মানবতা, কেন তুমি অধরা?

জামাল আস-সাবেত : গায়ের ঘাম ঝরাতে ঝরাতে যে রিকশাচালক গন্তব্যে পৌঁছে দিল, তাকে ধমক দিয়ে কলার চেপে দুই গালে ঠাস করে চড় বসাতে দ্বিধা করলাম না!
ঠ্যাং উঁচিয়ে ময়লা জুতোগুলো মুচির মুখের সামনে ধরে বললাম, পরিষ্কার করে দে!
যে বাবা সারা জীবন সময়-শ্রম দিয়ে, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আগলে রেখেছে; যে মা সন্তানের জন্য পুরো জীবন নষ্ট করেছে, সে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে সন্তানের বুক কাঁপল না!
যে বন্ধুকে বিশ্বাস করে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিই, সে বন্ধুও বিশ্বাসঘাতকতা করতে দ্বিধা করে না! যাকে বিশ্বাস করে ভাবতাম, তার ওপর আশ্বস্ত হতে পারি, কিছুদিন পর তার চেহারায় ফুটে ওঠে কালিমার রেখা!
আমাদের ব্যক্তিজীবন-জুড়ে কেবল মানবতার দীর্ঘশ্বাস!
সমাজের আনাচ-কানাচে প্রতিধ্বনিত হয় বিশ্বাসঘাতকতার শব্দ। নারীর অধিকার, পুরুষের মর্যাদা, দরিদ্রের সংসার উন্নতি করার বদৌলতে পৃথিবীজুড়ে ধর্ষণ আর হরিলুটের বহর বসছে।
যে মানুষটি কোট-টাই পরে টক শোতে বসে গলা উঁচিয়ে মানবতা প্রতিষ্ঠার গলাবাজি করছে, কিছুদিন পর তার বিরুদ্ধে প্রতারণার চিত্র ফাঁস হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠছে!
যাকে সেবক হিসেবে দেখার কথা ছিল, আজ তার রাজদণ্ড হাতে মুখে বিশ্রী ভাষার এক কুৎসিত, চরিত্রহীনের পরিচয় মিলছে।
যাদের নাম নিতে মানুষ ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রকাশ করত, সেই শিক্ষক-চিকিৎসকদের নাম বিকিয়ে ইউনিফর্ম পরে কিছু অসাধু ব্যক্তি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে!
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মানুষটি যখন পদে থাকার লোভে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার মূল্যায়ন করেন না, তখন মানবতার বুক থেকে বেরিয়ে আসে রক্তের ফিনকি!
বিশ্বের সর্বোচ্চ জায়গায় বসে যখন জাত-ধর্ম-বর্ণভেদে মানুষকে দুই চোখে দেখা হয়, তখন আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, কাশ্মীর ইত্যাদি জায়গায় রক্তের স্রোত বইতেই থাকে।
বিলিয়নিয়াররা যখন টাকার পাহাড় বানিয়ে সোনার হোটেলে সোনার চামচ মুখে দিয়ে বিনোদনের সকল আয়োজনের মধ্যে থেকে আরাম-আয়েশ করছে, তখন হতদরিদ্র মানুষগুলো রাস্তায় পড়ে থাকা ডাস্টবিনের স্তূপ থেকে মাছিভরা খাদ্যের দুর্গন্ধে খুঁজে পাচ্ছে খিদা মেটানোর উৎকট সুগন্ধ!
বস্তির পাশ কেটে যখন নীরবে হেঁটে যাই, তখন হৃদয়ে মোড়ানো একগুচ্ছ হাহাকার চিৎকার করে ওঠে। রাতের অন্ধকারে খুঁজে পাই বালিশ ভেজানো চাপা কান্না!
যে ছেলেটি বস্ত্রের অভাবে উলঙ্গ থাকে, স্যান্ডেলবিহীন কঙ্কাল দেহে হেঁটে যায়, তার কেবল খিদা থাকে না, তার হৃদয়ে বেজে ওঠে কষ্টের, হাহাকারের তীব্র চিৎকার।
ছেঁড়া বস্ত্র শত সেলাই দিয়ে যে শিশুটি টোকাই হয়েছে, তার পাশ ঘেঁষে বিশাল অট্টালিকা দম্ভভরে দাঁড়িয়ে থাকে! বৈষম্য যখন নাকের ডগায়, তখন সে রাষ্ট্রকে ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ বলে যারা গলা ফাটায়, তারা আসলে উঁচু স্তরের শয়তান!
ধনকুবেররা যখন সুখ খুঁজে পায় নারীর বিছানায়, নামীদামি রেস্তোরাঁয়, দিগি¦দিক ভ্রমণে, তখন ওদেরই মতন রক্ত-মাংসে গড়া কিছু মানুষ সুখ খুঁজে পায় দু-মুঠো অন্ন-জলে!
রাষ্ট্র, তুমি কেবল তেলা মাথায় তেল দিয়ে গেলে; অভাবী, নিরীহ, নিগৃহীত মানুষের কষ্ট বুঝলে না!
আমাদের হৃদয়ে আজ মানুষ বাস করে না, সেখানে একটা লোভী ও দাম্ভিক পশু বাস করে। পশুটির যত্ন করতে করতে আমরা কখন যে সেই পশুর দাসে পরিণত হয়েছি, সে খবর বেমালুম ভুলেই গেছি!
মানবতার প্ল্যাকার্ড উঁচু করতে করতে যে মহামানব দৌড়ে এলেন, তাঁকে আমরা ধিক্কৃত করে তাড়িয়ে দিয়েছি। তাঁকে জেলে ঢুকিয়ে নির্যাতন করেছি। তাঁর বুকে খঞ্জর চালিয়ে শহীদ করেছি। তিনি চলে গেলেন। রেখে গেলেন শহীদি রক্তের ছাপ। নিবুনিবু মানবতার শেষ আলোটুকু এখনো সে রক্তের ওপর টিমটিম করে জ্বলছে।
আজ আমাদের জ্ঞানের কথা ভালো লাগে না। ভালো কথায় মন ভরে না। বিনোদনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা বড় স্বার্থপর হয়ে উঠছি। তাই তো ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, সমাজে-সমাজে, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে চিরাচরিত দ্বন্দ্ব।
আজ এ-জেতে, কাল ও-জেতে। জেতার নেশায় ভালোবাসার গুরুত্ব লীন হয়ে গেছে। ‘আমরা সবাই মানুষ, সবাই জিতেছি’ এ ধারণা আমাদের আর হলো না।
কে কত নিষ্ঠুর হতে পারি, কত ঠকাতে পারি, কত অসম্মান করতে পারিÑএ রকম অমানবিক চিন্তাচেতনামূলক প্রতিযোগিতা আমাদের মাঝে বড় হয়ে উঠছে। এখন অহংকারই যেন আত্মসম্মান!
আজ মানবতা লুণ্ঠিত। কেউ কারো পাশে আসে না। পাশে বসে সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয় না। সকলেই আত্মমর্যাদার নামে আত্মাকে শয়তানের পদতলে বলি দিয়ে ফেলছে।
আমাদের ঘুম ভেঙে যাক। নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হোক জীবনের নতুন আলো। আমাদের চিন্তাগুলো সুচিন্তায় পরিণত হোক।
মেঘের আড়ালে জেগে উঠুক নতুন সূর্য। অন্ধকার ভেদ করে উঠুক নতুন চাঁদ। এখন আশার প্রদীপে কেবল তেল দরকার। পথের দিশা দরকার। একজন রাহবার দরকার। সুশিক্ষার সুফল দরকার।
নৈতিকতায় ভরে উঠুক জীবন-সংসার। মানবতায় হেসে উঠুক পৃথিবীর আকাশ-বাতাস।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় বলি :
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
মানবতা, তুমি ধরা দাও।
লেখক : লেকচারার ও কলামিস্ট