মিশনে স্থায়ী প্রতিনিধির শুভেচ্ছা বিনিময়

ঠিকানা রিপোর্ট : জাতিসংঘে পার্মানেন্ট মিশনে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোহিত জাতিসংঘে বাংলাদেশের ২০২৩ সালের কর্মপরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। গত ১৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্থায়ী মিশনে নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ উল্লেখ করে বলেন, আমি বিগত আগস্ট ২০২২ এই মিশনে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করার পর এটাই আপনাদের সাথে আমার প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভা। তিনি তার বক্তৃতায় করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জাসিংঘে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রদূত মোহিত বলেন, ২০২২ সালটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কর্মমূখর একটি বছর ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ , জলবায়ু পরিবর্তন, করোনা মহামারিসহ অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ ও অন্যান্য সংস্থাসমূহ বিশ্বের সকল মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কমিয়ে, ভবিষ্যতে সকলের জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করে গেছে। এসকল বৈশ্বিক ইস্যুতে এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যু, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ আমাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে আমাদের মিশন সরব ছিল।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকল্পে মিশনের কার্যক্রম নিয়ে রাষ্ট্রদূত মোহিত বলেন, ২০২২ সালে মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আমাদের নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ, আফগানিস্তান সংকটসহ অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখেও আমরা আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে এ বিষয়টি আলোচনায় রেখেছি।
সাধারণ পরিষদে এবার আমরা গতবছরের চাইতেও জোরালো একটি রেজুল্যুশন এনেছি যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়েছে। রেজুল্যুশনটি ১০৯ টি দেশ কো-স্পন্সর করেছে যা ২০১৭ সাল থেকে এ যাবত সর্বোচ্চ।
তিনি আরো বলেন, রেজুল্যুশনটিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করা হয়। পরিষদ রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবসনের নিমিত্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহবান জানায়।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত মোহিত বলেন, আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালেও বাংলাদেশ সেনা/পুলিশ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে ছিল। বর্তমানে আমাদের শান্তিরক্ষীর সংখ্যা ৭৩৭০ জন। আমাদের এ অবস্থান বাংলাদেশের বৈশ্বিক ইমেজ এবং আমাদের শান্তিরক্ষীদের উপর জাতিসংঘের গভীর আস্থারই স্বীকৃতি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ গত বছর জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নির্বাচিত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস্ কাউন্সিল এ ২০২৩-২৫ মেয়াদে নির্বাচনে জয়লাভ এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও বাংলাদেশ বর্তমানে কমিশন অব স্টাটাস অব উইমেন -এ ২০১৯-২০২২ মেয়াদে এবং ইউনিসেফ ও ইউএন উইমেন এর নির্বাহী বোর্ড এ ২০১৯-২০২১ মেয়াদে সদস্য। গত বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘে শান্তি বিনির্মাণ কমিশনে ২০২৩-২৪ মেয়াদে পুন: নির্বাচিত হয়েছে। এছাড়াও জাতিসংঘের ইউএনডিপি/ইউএনএফপিএ/ইউএনওপিস-এর নির্বাহী বোর্ডের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। এটি বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে একটি দায়িত্ববান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উপর বিশ্বসম্প্রদায়ের আস্থারই প্রতিফলন।
রাষ্ট্রদূত মোহিত বলেন, বাংলাদেশ এ বছর ৫ম বারের মতো জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ৪টি শূন্য আসনের বিপরীতে ৭টি দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যা স্মরণকালে মানবাধিকার কাউন্সিলের সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। এই ৭টি প্রার্থী দেশ হল – আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, বাহরাইন, মালদ্বীপ, দক্ষিণ কোরিয়া, কিরঘিজিস্তান ও ভিয়েতনাম। আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও প্রচারণায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সর্বোচ্চ ১৬০টি ভোট পেয়ে বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়।
মিডিয়ার সাথে সম্পর্ক রাষ্ট্রদূত মোহিত বলেন. আমরা বছরব্যাপি চেষ্টা করেছি জাতিসংঘে আমাদের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, অবদান বা অর্জনকে আপনাদের নিকট পৌঁছাতে বা সেগুলো আপনাদের দ্বারা কাভার করাতে। আমাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ আরও বৃদ্ধির জন্য আমরা এ বছরও সচেষ্ট থাকবো। আমরা এ বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি এবং আরও বেশী সহযোগিতা পাবার আশা রাখছি।
২০২৩ সালে মিশনের কার্যক্রমের পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে জনাব মোহিত বলেন, ২০২২ সালের ন্যায় ২০২৩ সালে আমাদের মিশন বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সাথে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে কাজ করে যাবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদে সক্রিয় থাকব। এতদিন নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত কোন রেজুল্যুশন ছিলনা । সম্প্রতি একটি রেজ্যল্যুশেন গৃহীত হয়েছে। আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশসমূহের সঙ্গে একযোগে এ রেজুল্যুশনের বিভিন্ন শর্তাদি যাতে মিয়ানমার এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাস্তবায়ন করে, সে বিষয়ে কাজ করে যাব। এ বিষয়ে ওআইসি, আসিয়ান ও ইইউ-এর সাথে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
এছাড়াও তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো তুলে ধরা হবে বলেন উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি যারা এখানে আশ্রয়ে আছে, তদেরকে দেশে ফেরত নেয়ার জন্য সকল ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।