মনের কথা শুনুন

ফরিদা শহীদ

আমি ম্যানহাটনে একটি ফার্মেসিতে কাজ করি। উক্ত কোম্পানীর বর্তমানে ২৫৯টি ফার্মেসি রয়েছে। যখন আমি কাজে ঢুকেছিলাম, অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে তখন দোকানের সংখ্যার ছিল মাত্র ১৮টি। কম্পিউটার ছিল না, তাই টাইপরাইটার দিয়ে হেড ফার্মাসিস্ট প্রেসক্রিপশনের লেভেল টাইপ করতো। যাহোক, অনেক সময় আমাদের দোকানে ওষুধ না থাকলে আমরা আমাদের অন্য দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে আসতাম। আমি ফার্মেসিতে টেকনিশিয়ানের কাজ করতাম। প্রতিদিন তিন শতাধিক প্রেসক্রিপশন আমরা করতাম। তার মধ্যে দু শ নতুন প্রেসক্রিপশন। প্রায় একশ হলো রিফিল, অর্থাৎ রিপিড। মূল প্রেসক্রিপশনের সাথে সাথে ২/৩ বার ওষুধ নেয়ার জন্য ডাক্তারের পারমিশন থাকে, সেটা আর কি।
সাধারণত আমাদের অন্য দোকান থেকে ওষুধ আনার প্রয়োজনে আমি যেতাম। পথে বেরুতে আমার খুব ভাল লাগতো। গরমকালে প্রায় প্রতি শনি-রবিবারে কোথাও না কোথাও পথমেলা থাকতো। আমি যখন বাইরে যেতাম, তখন লাইট পোস্ট, দেয়ালে লাগানো প্রোগ্রাম সূচি পড়ে আসতাম। শনি ও রোববার আমি কাজ করি না। তখন ছেলেমেয়েকে নিয়ে ম্যানহাটনে মেলা দেখতে যেতাম। টোকেনের মূল্য ছিল ৯০ পয়সা। আমার ও মেয়েটির টোকেন লাগতো। তবে ছেলে ছোট হওয়াতে সে ফ্রিতে ট্রেনে, বাসে আসা-যাওয়া করতো।
গরমকালে ম্যানহাটানের কোন পথমেলা আমি বাদ দেইনি। গরমে বাইরের চেহারাটাই ভিন্ন। সবার মনে কেমন একটা আনন্দ আনন্দ ভাব। ভারি কোর্ট-বুট পড়তে হয় না। পথেঘাটে ¯েœা নেই, হাল্কা কাপড়েই স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করা যায়। আমার বাচ্চারাও ঘুরতে খুব পছন্দ করে। মেলা না থাকলে তাই তাদের নিয়ে দর্শনীয় সব জায়গায় ঘুরতে যাই। কোথায় না গেছি? এমন হয়েছে কোন কোন স্থান একের অধিকবার যাওযা হয়েছে। বাংলাদেশ বা অন্য স্টেট থেকে আমার কোন আত্মীয়-স্বজন এলে তাদের ঘুরিয়ে দেখাতে আমার খুব ভাল লাগতো। ওদের সাথে ছেলেমেয়েদেরও সাথে নিয়ে বেড়াতাম।
আমি আমার আত্মীয়দের নিয়ে যাই প্রথমেই স্ট্যাচু অব লির্বাটি, ওয়াল স্ট্রিট, ব্রডওয়ে হয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ওপরে আবজারভেসন ডেস্কে কাঁচ দিয়ে ম্যানহাটনের খুব সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করি। এখন ব্রডওয়েতে একটি ব্রোঞ্জের ষাঁড়ের ভাস্কর্য আছে। আগে, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভার স্ট্রিটের ফার্মেসিতে কাজ করতাম, তখন পর্যন্ত গরুটা দেখিনি। পরে জেনেছি, ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে এটি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বসানো হয়। পরেরদিন সরিয়ে বোলিংগ্রিন সাবওয়ে ও ব্রডওয়ের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। সাড়ে তিন টন ওজনের ব্রোঞ্জের তৈরি ১৮ ফুট লম্বা এই ষাঁড়টি আটুর ভি মডিকা তৈরি করেন।
১৯৮৭ সালে এ স্টক এক্সচেঞ্জে বড় রকমর ধস নামে। তখন সেই বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে সাহসের সাথে বেরিয়ে আসার প্রতীকী তৈরি করতে মি. ডি মডিকাসে উদ্বুদ্ধ করে। দু বছর লাগে একটি তৈরি করতে। ১৯৮৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর এটি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বসানো হয়। এর ২/৩ দিন পর সেখান থেকে সরিয়ে বর্তমান স্থানে স্থায়িভাবে বসানো হয়। প্রতিদিন বহুসংখ্যক পযর্টক ষাঁড়টিকে নিয়ে ছবি তোলে। যাহোক, আমার ছেলেমেয়ে, ভাইও বাদ পড়েনি ছবি তোলা থেকে।
পরের কয়েকদিন তাদের দেখাতে নিয়ে যাই অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, টাইম স্কোয়ার, জাতিসংঘ বিল্ডিং, মেডিসন স্কোয়ার গার্ডেন, সেন্টাল পার্ক, ট্রাম্প টাওয়ার, সিটি হল, প্লাজা হোটেল, রকফেলার বিল্ডিং, রেডিও সিটি হল, চায়না টাউন ইত্যাদি। তারপর তিন ঘন্টার ক্রুজিং, রুজভেল্ট আইল্যান্ড, জ্যাকসন হাইটস, এস্টোরিয়া পার্ক নিয়ে যাই। আরো বেশিদিন থাকলে মিউজিয়াম-চিড়িয়াখানার দিকে যাই। আমি সবসময় ভাবি- একজন মানুষ আমার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে, অনেক বড় জার্নি ও খরচ করে। তাই সবসময় চেষ্টা করি তাদের এ জার্নিটাকে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে দিতে।
আমার এক বান্ধবী ক্যালিফোর্নিয়া থেকে তার বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছে। আমার সাথে দেখা করার স্থান ঠিক হলো টাইম স্কোয়ার। কাজ থেকে ফিরে আমি যখন তার সাথে টাইম স্কোয়ারে মিলিত হলাম, তখন বহু বছরের জমে থাকা আনন্দের ফুলঝুড়ি দুজনেরই মুখ থেকে যেন ঝরতে লাগলো। বান্ধবী আমার চা-কফি খায় না, তাই সামনের দোকান থেকে আইসক্রিম এনে চেয়ার নিয়ে বসলাম। পথে বসে এ বয়সে আইসক্রিম খেতে প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে বেশ সহজেই খাওয়া শুরু করলো। চলতি বছরের জুলাই মাসেই আমার ভাইকে নিয়ে এই টাইম স্কোয়ারে বসে স্টারবক্স থেকে কফি নিয়ে বসে প্রায় ঘণ্টা দু সময় কাটিয়েছিলাম। মুক্তধারার বই মেলায় ঢাকা থেকে তার অঙ্কুর প্রকাশনীর বই নিয়ে এসেছিলেন। বছরে একবার মুক্তধারার সৌজন্যে বই মেলায় তিনি নিয়মিত আমন্ত্রিত হন।
যাহোক, টাইম স্কোয়ারের চারদিকে বিলবোর্ডের আকর্ষণীয় এডভারটাইজের মাঝে বসে থাকতে বেশ ভালই লাগে। বিলবোর্ডের বর্ণচ্ছটায় রঙ্গিন হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তারই মাঝে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ আর বিনোদন খুঁজে পায় এই সদাচঞ্চল ম্যানহাটনে। এখনও আমার বান্ধবী সেদিনের আইসক্রিম খাওয়ার কথা বলে হাসে। তবে এটা সত্য, কিছুটা সময় আমরা দু’জন ষাটোর্ধ মহিলা যেনো টিনএজার হয়ে গিয়েছিলাম মনেপ্রাণে।
আরেকবার ফ্লোরিডার মায়ামী থেকে আমার আরেক বান্ধবী বেড়াতে এলে ঠিক হলো আমরা ৩৪ স্ট্রিটে মেসির সামনে মিলিত হবো। আমি তখন ফার্মেসির হেড অফিসে কাজ করতাম। সেটা ছিল ৩৪ স্ট্রিট নাইনথ্ এভিনিউ। আমরা ৩৪ স্ট্রিট ধরে ঘোরাঘুরির পর এইটথ্ এভিনিউর পোস্ট অফিসের সিঁড়িতে বসে বয়স ভুলে ছোটদের মত চুষে চুষে আইসক্রিম শেষ করলাম। কোন কোন সময় মন যা চায় তা করা মন্দ না! সাংসারিক নানা রকম চাপ, স্বাস্থ্যের দুরবস্থার কথা ভুলে বয়সে নুইয়ে পড়া দেহ ও মনটাকে চাঙা করা যায়।
আমেরিকায় কেউ কারো দিকে ফিরে তাকায় না, তাই পথের ধারে বসে আাইসক্রিম বা লাঞ্চ করা কোন সঙ্কোচের ব্যাপার না। দুপুরে আশেপাশের অফিস থেকে মানুষরা লাঞ্চ কিনে এই পোস্ট অফিসের সিঁড়িতে বসে লাঞ্চ করে থাকেন। আমার অফিস ৩৪ স্ট্রিটে হওয়ায় যেদিন লাঞ্চ কিনতে বাইরে যেতাম, সেদিন সোজা পোস্ট অফিসের সিঁড়িতে বসে লাঞ্চ সেরে নিতাম।
একঘেঁয়েমিপূর্ণ জীবন থেকে নিত্যদিনের রুটিন একটু অদল-বদল করে আনন্দময় করে তুলতে আমি সব সময় সচেষ্ট থাকি। চেষ্টা করি সময়-সুযোগ পেলেই ছোটখাটো ট্যুর করতে। চাইনিজ ট্যুর কোম্পানি থেকে নিয়মিত ব্রুসিয়ার আসে আমার কাছে। তাদের সাথে কখনো কখনো এক বা দুদিনের ট্যুরে যাই। ওদের সার্ভিস একটু সস্তা, তাই অল্প খরচে বেড়ানোর আনন্দটা ষোল আনাই পাওয়া যায়।
এছাড়া ম্যানহাটানের হোটেলে যখন সেল থাকে, তখন ২/১ রাত হোটেলে থেকে লাঞ্চ-ডিনার, ফাস্টফুড টেস্ট করা, হেঁটে হেঁটে বেড়ানো, শপিং করা, বাড়ি যাওয়ার কোন তাড়া নেইÑ তখন ভাবতে খুব ভাল লাগে যে আমি এখন ম্যানহাটানের বাসিন্দা! তেমনই আবার ৩৮ স্ট্রিটের এইটথ্ এভিনিউয়ে একটি ছোট হোটেলে সাড়ে তিনশ ডলারে একদিনের জন্য ৮/৯ মাস আগেই বুক করলাম, নয়তো খালি পাওয়া যাবে না। দিনটি হলো ৩১ ডিসেম্বর। বুঝেন এবার কত মজা হবে! টাইম স্কোয়ারে বলড্রপ দেখবো। হাঁটাপথে বলড্রপিং দেখে পথের ফুডকার থেকে খাবার কিনে অনেক রাতে হোটেলে ফিরে এলাম। সকাল এগারোটায় ব্যাগ স্টোরেজে রেখে বেরিয়ে গেলাম। রাতের টাইম স্কোয়ার দেখেছি। নতুন বছরের প্রথম প্রহরের স্বাদ নেয়ার জন্য আবার টাইম স্কোয়ারে গেলাম। রাতেই রাস্তা পরিষ্কার করা হয়েছে। মানুষের ভিড় আর ভিড়! দোকানিরা নতুন বছরের স্যুভেনিয়র দিয়ে দোকান সাজিয়েছে। পর্যটকরা ঠা-ার মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। আমার হাজব্যান্ড বাসায় যাবার জন্য সারাক্ষণ উসখুস করছিল। তাই হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে ট্রেনে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ির কাছে ম্যানহাটন, তবুও একটা বেড়ানোর আমেজ মনেপ্রাণে দোলা দিচ্ছে।
আমার মত সবাই অবশ্য ঘোরাঘুরিতে আনন্দ পায় না। অনেকে বেড়ানোর চেয়ে কেনাকাটায় বেশি আনন্দ পান। মনের খুশির জন্য তাদের মনের কথা শুনা উচিত। জীবনে কিছু আনন্দ আনতে চিরাচরিত নিয়মমাফিক চলায় কিছু রদবদল করা খুবই জরুরি। মন প্রফুল্ল থাকলে বাড়ির আবহাওয়াতেই বসন্তের ছোঁয়া লাগে!
জীবন একটিই! বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। অন্যান্য দেশে গড় আয়ুর থেকে অনেক কম। বেশ কয়েক বছর আগে কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখানে পথেঘাটে অনেক বয়স্ক মানুষ দেখেছি, যা আমাকে অবাক করেছে! বাংলাদেশে অবশ্য সে রকম চোখে পড়ে না। ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামান্য খুশিতে না হয় বাড়তি কিছু করিÑ ক্ষতি কি? তার রেশ থাকে অনেকদিন! আমি সব সময়ই পজেটিভ ভাবনার মানুষ। তাই আমার ভাললাগার জিনিসটির পিছনে আমি উল্কার মত ছুটে চলি!
নিউ ইয়র্ক।’