মাইনাস টু থিওরি বাস্তবায়নে বিগ বাজেট : খালেদার ধমকে চুপ গোয়েন্দা কর্তা

বিশেষ প্রতিনিধি : মাইনাস মা-ছেলে থিওরিতে সর্বশক্তি ক্ষয় করে চলছে সরকার। খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে বন্দী করার মাধ্যমে বিএনপিকে রাজনীতির শেষবিন্দুতে নেওয়ার পর্ব সাঙ্গ হয়েছে বলে নিশ্চিত সরকারের একটি অংশ। এখন বাকি ছেলে তারেক রহমান। তার আর বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুযোগই না রাখার নানামুখী আয়োজন চলছে। এখন চলছে খÐিত বিএনপিকে নির্বাচনে আনার প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রক্রিয়াটি এক পা এগোলে রহস্যজনকভাবে তিন পা পিছিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির সুবিধাবাদী-ডিগবাজ, নানা কারণে ক্ষুব্ধ একটি গ্রæপ সরকারের সঙ্গে সায় দিয়েও আবার লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। এদের মতিগতিতে সরকার রীতিমতো উদ্বিগ্ন। তা রাজনৈতিক খেলার ভেতর কোনো সুপার গেম কি না, এ প্রশ্নবিদ্ধ তারা। কিছুদিন আগেও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে নিজ দলের অনিষ্টকরণে উদ্্গ্রীব এমন কিছু নেতা-কর্মীও খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পর ইউটার্ন দিয়েছেন। তাদের অনেকেরই বিশ্বাস, খালেদা জিয়ার কারাবাসে মানুষের সহানুভ‚তির পাল্লা তাদের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে, গত এক যুগে দল ভাঙার কোনো চেষ্টাই কাজে আসেনি। দলের কেউ আওয়ামী লীগে ভেড়েনি। বিশেষ আলামত বুঝেই নামকরা ডিগবাজরাও এখন দলছুট হতে চান না।
খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে নাÑএমন ঘোষণাও সরকারের জন্য বিরক্তির। দলটি এখনই এমন ঘোষণা দিয়ে বসবে, সেটি ধারণায় ছিল না সরকারের। আবার খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, তাকে ছাড়াই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবেÑমন্ত্রীদের এমন আগাম কথাবার্তা পরি¯িতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। গোটা পরি¯িতিই হিসাবের বাইরে চলে গেছে। সরকার যেমনটি আশা করেছিল, বাস্তব সে রকম নয়। ক্ষেত্রবিশেষে উল্টো। এরপরও হাল ছাড়ছে না সরকার। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরোধ বাধানোর দেশি-বিদেশি আয়োজন বেশ জোরদার। তারেক রহমান নেতৃত্বে থাকলে বিএনপির শুধু সর্বনাশই হবে, তাকে সরালে বিএনপি আবার জনপ্রিয় হবে, শেখ হাসিনাসহ সরকারের একটা অংশও বিএনপির প্রতি সদয় হয়ে উঠবেÑএমন ধারণা দলের মধ্যে পাকাপোক্ত করার বিগ বাজেটের মিশন বেশ অ্যাকটিভ।
এ রকম অব¯ার মধ্যে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আপসরফার চেষ্টাও চলমান। এক সূত্রে জানা গেছে, ১২০ সিটের বিরোধী দলের আসনের প্রস্তাব নিয়ে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন একটি গোয়েন্দা সং¯ার প্রধান। বিচারপতি এস কে সিনহা জটিলতা শক্ত হাতে হ্যান্ডেল করা এই কর্মকর্তাকে ধমকিয়েছেন তিনি। বি কেয়ারফুল উচ্চারণ করে তার সঙ্গে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। চাঁছাছিলা ভাষায় বলেছেন, আর কখনো আসবে না এসব ফালতু প্যাঁচাল নিয়ে। ওই কর্মকর্তাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খালেদা জিয়া পাল্টা প্রশ্ন করে বলেছেন, এগুলো কি তোমার কাজ? অনেক করেছ। এসব করতে করতে নিজেদের ইমেজ শেষ করেছ। দেশকেও রসাতলে নিয়েছ। একদিন তোমাদের সবাইকে এর পরিণাম ভুগতে হবে। প্রাকৃতিকভাবেই নিষ্ঠুর পরিণতি হবে তোমাদের। পারলে তোমাদের প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলো কথাগুলো।
এদিকে দিন যত গড়াবে পরি¯িতি তত বিএনপি ও খালেদা জিয়ার অনুক‚লে চলে যাওয়ার আতঙ্ক ভর করেছে সরকারের শরিকদের মধ্যে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ ভুগছেন তারেক রহমান আতঙ্কে। তারেক রহমানের কিছু তৎপরতা ও বিশেষ অঙ্গনের সমীকরণের আপডেট তথ্যের আলোকে এরশাদ ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচনের চাপ দিচ্ছেন সরকারকে। ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন ১৪ দলীয় শরিকদের কেউ কেউ। সরকারের বহুমুখী উৎপীড়ন-উসকানির পরও বিএনপির মধ্যে আক্রমণাত্মক কর্মসূচির তাগিদ না আসা তাদের জন্য উদ্বেগের পাশাপাশি রহস্যজনকও ঠেকছে। সমর্থকনির্ভর হলেও বিএনপিতে নেতা-কর্মী একেবারে কম নন। নেতা-কর্মীদের ওপর ভরসা না করে ভোটার-সমর্থক নির্ভরতায় বিএনপির গণস্বাক্ষর-মৌন মিছিলের মতো নিরামিষ কর্মসূচি ভেতরে ভেতরে ভিন্ন পরি¯িতি তৈরি করছে বলে ধারণা তাদের। সময়ের ব্যবধানে এই নিরামিষই বড় রকমের শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও ভয় কাজ করছে কোনো কোনো মহলে।
মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের সব স্তরের নেতা-কর্মীদের নিত্যদিনের বক্তৃতার বিরাট অংশজুড়ে শুধু বিএনপির সমালোচনা সেই আতঙ্কেরই বহিঃপ্রকাশ। তারা ভবিষ্যতেও দশম সংসদের মতোই একটি সংসদ চায়। সে ক্ষেত্রে এবার বিরোধী দল হওয়ার প্রতিযোগীও অনেক। এরশাদ এবার আর নাটক করবেন না। রোগী বানিয়ে র‌্যাব দিয়ে সিএমএইচে তুলে নিতে হবে না তাকে। হেফাজতকেও সরকার নির্বাচনের জন্য প্র¯ত করেছে। বি চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টও নির্বাচনের জন্য প্র¯ত। এমনকি জামায়াতও নির্বাচনের প্র¯তি শুরু করেছে। আর ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা তো রয়েছেই। এবার ৭০ সিটের আওয়াজ দিলেও বাস্তবে ৭ সিট দিলেও আওয়ামী লীগকে ছাড়বে না তারা। আওয়ামী লীগ থেকে সরলেই তাদের কারো কারো রাজনীতির সঙ্গে জীবনও বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এত আজ্ঞাবহ হাতে থাকার পরও সরকারের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর না করতে চাওয়ার আকাক্সক্ষার পেছনে অন্য তথ্য রয়েছে। এর প্রধান কারণ, বিএনপিকে বাদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাকরণ পূরণ করা অসম্ভব। বিএনপিও এগোচ্ছে সেই ডিমান্ড বুঝেই।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় আপিলে কত দিনে খালেদার জামিন মিলবে, জামিন মিললেও নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন কি নাÑএই সবকিছুই প্রশ্নসাপেক্ষ। তার দ্বিতীয় দুর্নীতির মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের শুনানিও শেষের দিকে এবং মাস দুয়েকের মধ্যেই সেটির রায় আসতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা ধরেই নিয়েছেন, ডজন তিনেক মামলা মোকাবিলা এবং একাধিক মামলায় সম্ভাব্য কারাবাসের ধাক্কা সামলে রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার পুনরুত্থান সহজ নয়। আবার তার একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী তারেক রহমান ইতিমধ্যে একাধিক মামলায় দÐিত হওয়ায় তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে দেশে ফিরে দলের হাল ধরা সম্ভব নয়। তাই পরিবারতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারায় বিএনপির আয়ু আর বেশি দিনের নয়।
বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছে, এ কথা সরকার থেকেই বেশি প্রচার করা হলেও খালেদা জিয়া গত চার বছরে একবারের জন্যও এমন কথা বলেননি। আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গীরা ছাড়া অন্য কোনো দলই ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তা ছাড়া, সিপিবি, বিকল্পধারা, গণফোরাম, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, বাসদসহ সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি ওই নির্বাচন বয়কটকে ভুল বলে স্বীকার করেনি। এ অব¯ায় আরেকটি একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাতে একটি গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্র রচনার পথে বিএনপি উৎসাহিত কি না, এ প্রশ্নও জোরালো হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে তাদের লাভের চেয়ে শুধু সরকারকেই বৈধতা দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় তারা জড়াতে চায় না। সেই হিসেবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা তাদের জন্য মন্দের ভালো।