক অবিস্মরণীয় বিজয়ের ইতিহাস। ১৯৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এসব আসনে নারী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কাহিনীর প্রথম সূচনা ঘটিয়েছিলো। পরবর্তীতে সে সংখ্যা ৫২ জনে দাঁড়ায়। ক্রমবর্ধমান এই হার যুগ পরিবর্তনের একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন সবাই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।