মানবপাচার, অমানবিকতা ও উন্নয়ন ধারণায় বিভ্রান্তি

ফাহমিদা হক
করোনা মহামারির মধ্যেও মানবপাচারকারীদের অপতৎপরতা থেমে নেই। মিথ্যা প্রলোভনের শিকার হয়ে কম খরচে বেশি লাভের আশায় মরীচিকার পেছনে ছুটছে এ দেশের অনেক যুবক, বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য নারী-পুরুষ। বোকা এই মানুষগুলো নিজেদের লোভ সামলাতে না পেরে আরো বড় লোভীর খপ্পরে পড়ে অনেকে জীবন দিচ্ছে আবার কেউ কেউ প্রাণে বেঁচে এলেও সর্বস্বান্ত হয়ে কোনোমতে জীবনটা বাঁচাতে পেরেছে।
চলতি বছরে বঙ্গোপসাগরের উপকূল দিয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ মানবপাচারের শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, এর মধ্যে শুধু জুনেই ৬৬৯ জনের পাচার হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্নভাবে মানবপাচারের খবর আসে অহরহ। যদিও ২০২০ সালের বৈশ্বিক মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ যেসব পদক্ষেপের কারণে গত বছর বাংলাদেশের মানবপাচারে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যে সাতটি মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিদেশে কাজের জন্যে গমনেচ্ছু বাংলাদেশিদের শোষণকারী নিয়োগ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ অন্যতম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯-এর সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির দালাল ও আদম ব্যবসায়ী মানবপাচারে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিরাপদ মাধ্যমে বিদেশে কাজের জন্য গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের নিরাপদ অভিবাসনের জন্য সহজ পথ তৈরি করে কাজের নিশ্চয়তা এবং সুনিশ্চিত সকল আইনের প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। আরো সতর্ক থাকতে হবে, যাতে করে কর্মীদের নিয়োগ ফি পরিশোধের লেনদেন থেকে শুরু করে কোনো রকমের শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়তে না হয়। মানবপাচার রোধ করতে হলে এসব বিষয়ে আইনের প্রয়োগ থেকে সকল বিষয়ে কর্মীদের সকল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারলেই কেবল কমবে মানবপাচার। কোনো অঘটন না ঘটলে সেটা হয় অভিবাসন, আর অঘটন ঘটলে এবং তা জানাজানি হলে হয় মানবপাচার! কিছুদিন দৌড়ঝাঁপ, তারপর সব চুপ। এভাবেই চলে অসহায় মানুষের ভাগ্যবদলের খেলা। যে খেলায় জড়িত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারহীনতা।
গত ২৭ মে লিবিয়ায় গুলিতে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জন বাংলাদেশিকে। এ খবর সারা দেশে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছে। এ দেশে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। ২ জুন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালকে গ্রেফতার করেছে এবং বলা হয়েছে তিনিই মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা। যেখানে এ দেশের অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, আসলে মূল ব্যক্তিরা সব সময় থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই দালালচক্র এবং তাদের প্রশ্রয়দানকারী, যারা রাজনৈতিক ক্ষমতায় থেকে এসব অবৈধ কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
এরই মধ্যে একজন সংসদ সদস্য বিদেশে অর্থ ও মানবপাচারের জন্য গ্রেফতার হয়েছেন। উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদেরা যখন এমন কাজে নিয়োজিত থাকেন, তখন তাদের চিহ্নিত ও বিচার করা মোটামুটি অনিশ্চয়তায় পড়ে। যদিও দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে মানবপাচারকারী বিরোধী কমিটি রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির ক্ষমতার দাপটে সবই চলে নির্ভয়ে। কমিটি কেবলই চলে নামে। দেশের সাধারণ দরিদ্র মানুষ তাদের দারিদ্র্য দূর করতেই এই অবৈধ পথে পাড়ি জমায়। যারা দালালদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন, তারা সবাই যে অজ্ঞতাপ্রসূতভাবে এমন ফাঁদে পা দিচ্ছেন, তাও কিন্তু নয়। অনেকে জেনেবুঝেও এই ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ বাংলাদেশে টাকা খাটানো বা নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলা থেকে লিবিয়া গমন করা বা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যেতে পারলে ঝুঁকিপূর্ণ জীবন বেছে নেওয়াকে বেশি শ্রেয় মনে করেন। এ ক্ষেত্রে তারা বিবেচনায় নেন দালালদের যারা সহজভাবে কখনো কাউকে বিদেশ পাঠাতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।
দালালচক্র আসলে সবকালেই তৎপর ছিল এবং আছে। কারণ ধরা পড়লেও নানা কারণে মামলা থেকে তারা পার পেয়ে যায়। ২০১৫ সালের ১ মে থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে গণকবর পাওয়া গিয়েছিল। তারপর মালয়েশিয়াতেও পাওয়া গেল। পাওয়া গেল নির্যাতন শিবিরও। সেই বছর এ দুটি দেশ আর ইন্দোনেশিয়া থেকে মানবপাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার ১৭৫ জনকে সরকার দেশে ফিরিয়ে আনে। তারা বিমানবন্দর থানায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। থাইল্যান্ডে বিচারে পাচারকারীদের সাজা হলেও বাংলাদেশে বিচার এখনো ঝুলে আছে। যদিও গ্রেফতার হয়েছিল মাত্র ছয়জন।
ইদানীং পাচারকারীরা ইউরোপে নেওয়ার লোভ দেখিয়ে লিবিয়ায় নিচ্ছে, সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার আগেই লিবিয়ায় নানান অপহরণকারীর হাতে পড়ে নির্যাতিত হতে হয় অথবা টাকা ম্যানেজ করে বেঁচে যাচ্ছে কেউ কেউ। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের দীর্ঘ গহিন পথ পাড়ি দিতে না পেরে অনেককে সাগরে প্রাণ দিতে হচ্ছে। পাচারকারীদের খপ্পর থেকে প্রাণে বেঁচে আসা তিনজনের বক্তব্য হচ্ছে, ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শুরু করে লিবিয়া পর্যন্ত পাচারকারী চক্রের জাল বিছানো থাকে সুবিন্যস্তভাবে, যাদেরকে বিভিন্ন ধাপে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়। এমন অভিবাসনের হাতছানিতে গত বছরও সাগরে ডুবে মারা গেছেন এবং উদ্ধারও হয়েছেন অনেকে।
সেই ২০১১ সালে লিবিয়া যুদ্ধ শুরু হলে ৩৭ হাজার বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তার পর থেকে নোয়াখালী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জসহ নির্দিষ্ট কিছু জেলায় এই দালালচক্র সক্রিয়ভাবে মানবপাচার ব্যবসায় যুক্ত হয়। এরা সব সময়ই রাজনৈতিক আশ্রয়ে কাজ করে। এদিকে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় এলাকা কক্সবাজার। এ-যাবৎকালে জেলাটিতে ৬৩৭টি মানবপাচারের মামলা হয়েছে, যার একটিরও বিচারকাজ নিষ্পত্তি হয়নি। আইন বলছে, ৯০ দিনের মধ্যে পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে আর ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু আদতে হচ্ছে কী? ক্যান্টনমেন্ট থানায় এক মামলায় সাক্ষী হাজির করার তারিখ পড়েছে ৫৬ বার। তেজগাঁও থানায় ২০০৫ সালে এক মামলার সাক্ষী হাজিরার তারিখ পড়েছে ৪৮ বার। এভাবে বারবার তারিখ ফেলে মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে একসময় সব হারানো অসহায় মানুষটি আরো অসহায় হয়ে মামলা চালানোর অবস্থায় থাকে না।
২০১৪ সালে ঢাকার সায়েদাবাদের বাসিন্দা শাহীনুরকে লেবাননে পাঠানোর কথা বলে দালালরা সিরিয়ায় পাঠায়। সেখানে এই নারী চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে আট মাস পরে দেশে ফিরে মামলা করেন। আজও সেই নারী বিচারপ্রার্থী। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহ্্দীন মালিক বলেছেন, ভুক্তভোগী সহায়তা না করলে এ ধরনের মামলা প্রমাণ করা কঠিন। কিন্তু এখানে ভুক্তভোগী সব সময়ই প্রচণ্ড দুর্বল। শাস্তির দৃষ্টান্ত বাড়াতে হলে আইনের সংস্কার লাগবে, যেখানে বিচারকাজ দ্রুততম সময়ে হবে।
মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কার্যক্রমগুলোকে ভুক্তভোগী সহায়ক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নারী-পুরুষ বা তরুণ, বয়স্ক সকল ভুক্তভোগী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা পায়। এর মানে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রচেষ্টার সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সেবা জোরদার করার লক্ষ্যে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেই সাথে ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, আইনি ও পুনর্বাসন সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ পথে সরকার অনুমোদিত দেশগুলোত যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে কার্যকর শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই। মানবপাচারকারী দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার সাথে সাথে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষকে সরকারি সহায়তায় আত্মনির্ভরশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
-ঢাকা।