মাদক-চাঁদাবাজিতে লাখ লাখ ডলার তালেবানের

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : গোটা আফগানিস্তান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তালেবান। দেশজুড়ে গড়ে তুলেছে সন্ত্রাসের রাজত্ব। ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে সমানে লড়ে যাচ্ছে তালেবান বাহিনীর ৬০ হাজার যোদ্ধা।
গত ১৭ বছর ধরে মার্কিন বাহিনীর সামরিক ও আর্থিক সহায়তা সত্ত্বেও কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে সংঘাত এখন আরও তীব্র ও জটিল আকার নিয়েছে। চোরাগোপ্তা হামলায় দিশেহারা সরকারি বাহিনী। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে তালেবান। ব্যর্থতার দায় নিয়ে ঘাঁটি গোটাচ্ছে মার্কিনিরাও। প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ও বিশাল বাহিনী পরিচালনায় অর্থ কীভাবে পায় তালেবানরা। সম্প্রতি বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তারই জবাব। প্রধানত মাদক পাচার, নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে কর ও চাঁদাবাজি ও বিদেশি অনুদানসহ নানা উৎসের উপর ভর করে চলে ব্যয় নির্বাহ।
কতটা সম্পদশালী তালেবান : ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল। এই পাঁচ বছর আফগানিস্তান শাসন করে তালেবান। ক্ষমতা থেকে পতনের পর থেকে দেশজুড়ে জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে আসছে গোষ্ঠীটি। নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠনটি কিভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং প্রকৃতপক্ষে তাদের কত সম্পদ আছে তা বলা মুশকিল। এ ক্ষেত্রে অনুমানই ভরসা। কারণ কখনই সম্পদের হিসাব প্রকাশ করে না তারা। বিবিসি জানিয়েছে, আফগানিস্তানের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে সন্তর্পণে আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে তালেবান।
সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে করারোপের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে তারা। এক হিসেবে ২০১১ সালের দিকে গোষ্ঠীটির বার্ষিক আয় ছিল ৪০ কোটি ডলার। মূলত অনুদান, স্থানীয় কৃষক কর আদায়, মাদক ব্যবসায়ী, ফোন কোম্পানি, ত্রাণ সংস্থাগুলোর কাছে চাঁদার মাধ্যমেই এই অর্থ আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়ায় দেড়শ’ কোটি ডলারে।
আফিম চাষিদের ওপর কর ও চাঁদাবাজি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আফিম উৎপাদক দেশ আফগানিস্তান। আফিম রফতানি থেকে বছরে দেড়শ’ থেকে ৩০০ কোটি ডলার আয় হয়। তালেবান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতেই সবচেয়ে বেশি আফিম চাষ হয়। চাষিদের থেকে ১০ শতাংশ হারে কর আদায় করা হয়। আফিম থেকে যারা হেরোইন বানায় তাদের থেকেও নেয়া হয় কর। এ ছাড়া কর দেয় রফতানিকারকরাও। এ খাত থেকে তালেবানের বার্ষিক আয় ১০ থেকে ৪০ কোটি ডলার। এ ছাড়া কনট্র্যাক্টর, এনজিও, বেসরকারি কোম্পানি, এমনকি সরকারের সদস্য- প্রায় সবাই নিরুপায় হয়ে কিংবা স্বস্তি পাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে থাকে।
প্রতিদিন বাড়ছে তালেবান আধিপত্য : ২০১৪ সালে বিদেশি যোদ্ধা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই ফের সর্বাত্মক যুদ্ধ ও চোরাগোপ্তা হামলা জোরদার করে তালেবান। গত এই সময়ে আফিম উৎপাদক অঞ্চলগুলোর বাইরেও নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে গোষ্ঠীটি। সম্প্রতি বিবিবির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৭০ ভাগ এলাকাই এখন তালেবানের দখলে। ফলে নিশ্চিতভাবেই তাদের আয়ের উৎসও আরও বিস্তৃত হয়েছে। কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পাশাপাশি তারা এখন টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবারহ ও ফোন কোম্পানিগুলোর থেকে চাঁদা আদায় করছে। সম্প্রতি আফগান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানির প্রধান বিবিসিকে জানান, দেশের বিভিন্ন অংশে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছে চাঁদা হিসেবে বছরে ২০ লাখ ডলার নিয়ে যাচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা। গেরিলা অভিযান থেকে বিশাল অংকের অর্থ আসে। যখনই কোনো শহর, নগর বা কোনো এলাকা দখল সম্পন্ন হয়, সেই এলাকার গাড়ি-বাড়ি, অস্ত্রশস্ত্র, ধন-সম্পদ সবকিছুর দখল নেয় যোদ্ধারা।
ল্যাবে হেরোইন উৎপাদন ও ব্যবসা : নিজেদের ল্যাবেই আফিম থেকে হেরোইন ও চেতনানাশক ওষুধ উৎপাদন করে তালেবান। দেশজুড়ে এ ধরনের ৪০০ থেকে ৫০০টি ল্যাব রয়েছে। এর অর্ধেকের বেশিই রয়েছে হেলমান্দ প্রদেশে। তবে মার্কিন বাহিনীর দাবি, বিমান হামলা করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অন্তত ২০০টি ল্যাব ধ্বংস করা হয়েছে। উৎপাদিত হেরোইন বিভিন্ন গোপন চ্যানেলের মাধ্যমে সারা বিশ্বেই রফতানি করে। এই খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি আয় করে গোষ্ঠীটি। মার্কিন বাহিনীর মতে, মোট তহবিলের ৬০ ভাগই আসে নারকোটিকস তথা চেতনানাশক ওষুধ বেচে।
খনি ও খনিজসম্পদ : ২০১৪ সালের জাতিসংঘ অ্যানাটিকিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশনস মনিটরিং টিম তাদের এক রিপোর্টে জানায়, দক্ষিণ হেলমান্দের ২৫ থেকে ৩০টি খনি থেকে বছরে এক কোটি ডলার নিয়ে আসে। তবে আফগান কর্মকতারা বলছেন, এ খাত থেকে পাঁচ কোটি ডলার পেয়ে থাকে তারা। মূলত প্রদেশ থেকে তেল নিয়ে বেরোনোর সময় ট্রাকপ্রতি ৫০০ ডলার করে চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিদিনই শত শত ট্রাক তেল উৎপাদন হয়।
বিদেশি অনুদান : আফগানিস্তানের বাইরে থেকে আসে দানের টাকা, প্রধানত পাকিস্তান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ইসলামী দাতব্য সংস্থা ও অপরাপর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। ঠিক কত টাকা আসে তা পরিমাপ করা না গেলেও বছর ৫০ কোটি ডলার আসে অনুদান হিসেবে। ২০০৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ডলারের মতো।