মফিদুল হক বলেছেন: মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক

ঠিকানা রিপোর্ট : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা পাশ্চাত্যের সংবাদ মাধ্যম, বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা, লেখালেখি এবং পাঠ্যপুস্তকসমূহে যেভাবে উঠে আসা উচিত ছিল সেভাবে উঠে আসেনি। ফলে বিশ্ববাসী এবং যুব সমাজ বাংলাদেশে সংঘটিত বর্বরতা যেভাবে জানার কথা ছিল, সেভাবে জানার সুযোগ পায়নি। আজ সময় এসেছে বিস্মৃতির সেই ধুলো ঝেড়ে দখলদার বাহিনী গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে যে নারকীয় বর্বরতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তা তুলে আনার।
কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের পরিচালক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী লেখক মফিদুল হক। গত ১২ নভেম্বর সোমবার কানেকটিকাটের ইউকন ভার্সিটিতে হিউম্যান রাইটস ইনস্টিউট আয়োজিত দুপুর ১২টায় ‘ওয়ার মেমরি অ্যান্ড মিউজিয়াম অব বাংলাদেশ’ এবং বিকাল ৪টায় ইস্টার্ন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ‘ফরগটেন জেনোসাইড অব বাংলাদেশ ১৯৭১ : লেসন ফর দি ফিউচার’ শীর্ষক দুটি পৃথক সেমিনারে মফিদুল হক প্রধান বক্তা হিসেবে কথাগুলো বলেছেন। মফিদুল হককে পরিচয় করিয়ে দেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সারা তাসমিম। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. মেহেদী আনোয়ার, প্রফেসর ড. নিকোল কারা রাসেল, ড. আনিয়া ক্রিসম্যান, প্রফেসর জেনে মেজনার, ড. মিজান খান। সঞ্চালনা করেন ক্যাথরিনা মাসুদ। সেমিনার শেষে ড. সারা তাসমিম ও ড. মেহেদী আনোয়ারের বাসভবনে এক ঘরোয়া আলোচনায় মফিদুল হকের সঙ্গে যোগ দেন ‘বাংলাদেশ : দি আনফিনিশড রেভেলিউশন’ গ্রন্থের রচয়িতা বিখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিপশুলজ। তারা সেখানে ঘরোয়া পরিবেশে মতবিনিময় করেন। মফিদুল হক দুটি সেমিনারেই বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি, গণহত্যা, নতুন প্রজন্ম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায় অভিন্ন বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, সকল জাতিরই অনন্য ইতিহাস রয়েছে। তিনি বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামাজিক শক্তিকে মূলধনে রূপান্তরিত করতে হবে।
জনাব হক বলেন, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে কাজ করে।
তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, শুরু থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ও বিভক্তি বিদ্যমান থাকে। দুই উইংয়ে কেবল ধর্ম এক, আর সব কিছুই ভিন্ন। পশ্চিম পাকিস্তান সব সময় বাঙালিদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানকে তারা উপনিবেশ হিসেবে শোষণ করেছে। এই বঞ্চনা থেকে মুক্তির লড়াই-ই মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু ৯ মাসের এই যুদ্ধ, গণহত্যা পশ্চিমের দেশগুলোর ইতিহাসে সঠিকভাবে উঠে আসেনি। তাদের মধ্যে প্রত্যাখ্যান, অস্বীকারের (ডিনায়াল) নেতিবাচক প্রবণতা কাজ করেছে।
মফিদুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধু ’৭১ এ পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। ’৭২ এর জানুয়ারিতে মুক্তি পেয়ে দেশে আসেন। কিন্তু ’৭৫ এর ১৫ আগস্টে সপরিবারে নির্মমভাবে খুন হন ঘাতকদের হাতে। তখন থেকে ’৯৬ পর্যন্ত তারাই ক্ষমতায় থেকেছে। ঘাতকদের কিছু হয়নি। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম গণআদালত করে ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করে রাষ্ট্রের আদালতেও বিচার দাবি করেন। সেই গণআদালত থেকে মানুষের মধ্যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সকল ইতিহাস সন্ধান এবং সগৌরবে তা সংরক্ষণ করার জন্য। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, না বলা ইতিহাস, পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সব লেখা, বিপোর্ট, ভিস্যুয়াল ডকুমেন্ট সংরক্ষণে একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে সব ডিসপ্লে করা হয়।
মফিদুল হক বলেন, দেশের আনাচে-কানাচে গণকবরের সন্ধান করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ এবং অবিকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ জাছুঘরের মাধ্যমে দেশব্যাপী গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি বলেন, শাহবাগ চত্বরে যুব সমাজের গণজাগরণ মঞ্চ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকে নতুন করে জাগ্রত করেছে। যা নতুন প্রজন্মের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ মানুষের মানবিক সাহায্যের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরাও এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারাও সকল সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল, আশ্রয় দিয়েছিল। রোহিঙ্গাদের প্রতিও আমাদের সেই মনোভাবই কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভলান্টিয়ার পাঠিয়ে থাকি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে মফিদুল হক বলেন, সরকারের প্রভাব মুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য আমরা তহবিল সংগ্রহ করে জমি কিনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করছি। এটি ১৭ মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট। বেসরকারিভাবে তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।