মনুষ্যত্ববোধের কাঙ্খিত উন্মেষ সাধনই নববর্ষের কামনা

মুহম্মদ শামসুল হক :

মহামারি করোনায় সারা বিশ্বে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি এবং চীনে ১০ লক্ষাধিকসহ কয়েক কোটি লোক নতুনভাবে আক্রান্ত হওয়ার শিরে সংক্রান্তি নিয়েই গোটা বিশ্বে প্রায় ৭৮০ কোটি মানুষ আগামী রোববার পদার্পণ করতে যাচ্ছে ইংরেজি ২০২৩ নববর্ষে। বিশ্ববাসীর সাথে তাল মিলিয়ে ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে ঐতিহাসিক টাইম স্কয়ারে উৎসুক হাজার হাজার নিউইয়র্কবাসীও বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ২০২২ সালকে বিদায় এবং ২০২৩ সালকে বরণ করে নেবেন। হাসি-কান্না, আনন্দ-বিরহ এবং ব্যক্তিগত পাপ-পুণ্যের লাখো স্মৃতিবিজড়িত দিনপঞ্জির পাতা থেকে ২০২২ সালের খসে পড়া এবং নববর্ষের হিসাব-নিকাশ শুরুর সূচনালগ্নে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ পাপ-পুণ্যের হিসাবের খাতার ওপর একবার চোখ বোলানো উচিত বললে অত্যুক্তি হবে না।
কারণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ঐশ্বর্যের সাগরে গা ভাসিয়ে দিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে এই বিশ্বচরাচরে পাঠানো হয়নি। অসহায়ের সহায়তায়, আর্তমানবতার সেবায় ও অভাবগ্রস্তদের দুর্দশা লাঘবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, সর্বোপরি সর্বজনীন কল্যাণে আত্মোৎসর্গের জন্যই বিশ্ববিধাতা মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। অথচ বিশ্বমানবের চিরশত্রু শয়তানের প্ররোচনায় এবং দুর্দমনীয় লোভ-লালসা ও নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস হিসেবে আমরা হাসি-আনন্দে জীবন কাটিয়ে একেবারে শূন্য হাতেই পরকালে পাড়ি জমাচ্ছি। অনস্বীকার্য যে, নশ্বর পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান একেবারেই সীমিত সময়ের জন্য এবং একদিন সকলকেই স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের স্নেহবন্ধন ছিন্ন করে অনন্তলোকে পাড়ি জমাতেই হবে। অতএব, মহান রাব্বুল আলামিনের বিশেষ অনুকম্পা ছাড়া পরকালে আমাদের পরিত্রাণের আশা নেই। তাই করোনার পুনরুত্থানের চরম হুমকির মুখে বিগত বছরের ব্যক্তিগত পাপ-পুণ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব-নিকাশ এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নববর্ষে আত্মশুদ্ধির পথে পা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো সম্ভবত অযৌক্তিক হবে না।

যাহোক, পবিত্র কোরআনের সুরা ইয়াসিনের বর্ণনা অনুসারে, বিশ্ব প্রতিপালকের নির্দেশে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র তথা মহাবিশ্ব নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে এবং অহর্নিশ একে অন্যকে পিছু ধাওয়া করেও কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারছে না। আর মহাপ্রলয়ের আগ পর্যন্ত এই পরিভ্রমণ এবং পিছু ধাওয়ার প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ফলে দিবা-রাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধি, ঋতুর পরিবর্তন এবং অতীত বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন ঘটে আসছে সেই স্মরণাতীত কাল থেকে এবং চলবেও অনন্তকাল। মূলত জরাজীর্ণ অতীতকে বিদায় এবং নতুন আশা-আকাক্সক্ষা ও সোনালি স্বপ্নের প্রাণভরা প্রত্যাশা, আবেগ-উচ্ছ্বাসে নতুনকে বরণ করার প্রবণতা বিশ্ববাসীর জীবনাচরণের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় নিউইয়র্কবাসীও হাড়কাঁপুনে শীত এবং হিমেল-বরফজমা আবহাওয়া উপেক্ষা করে টাইম স্কয়ারে সমবেত হবেন ইংরেজি নববর্ষ ২০২৩-কে স্বাগত জানাতে। দারিদ্র্যক্লিষ্ট ও প্রাত্যহিক অভাব-অনটনে নিয়ত জর্জরিত এবং নিয়তিলাঞ্ছিত কোটি কোটি বিশ্ববাসীর কামনা, এবারের ইংরেজি নববর্ষ বিশ্ববাসীর মনুষ্যত্ববোধের কাক্সিক্ষত উন্মেষ সাধনে ইতিবাচক অবদান রাখবে এবং গোটা বিশ্বে স্বার্থপরতা ও হানাহানির স্থলে সহমর্মিতা ও শান্তির মৃদু-মন্দ মলয় বইয়ে দেবে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুসারে, করোনাভাইরাস ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১১ লক্ষাধিকসহ সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ তরতাজা প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে। তা ছাড়া গোটা বিশ্বে প্রায় ৫০ কোটি লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহায়। ১৯ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুসারে, করোনায় আগামী বছর শুধু চীনে ১০ লক্ষাধিক এবং সারা বিশ্বে নতুন করে ১ কোটিরও বেশি লোক মৃত্যুখাতায় নাম লেখাতে বাধ্য হবেন। আর চীনের ৪৭ কোটিসহ সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং সিংহভাগ আক্রান্তকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। প্রণিধানযোগ্য যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সপ্তাহে গড় ৩ হাজার ১০০ জন করোনা-সংশ্লিষ্ট জটিলতায় মারা যাচ্ছেন এবং নতুনভাবে ৫ লক্ষাধিক লোক আক্রান্ত হচ্ছেন।

আবার ভয়াবহ রোগব্যাধি, দীর্ঘ খরা-বন্যা, উড ফায়ার, দুর্ভিক্ষ ছাড়াও মানুষের অবয়বধারী হায়েনারাও আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত অগণিত তরতাজা প্রাণ ছিনিয়ে নিচ্ছে। আমেরিকান গান আর্কাইভের পরিসংখ্যান অনুসারে, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে যত লোক প্রাণ হারিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নিরপরাধ আমেরিকান শিশু-কিশোর-ছাত্র-জনসাধারণ প্রাণ হারিয়েছেন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রধারীদের বর্বরোচিত হামলায়। বস্তুত, এসব নরপশু-হায়েনার রক্তরঞ্জিত হাতের ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি নিষ্পাপ শিশু, অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং সন্তানসম্ভবা জননী, শিক্ষক-চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং নার্সরাও। খুনের নেশায় উন্মত্ত মনুষ্যরূপী এসব হায়েনার পাশবিক প্রবৃত্তি ও প্রতিযোগিতার লাগাম এ মুহূর্ত থেকে টেনে ধরা না গেলে নিকট ভবিষ্যতেই বিশ্বসভ্যতার কবর রচিত হবে এবং গোটা বিশ্বে নরখেকো দস্যুদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হবে।

১৯৫০ এর দশকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, তৎকালে কলেরা-বসন্ত জাতীয় রোগব্যাধি বা মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে গোটা পাড়া-মহল্লা এমনকি দেশজুড়ে বর্ণনাতীত ভীতিবিহ্বলতা সৃষ্টি হতো। চোর-ডাকাত, মুনাফাখোর-তস্করদের চিরায়ত পাশবিক প্রবৃত্তিতেও রাতারাতি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সূচিত হতো এবং মরণের ভয়ে তারাও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সর্বাংশে বর্জন করে জগদীশ্বরের আরাধনায় মত্ত হতো। ধার্মিক-অধার্মিক নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবনিতা বিশ্ব প্রতিপালকের আরাধনায় অহর্নিশ ব্যস্ত থাকায় সর্বত্র আত্মোপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির পরিবেশ বিরাজ করত। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের একুশ শতকের বর্তমান মাহেন্দ্রক্ষণে দুর্ভাগ্যক্রমে বর্তমান দৃশ্যপট সেই সনাতনী যুগের দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনস্বীকার্য যে প্রাণঘাতী করোনা লাখ লাখ তরতাজা প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে, বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটিয়েছে, স্বজনহারা অসংখ্য পরিবারের আর্তনাদে বিশ্বের আকাশ-বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে এবং কোটি কোটি মানুষ এখনো বর্ণনাতীত দুর্দশার সাগরে ভাসছে।

অথচ পরস্বহরণকারী মুনাফাখোর-মনুষ্যরূপী হায়েনা-লুটেরা-তস্কর ও অসহায় জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় আকণ্ঠ নিমজ্জিতদের স্বভাবসিদ্ধ ঘৃণ্য প্রবণতায় করোনা বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেনি। ফলে একদিকে ছোটখাটো অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে লাল বাতি জ্বলেছে; খেটে খাওয়া মানুষ, শ্রমিক-কর্মচারী-প্রান্তিক চাষি ও বানভাসি কোটি কোটি জনগণের দুঃখ-কষ্ট-দুর্ভোগ তুঙ্গে উঠেছে; অন্যদিকে সহমর্মিতার স্থলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অনল দাউদাউ করে জ্বলেছে। বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে উঠতি কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে, বিলিয়নারদের ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলেফেঁপে স্ফীত হয়েছে। আর বৃহস্পতি-মঙ্গলগ্রহ-মহাকাশ অভিযান, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি মুখরোচক বুলির আড়ালে মেগা দুর্নীতি গোটা বিশ্বের সমাজদেহ এবং জাতীয় জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুরারোগ্য ক্যানসারের মতো বিস্তার লাভ করেছে। তাই ধান ভানতে মহীপালের গীত না গেয়ে সংক্ষেপে বলা যায়, রাশিয়ার ইউক্রেন হামলা, বাংলাদেশের ঘাড়ে আট লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর দুর্বহ বোঝা, আফগানিস্তান-ইরাক-তুরস্কে চোরাগোপ্তা হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি, পাকিস্তানে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চার যুগেরও বেশি সময়ের অমীমাংসিত ফিলিস্তিন সমস্যা, করোনার নতুন প্রলয়নৃত্যের হুঁশিয়ারিসহ অসংখ্য অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির দায়ভার বিশ্ববাসীর কাঁধে চেপে দিয়ে ২০২২ সাল বিদায় নিচ্ছে এবং ২০২৩ সালের নতুন সূর্যোদয় ঘটছে আগামী রোববার।

মহাকালের বিচারে ধর্তব্যের আওতায় না এলেও ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি বছরকে উপেক্ষা করার সুযোগ বিন্দুমাত্র নেই। স্বার্থের ঘেরাটোপে আচ্ছাদিত বিশ্বচরাচরে একটি বছরে অসংখ্য রাজ্য-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের সাথে সাজুয্য বজায় রেখে জাগতিক নিয়মে জন্ম-মৃত্যুর লীলাখেলাও অহর্নিশ চলতে থাকে। তাই ২০২৩ সালের সূচনালগ্নে যাবতীয় ঘাত-প্রতিঘাত সাহসিকতা ও ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা এবং মহান আল্লাহর যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্তকে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ার তৌফিক দানের জন্য বিশ্ব প্রতিপালকের কৃপা ভিক্ষা করছি। আমিন!

অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও প্রবাসী হিসেবে বলছি, সারা বিশ্বের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মতো আমরাও স্বজনদের আজন্মের স্নেহবন্ধন ছিন্ন করে উন্নত জীবনযাপন, বাড়তি আয়, উচ্চশিক্ষা ইত্যাদি নানা কারণে যুগপৎ বুকভরা আশা ও ভীতিবিহ্বলতা নিয়ে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়িয়েছিলাম। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক শিপ-জাম্পার, উচ্চ পেশাজীবী এবং স্বজনদের মাধ্যমে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণকারী ছাড়া অসংখ্য বাঙালি শ্বাপদসংকুল বন-বাদাড়, দুর্লঙ্ঘ পথ মাড়িয়ে শেষে আটলাটিকের এ পাড়ে বসতি গড়েছেন। অদম্য সাহস, নিরতিশয় ত্যাগ স্বীকার, ধৈর্য ও অমানুষিক পরিশ্রমের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙালিদের উল্লেখযোগ্য অংশই সময়ের অগ্রযাত্রায় অবশেষে ভাগ্যলক্ষ্মীকে ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা এবং সহস্র প্রতিবন্ধকতা পদদলিত করে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন এবং নিজেদের পোষ্যদেরও শিক্ষাদীক্ষায় একুশ শতকের চাহিদার উপযোগী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, চিকিৎসাব্যবস্থা, গৃহায়ণ, অবকাঠামো, সড়ক ও জনপথ তথা সর্বত্র উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন, মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও গতিশীল নেতৃত্বের অধিকারী বাঙালিদের বর্তমান অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষাদীক্ষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রেই প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির দৃষ্টিনন্দন অর্জন বিশ্ব অভিবাসীর দেশ আমেরিকায় বাংলাদেশের জন্য রাশি রাশি প্রশংসা কুড়াচ্ছে। তবে প্রবাস কমিউনিটিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সূচনালগ্নের সহমর্মিতার বন্ধনে বড় ধরনের চিড় ধরেছে। এখন নানাবিধ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নেতৃত্বের প্রশ্নে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে এবং সিংহভাগ ক্ষেত্রেই কোর্ট-কাছারির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। আবার বাঙালির সহস্র বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ আমেরিকার মেল্টিংপটের অপসংস্কৃতির প্রচণ্ড আঘাতে বহুলাংশে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ফলে দিনে দিনে পারিবারিক বন্ধনও শিথিল হচ্ছে, পান থেকে চুন খসে পড়ার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ভুল-বোঝাবুঝি আদালতে গড়াচ্ছে এবং সংসার ভাঙার প্রবণতাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে সুখের সংসারে রাহুর পদচারণ ঘটায় বিচ্ছেদপ্রাপ্ত দম্পতিদের সন্তান-সন্ততিরা চরম দুর্দশার শিকার হচ্ছে। আর রাজনৈতিক কোন্দলের বিষক্রিয়া গোটা প্রবাস কমিউনিটির শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে রাজনৈতিক অন্ধ বাতিক বা ঘৃণ্য মতাদর্শ বশে বাংলাদেশিরা পারস্পরিক সৌজন্যমূলক আচরণ তো দূরের কথা, মুখ দেখাদেখিও হারাম জ্ঞান করছে। অবশ্য মেইন স্ট্রিম রাজনীতিতে কিছুসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির উত্থান নতুন আশারও জন্ম দিচ্ছে।
বস্তুত, আটলান্টিকের এ পারে বসতি গড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাওয়ার চেয়ে হারানোর এবং অর্জনের তুলনায় বর্জনের পাল্লা নেহাত হালকা নয়।
প্রবাসজীবনে সুখ ও ঐশ্বর্যের সাগরে নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বে স্বদেশপ্রেমের অন্তঃসলিলা ফল্গুধারা প্রত্যেক প্রবাসীর মনমন্দিরে সতত প্রবহমান। তাই স্বজনদের বিয়োগব্যথার সংবাদে নিজেদের অজান্তেই আমরা অশ্রুসজল হয়ে উঠি। অথচ দায়িত্ব এবং কর্তব্যের রজ্জুতে আঁটসাঁট বাঁধা আমরা জীবন-জীবিকার তাগিদে অশ্রুসজল নয়নে বরফগলা আবহাওয়া উপেক্ষা করে বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে বাধ্য হই। আবার ছাপোষা শ্রমিক থেকে অঢেল বিত্তশালী প্রত্যেক প্রবাসীর শেষ জীবন কাটে বৃদ্ধাশ্রমে। প্রবাসজীবনের কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত প্রাসাদোপম অট্টালিকায় মালিকের মৃত্যুর সংবাদ তেমন মেলে না। আর বাংলাদেশে আমাদের মতো প্রবাসীদের অবস্থান না ঘরকা, না ঘাটকা। তাই প্রবাসজীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে পাথরচাপা দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রকারান্তরে সুখে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বাড়িভাড়ার দৌরাত্ম্যে সিংহভাগ প্রবাসী বাংলাদেশি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির শিকার। এসব সত্ত্বেও নিজেদের করুণ অবস্থার কাহিনি স্বদেশের স্বজনদের কাছে বলতে গেলে তারা বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেন। ফলে মুখের ওপর হাত এবং বুকের ওপর পাথরচাপা দিয়েই সিংহভাগ ছাপোষা প্রবাসী সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছেন। যাহোক, নিরবচ্ছিন্ন সুখ-শান্তি মাটির পৃথিবীতে প্রত্যাশা করা যায় না। তাই সুখ-দুঃখের ভেতর দিয়েই আমাদের পার্থিব জীবন নির্বাহ করতে হবে। আর প্রকৃত বুদ্ধিমানরা পার্থিব ঐশ্বর্য, বিলাসবহুল জীবনযাপনের চেয়ে পারলৌকিক কল্যাণকে প্রাধান্য দেন এবং স্বল্পে পরিতুষ্ট জীবন যাপন করেন। তাদের চাহিদা নিতান্ত কম বলে আকাক্সক্ষা এবং অসন্তুষ্টিও অপ্রতুল। উপসংহারে ২০২৩ নববর্ষে বিশ্ববাসীর মনুষ্যত্ববোধের কাক্সিক্ষত উন্মেষ সাধনই কায়মনোবাক্যে কামনা করছি।

ঠিকানার পক্ষ থেকে কবি-সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক-জ্ঞানী-গুণী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি রইল উষ্ণ শুভেচ্ছা।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।
২৭ ডিসেম্বর ২০২২