মিলিয়নিয়ার মুখ ফাহিম সালেহ

রুথ অকওয়াম্বু: ফাহিম সালেহর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আফ্রিকার প্রযুক্তি অঙ্গনে ফাহিম কেবল প্রযুক্তিবিদ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, বরং স্বীয় কর্মগুণে নতুনত্বের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত ছিলেন। তার নতুন নতুন উদ্ভাবন সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের বিতাড়িত করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাহিমের বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানেই স্থায়ী হন। বাল্যকালে তিনি লুকিয়ে ভিডিও গেমস খেলতেন, যা তাকে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। নিজের বয়স পনেরো হওয়ার আগেই প্রথমবারের মতো সালেহফ্যামিলি ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন ফাহিম। তার মা-বাবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের ওয়েবসাইটি ভিজিট করতে উৎসাহিত করতেন। মা-বাবার এই বিপণন কৌশল ফাহিমকে প্রতি মাসে গড়ে পাঁচজন করে নতুন ভিজিটর পেতে সহায়তা করেছিল। এই বিষয়টি সবার কাছে হাস্যকর মনে হলেও ফাহিম এ থেকে উৎসাহিতই হয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ফাহিম নিজের জন্য অর্থ উপার্জনের সিদ্ধান্ত নেন এবং কিশোর বয়সেই অ্যাপ বানানো শুরু করেন। বেশ উৎসাহী ও প্রাণবন্ত কিশোর ফাহিম অল্প সময়েই তার অ্যাপটি তৈরি করতে সক্ষম হন। তিনি পনেরো বছর বয়সে ‘টিন-হ্যাংআউট ডটকম’ নামে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেন। তিনি এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে উপার্জন শুরু করেছিলেন, যা তাকে এ ধরনের কাজের প্রতি আরও উৎসাহিত করেছিল। ফাহিম তার বন্ধুদের ওই ওয়েবসাইটে নিবন্ধ প্রকাশ করতে বলেন এবং পরে সেটি আঞ্চলিক ব্লগিং ফোরামে পরিণত হয়। এতে তার ওয়েবসাইটে মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থের বিজ্ঞাপন আসতে শুরু করে।
হাইস্কুলে পড়াকালেই তার প্রথম কোম্পানি ১০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে। তিনি তরুণদের লক্ষ্য করে এইআইএমডুড ডটকম, আইকনফান ডটকম, এমএসএনডলজ ডটকম, আইকডুড ডটকমের মতো ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন এবং এগুলোর প্রতিটি থেকে এক-দেড় লাখ ডলার আয় করেছিলেন। কলেজ-পরবর্তী তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। সেখানে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে অধ্যয়নকালে তিনি প্রাঙ্কডায়াল নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেন। এর মাধ্যমে বন্ধুদের কাছে ফানি কল পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক একটি টুইটে দেখা গেছে, ২০১০ সালের পর অ্যাপ্লিকেশনটি সাড়ে তিন মিলিয়নের বেশি ফানি কল কার্যকর করেছে।
ফাহিম বুঝতে পেরেছিলেন যে বিশ্বের ব্যস্ত শহরগুলোতে বাইকে রাইড শেয়ারিং চালু করা গেলে মানুষজন তা স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করবে। তিনি দ্রুতই এ ধরনের সেবা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ হন। ২০১৫ সালে তিনি হুসাইন এম ইলিয়াস এবং শিফাত আদনানকে নিয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাইক সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ‘পাঠাও’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি বেশ লাভজনক হওয়ায় আফ্রিকায় এককভাবে ‘গোকদা’ নামে একই ধরনের রাইড শেয়ারিং সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন সালেহ। ২০১৭ সালে নাইজেরিয়ার ব্যস্ততম শহর লাগোসে কার্যক্রম শুরু করে গোকদা এবং ২০১৯ সালের মধ্যেই ৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে লাগোস রাজ্য সরকার বাইকে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দিলে সংকটে পড়ে গোকদা।
ফাহিম একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার একটি ক্লাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বাইক চালকেরা কাজের পর বিশ্রাম নিতে পারবেন। ফাহিমের জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ। তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টিংগুলো সাধারণত উদ্যোক্তা প্রযুক্তিপ্রবণ বা তার ব্র্যান্ড সম্পর্কে ছিল। তার শেষ টুইটটি ছিল অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় গোকদা ব্র্যান্ডটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য তারই একটি সমীক্ষা।
গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার দুঃখজনকভাবে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এমন একজন মানুষের শূন্যতা তৈরি হলো, যিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে যাত্রী পরিষেবায় পরিবর্তন এনেছেন। অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। খুনিরা শুধু সালেহকে হত্যা করেনি, বরং বিশ্ববাসীকেও বঞ্চিত করেছে সম্ভাব্য নতুন নতুন উদ্ভাবন থেকে।
নাইজেরিয়ান লেখক : নাইরেমেট্রিক্স থেকে ভাষান্তর সুদীপ্ত সাইফুল