মানবকল্যাণের অনন্য প্রতিষ্ঠান জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার

করোনাকালে ৬০ হাজার ডলারের সাহায্য প্রদান

ঠিকানা রিপোর্ট : করোনা মহামারির সময় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছে। করোনা মহামারির কারণে নিউইয়র্ক সিটির গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো ২০ মার্চ নিউইয়র্ক সিটিতে লকডাউন ঘোষণা করেন। মানবকল্যাণের অনন্য লকডাউন ঘোষণা করার পর মানুষজন অনেকটা গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। অনেকেরই চাকরি চলে যায়। অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েন অনেকে। এমন একটি সময় আসে, যখন কেউ যেন কাউকে দেখছে না। সবার অবস্থা যেন আপনি জান বাঁচাও। এই অবস্থায় মানুষের সেবায় এগিয়ে আসে জ্যামাইকা বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার।
করোনাকালে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে গত ২০ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত দুস্থদের মাঝে ২৭ হাজার ৫০০ ডলার নগদ অর্থ বিতরণ করেছে এবং প্রায় ২ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে। এখনো এই কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী ঠিকানাকে জানান, অসহায় মানুষকে দেওয়া অর্থ এবং খাদ্যসামগ্রী জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগেই দেওয়া হয়। যদিও মাঝেমধ্যে কয়েকটি সংগঠন খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনকা ও জাকাত ফাউন্ডেশন। তিনি বলেন, ‘আমরা ডিজাস্টার ফান্ড নামে একটি ফান্ড গঠন করি। সেই ফান্ড থেকেই আমরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ মঞ্জুর আরো বলেন, ‘আমরা ২ হাজারের অধিক পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছি এবং নগদ অর্থ দিয়েছি প্রায় ২৭ হাজার ডলার। আমরা যেসব খাদ্যসামগ্রী দিয়েছি তার মধ্যে ছিল চাল, ডাল, আটা, বেসন, ছোলা, খেজুর, সেমাই, তেল, পেঁয়াজ, আলু, সিরিয়াল, বাটার, জেলি ও ক্যান ফুড।’ তিনি বলেন, ‘এবারের পুরো রমজান মাস ছিল লকডাউন। যে কারণে মানুষকে রোজার সামগ্রীও দিয়েছি। ঈদের দুই সপ্তাহ আগে বাঁশমতী পোলাও চাল, ঘি এবং লচ্ছা সেমাই দিয়েছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর বলেন, ‘নগদ অর্থ এবং খাদ্যসামগ্রী মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার ডলার দুস্থ মানুষের মাঝে বিতরণ করেছি। এ ছাড়া করোনায় যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের ৫০০ ডলার প্রদান করেছি।’ তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমাদের অফিস ৭ দিনই সবার জন্য খোলা ছিল। সার্বক্ষণিক অফিসে লোক ছিল। আমরা কেবল বাংলাদেশিদের নয়, অন্যান্য দেশের মানুষকেও সাহায্য করেছি। যারাই সাহায্য চেয়েছে, তাদের প্রতি আমরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। মুসলিম, নন-মুসলিম সবাইকে আমরা সহযোগিতা করেছি। আমাদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে নিউইয়র্কের ৫ বরো থেকে লোকজন আসত। জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কসসহ অন্যান্য এলাকা থেকে অসংখ্য লোক এসেছেন। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে লোকজন সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকত। আবার করোনার সময় যারা অসুস্থ ছিলেন, বয়স্ক ছিলেন তাদের জন্য ওষুধ কিনে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। যারা মারা গিয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেককে ফিউনারেলে সাহায্য করেছি।’ ফ্লাশিং এ মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের ৩০০ খাবার বক্স দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, ‘এসব কাজে সমাজের অনেক মানবতাবাদী লোক এগিয়ে এসেছেন, ফান্ড দিয়েছেন। যারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’
এই সেবামূলক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সভাপতি ডা. সিদ্দিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী, সাবেক সভাপতি খাজা মিজান হাসান, যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবীর খান, কোষাধ্যক্ষ বাবুল মজুমদার, কার্যকরী সদস্য ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, মহাম্মদ সাবুল উদ্দিন, মোহাম্মদ বজলুল হক, অফিস ম্যানেজার আব্দুল ওয়াহিদ খান ও কেয়ারটেকার সাদাত হোসেন। এ ছাড়া জামিয়া কোরআনিয়া একাডেমির প্রিন্সিপাল হাফেজ মুজাহিদুল ইসলামসহ অনেকেই এ কাজে সহযোগিতা করেছেন।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে জ্যামাইকা অন্যতম। অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় জ্যামাইকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জ্যামাইকা ছাড়াও আশপাশের এলাকাগুলোতে বাংলাদেশিরা নতুন নতুন বসতবাড়ি গড়ছেন। জ্যামাইকা এলাকার উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৮৫ সালে। এই সেন্টারকে কেন্দ্র করে জ্যামাইকায় বাংলাদেশিদের বসবাস শুরু। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি বাংলাদেশিদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। একসময় জ্যামাইকা ভীতির জায়গা ছিল। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের কারণে আলোকিত এলাকায় পরিণত হয়েছে এটি। এই মুসলিম সেন্টারকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশিদের বসতি গড়ে ওঠেনি। ওই এলাকায় বাংলাদেশিদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। জ্যামাইকাকে এখন অনেকে মিনি বাংলাদেশ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। শুধু জ্যামাইকা এলাকায় নয়, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার পুরো নিউইয়র্কে আলোকরশ্মি বিতরণ করছে। এর আলোতে পুরো নিউইয়র্ক আলোকিত হচ্ছে।

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার এখন প্রবাসে বাংলাদেশিদের অহংকার ও গর্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুধু নিউইয়র্ক নয়, আমেরিকায় এখন সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় জ্যামাইকা বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে। ঈদ জামাতে কংগ্রেসম্যান, সিনেটর, নিউইয়র্ক সিটির মেয়রসহ মূলধারার বড় বড় রাজনীতিবিদেরা এসেছেন। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আত্মমর্যাদার প্রতিষ্ঠান, আত্মসম্মানের প্রতিষ্ঠান। পরিচিতি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। বুক ফুলিয়ে বলার মতো প্রতিষ্ঠান। এখানে শুধু নামাজ আদায় করা হয় না, মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষাও দেওয়া হয়। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি শিক্ষা এবং নতুন প্রজন্মকে ইসলামি জ্ঞানদানের প্রতিষ্ঠানও এটি।
জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার এখন একক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। গড়ে উঠেছে এর আরো সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে আল মামুর স্কুল, সিনিয়র সেন্টার, জামিয়া কোরআনিয়া একাডেমি, জেএমসি ইয়ুথ গ্রুপ প্রভৃতি।