মমতাকে ছাড়াই মুখরক্ষার তিস্তা চুক্তি হতে পারে

নিজস্ব প্রতিনিধি : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে চুক্তির নিশ্চিত আশ্বাস নিয়ে ফেরেনি ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশে ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগেই এ চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে মোদি তার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে মোদি একান্ত আলোচনায় এ কথা বলেন বলে কাদেরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। তবে সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেই এই চুক্তি সম্পাদনের কথা নিশ্চিত করে বলেনি। তিন বছর মেয়াদি মুখরক্ষার অন্তর্বর্তী চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আভাস দিয়েছেন।
তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মোদি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এতে অন্তরায় হয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের ব্যাপারে মমতা সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ করলেও তিস্তা চুক্তির প্রশ্নে তার নীতি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলে। নয়াদিল্লি ও ঢাকা থেকে কূটনৈতিক, ব্যক্তিগত পর্যায়েও নানাভাবে চেষ্টা করে মমতার এই মনোভাবে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। এর পেছনে পানির প্রয়োজনের চেয়ে বিজেপি-তৃণমূলের দ্বন্দ্ব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি, আরএসএসের উত্থান তৃণমূলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ রক্তক্ষয়ী হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। তৃণমূল নেতা মুকুল রায়কে মামলায় জেলে পোরার ঘটনা ছাড়াও কেন্দ্র কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিশ্রুত বকেয়া অর্থ না দেওয়া, সাবেক ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনে অর্থ ছাড় না করাসহ বেশ কিছু ঘটনা বিজেপি সরকার ও তৃণমূলের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছে। বিজেপি আশা করছে, আগামী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে তিস্তা চুক্তি করা হলে তা জলপাইগুড়িসহ তিস্তা বিধৌত এলাকায় তৃণমূলের বিপক্ষে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, নয়াদিল্লিও সে ধরনের একটা পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় তৃণমূলকে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সাধারণভাবে তিস্তা নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে উভয় পক্ষের স্বার্থ কমবেশি রক্ষা করে একটা পারস্পরিক সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পক্ষে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধ জিইয়ে রাখার পক্ষে নন তারা। এদিকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিদ্যমান গভীর আস্থাশীল সম্পর্ক অধিকতর উচ্চতায় এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে আছে তিস্তার পানিবণ্টন। নির্বাচনের আগে এ চুক্তি সম্পাদিত না হলে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যে ক্ষতি হবে, তার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। নরেন্দ্র মোদিকেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতার দায় নিতে হবে। ভারতে নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তি হলে তার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়লে তার দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের ওপরই বর্তাবে বলে নয়াদিল্লি মনে করে। এতে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তেমন ক্ষতির আশঙ্কা কম। সিপিএম, সিপিআই কংগ্রেস আগে থেকেই মমতার চুক্তিবিরোধী অবস্থানের বিপক্ষে মত রেখেছে।
কূটনৈতিক ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের সম্মতিতে তাদের সঙ্গে রেখেই আন্তদেশীয় চুক্তি সম্পাদনের পক্ষে। মোদি সরকার সে চেষ্টা অব্যাহতভাবে করে আসছে। নয়াদিল্লি শেষবারের মতো চেষ্টা করবে। এমনকি নরেন্দ্র মোদি নিজেও মমতার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবেন। মমতা তার মনোভাবে পরিবর্তন আনলে নরেন্দ্র মোদি তার সম্মতিতে এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় এসে তিস্তা চুক্তি করতে চান। তেমনটি না হলে কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবেই চুক্তি সম্পাদন করবে। উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে পূর্ববর্তী খসড়া চুক্তিতে প্রস্তাবিত বণ্টন হার থেকে সরে আসতে হবে। বাংলাদেশ চায় কোনো রকম সম্মানজনক একটা চুক্তি করতে, যাতে ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা থাকবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি ছাড়াই বাংলাদেশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার আভাস বাংলাদেশের মন্ত্রীকে দিয়েছেন বলে জানা যায়। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক কারণেই ওবায়দুল কাদের ভেতরের কথা প্রকাশ না করে তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার কথা বলেছেন।
সাংবিধানিকভাবে আন্তদেশীয় নদ-নদীগুলো সংশ্লিষ্ট রাজ্যের তালিকাভুক্ত। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের রায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে গেলেও নয়াদিল্লি রাজ্য সরকারকে পাশ কাটিয়ে প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আগে বিষয়টি সংবিধানের আওতাভুক্ত করতে চায়। অর্থাৎ রাজ্যগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদ-নদী রাজ্য সরকারের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারাধীন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় নয়াদিল্লি। এ জন্য সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন। কাজটিও সময়সাপেক্ষ।