মানুষ মানুষের জন্য

লাবলু কাজী :

৩১ অক্টোবর ছিল আমেরিকাজুড়ে হ্যালোইন রাত। চারদিকে বিচিত্র পোশাক পরিধানে বাচ্চারা দরজায় দরজায় ক্যান্ডি সংগ্রহের আবেশে মাতোয়ারা। ঈদের মতো কোথাও নেই মানা, খঞ্চা ভরে বিলাব আজি নানা রঙের ক্যান্ডি। ওরা যখন বাসায় থাকত, তখন এর জমকালো আয়োজন ছিল। এখন ওরা দূরে, বড় হয়ে গেছেÑএসব এখন বর্ণিল অতীত, স্মৃতির পাঠশালা। আর সময় বের করতে পারি না ফেসবুকে যাওয়ার। জীবনে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমি সৈকতে পড়ে আছি। এখান থেকে কোথায় যাব দুনিয়ার মসনদওয়ালাই জানেন। সাত-সকাল পেরিয়ে সুবেহ সাদিকে পৌঁছে গেছি। ভোর হয়ে এল, পাখির আওয়াজ কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও তা আর আগের মতো আনন্দ দেয় না। কয়েক দিন আগে জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্রের একটা স্ট্যাটাস পড়লাম। লিখেছে, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, পাঁচ ঘণ্টা পর মৃত্যু।’ জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্যÑকত ঠুনকো এই জীবন-বাজনা। তাকদুম তাকদুম বাজাইÑআর তাকদুম বাজবে কি না কেউ জানে না। মশার কামড়ে জনজীবন অতিষ্ঠ, ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। এরপর কোন মশায় কামড় দিলে ডেঙ্গু হবে কেউ জানে না, হায় হায় এই বুঝি কামড় দিল। করোনার তাণ্ডবের পর নতুন করে এই ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন মড়ার উপর খাড়ার ঘা। এই আতঙ্কিত জনগোষ্ঠীর প্রতি আমার মর্মবেদনা, সহানুভূতি এবং প্রার্থনা, তিনি যেন সবাইকে হেফাজত দান করেন।

ইউএসএ হাউসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির হাজব্যান্ড পল পেলোসির ওপর অমানবিক হামলা গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। এই বৃদ্ধ নিরীহ গোবেচারার ওপর তাদের সানফ্রান্সিসকোর হাউসে তার শয়নকক্ষে গিয়ে আক্রমণ বড়ই আতঙ্কিত করে। যদিও স্পিকার বাসায় ছিলেন না। কিন্তু আক্রমণকারী এসেছিল স্পিকারের খোঁজে। বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ন্যান্সি কোথায়, ন্যান্সি কোথায়? গোটা কয়েক মেগা রিপাবলিকান ছাড়া পুরো আমেরিকা এই অবৈধ কানাডিয়ানের ঘৃণ্য কাজকে ধিক্কার জানিয়েছে।

‘বাপকা বেটা, সিপাইকা ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া’-এই পুরোনো প্রবাদটি হুবহু যায় আমাদের ভালো মানুষ বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়ে ফার্স্ট ডটার অ্যাশলি বাইডেনের ক্ষেত্রে। যদিও লাইমলাইটে নেই তিনি, তবু প্রচারবিহীন এই প্রেসিডেন্ট-কন্যা ২৪ ঘণ্টা ছায়ার মতো অনুসরণ করেন হেফাজতে রাখতে বাবার ব্রত। উচ্চশিক্ষিতা এই সমাজসেবী মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। বাইডেনের পূর্বসূরি এবং তার ছেলেমেয়েদের কথা ও দাম্ভিকতায় সারা আমেরিকা কম্পমান থাকত। মিস অ্যাশলির একটা ইন্টারভিউ দেখলাম, তাতেও কোনো অভিযোগের লেশমাত্র ছিল না।

৮ নভেম্বর হাউস, সিনেট ও গভর্নর পদে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেল। যদিও বাইডেন অনেক ভালো কাজ করছেন গরিব জনগণের জন্য, তবু ইনফিলেশন বা মন্দার কারণে তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এমনিতেই প্রেসিডেন্টের পার্টি মধ্যবর্তী নির্বাচনে অনেক আসন হারায়, তার ওপর এই ইনফিলেশনের ধাক্কা। এসব সত্ত্বেও বাইডেনের ডেমোক্র্যাট পার্টির সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায় নিশ্চিত। অন্যদিকে কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদের হাউসে মেজরিটি পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে স্বস্তিতেই আছেন বাইডেন।

এদিকে আরেক সমস্যা ভোট দেওয়ার পর ভোট গণনা ও ফলাফল নিয়ে। ফলাফল রিপাবলিকানদের পক্ষে না গেলেই ট্রাম্প ও তার উগ্র সমর্থকেরা বলেন, ভোটে কারচুপি হয়েছে, এ ফল মানি না। এই নতুন পন্থা ট্রাম্পের সৃষ্ট বিগত ইলেকশনে এবং এখনো চলমান। মনে হয়, এটা মার্কিন গণতন্ত্র ধ্বংসের এক নয়া পদ্ধতি এবং স্বৈরশাসন প্রবর্তনের এক নগ্ন পদক্ষেপ।

সদ্য ঘটে যাওয়া রাজনীতির বিশ্ব পরিক্রমায় দেখা যায়, পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে। ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট লুলা নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার দ্বারপ্রান্তে এবং ডুবে যাওয়া ব্রাজিলকে আবার কূলে ভেড়াবেন বলে বিজ্ঞদের মতামত। দরিদ্র ব্রাজিলের জনগণ তার উত্তরণের সোপান এবং বিনিময়ে তাদের মঙ্গলের স্রোতের ধারায় দেশ শাসন করবেন বলে কথা দিয়েছেন। মানুষ মানুষের জন্যÑএত বড় রাজনীতিবিদের বিশ্বাস বড়ই বিরল ও অবিশ্বাস্য। এখন তো তারা নিজের পকেট ভরা ও নাম ও খ্যাতির পেছনে ছোটে।
ইসরাইলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বা বিবি নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে চলেছেন। কট্টরপন্থী এই নেতার দুঃশাসনে প্যালেস্টাইনবাসীর যে দুঃসময়ের মাত্রা বাড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জোর যার মুল্লুক তারÑএই রূঢ় সত্য বিশ্বের সব জায়গায়ই প্রযোজ্য। এই হাবভাব দেখে সিএনএনের ভাষ্যকারের মন্তব্য : ২০২৪ সালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

দেশ, জাতি এবং ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রনায়ক যেভাবে চালাক না কেন, দিন চলে যায় সুখে-দুঃখে মগর কথা থাকে। দিনের শেষে রাত ভোর হয়ে আসে, সাথে জ্বলজ্বলে একটা উদিত সূর্য নিয়ে আসে, যা আমাদের আলো দেয় দিনের জন্য, আশা জাগায় ভালো থাকার। আমরা না হয় সেই ভালো দিনের আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করব।

-নিউইয়র্ক