মুক্তিযুদ্ধ করে ভুল করেছি যে বলবে সে উন্মাদ না হয় যুদ্ধ করেনি

আপেল মাহমুদ ঠিকানাকে বলেন

সাঈদ-উর-রব : মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে মোরা যুদ্ধ করি, তীর হারা এ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে…..ইত্যাদি অবিস্মরণীয় গানের শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আপেল মাহমুদ ৩৮ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঠিকানাকে প্রদত্ত একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রয়োজনে তাদের সাথে হালুয়া রুটি খাবার ইতিহাসও আছে রাজনৈতিক দলের। তাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যদ্দিন ঐক্যবদ্ধ না হবে ততোদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরের কথা, কিছুই হবে না। এবারের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঐক্যের সংকল্প গ্রহণ করতে হবে।
আসল নাম আবু সাত্তার মো. শাহজামান। আপেল মাহমুদ হিসেবেই বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে পরিচিত তিনি সকলের কাছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণাদানকারী এ সঙ্গীত শিল্পী ১৯৪৭ সালের ২২ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার সম্ভ্রান্ত মুন্সিবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
আপেল মাহমুদ মূলতঃ পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই সাংস্কৃতিক জগতে পদার্পণ করেন। কুমিল্লা জেলা স্কুলে অধ্যয়নকালে ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল তিনবার তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে পল্লী গীতি, নজরুল সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান এবং গজলে ১১টি স্বর্ণপদক লাভ করেন। তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ সুরেন দাস, ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দিন এবং মোহাম্মদ মুতরির প্রমুখ প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধকগণের কাছে সঙ্গীতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তালিম নেন। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সর্বদা নিজেকে জড়িয়ে সমগ্র দেশে চারণের মতো গণসঙ্গীত পরিবেশন করে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
৬০-এর দশকে গণসঙ্গীতের ভূবনে এক অনিবার্য উচ্চারিত নাম আপেল মাহমুদ। উল্লেখ্য, একাধিকবার পল্টন ময়দানের জনসমুদ্রে গণসঙ্গীত পরিবেশনের কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। যা শুধু এ দেশেই নয়, এ উপমহাদেশের ইতিহাসেও এক বিরল ঘটনা। ১৯৬০ সাল হতে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সর্বদলীয়ভাবে একুশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পল্টনের ময়দানে অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব অনুষ্ঠানে প্রায়শই লক্ষ শ্রোতার ঢল নামতো। টানা ৪ দশকে সমানভাবে জনপ্রিয় শিল্পী আপেল মাহমুদের সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন : আপনার কৈশোর-শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন।
আপেল মাহমুদ : শৈশব-কৈশোর কুমিল্লা লেডি ফাতেমা বর্ণমালা দিয়ে শুরু। এটা একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। তখনকার সকলের কথা মনে পড়ছে না। পল্টন, নাসীর, ছাত্তার, রৌফ এই মুহূর্তে কে কোথায় আছে বলতে পারছি না। মনে আছে কুমিল্লার প্রায় প্রতিটি ঘরে সকাল সন্ধ্যায় আজান, শঙ্খধ্বনি আর হারমোনিয়াম তানপুরার শব্দ ভেসে বেড়াতো। প্রচুর খেলাধুলা করতাম। হঠাৎ আব্বা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। আর্থিক অনটন যেন গেঁড়ে বসলো। চলে যেতে হলো মামার বাড়িতে। পুরো জীবনধারাটাই বদলে গেল। লেখাপড়া চালাতে আমার মা আমাদের জন্য চাকরি নিতে বাধ্য হলেন। আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাদের চার ভাইবোনকে দেশে বিদেশে রেখে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। আমার মা অনন্যা।
প্রশ্ন : লেখাপড়া করেছেন কোথায়?
আপেল মাহমুদ : কুমিল্লা জেলা স্কুল, নরসিংদী, তৎকালীন কায়েদে আজম মহাবিদ্যালয় বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মহাবিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রশ্ন : সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কীভাবে?
আপেল মাহমুদ : আম্মা গীটার বাজাতেন (হাওয়াইন)। আপা, বড়ভাই গান শিখতেন।
প্রশ্ন : সঙ্গীতের উপর আপনার প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা রয়েছে কি?
আপেল মাহমুদ : গান শিক্ষাগুরুর প্রথমেই ডা. মোঃ সুতরীর। তারপর সুখেন্দ চক্রবর্তী, ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁ , ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দিনের কাছে তালিম নিই।
প্রশ্ন : কক্তশিল্পী হিসেবে আপনার প্রথম আত্মপ্রকাশ কখন কীভাবে ঘটলো?
আপেল মাহমুদ : কুমিল্লা জেলা স্কুল হতে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে অংশগ্রহণ করি। তখন ক্লাস নাইন-এর ছাত্র। ঢাকা কলেজে এ প্রতিযোগিতা হতো। সমগ্র দেশ হতে স্কুলের জেলাভিত্তিক প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করে ঢাকায় আসতে হতো। প্রথম বছরই তিনটা গোল্ড মেডেল পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হলে কুমিল্লা রেলস্টেশনে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীসহ অগণিত জনতা আমাকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিল। তখন কুমিল্লা শহরে কোন ভাল অনুষ্ঠান হলে আমাকে গান গাইতে হতো। অজান্তে এভাবেই ক্রমান্বয়ে জানা হয়ে গেল আমি গান জানি।
প্রশ্ন : আপনি রেডিওতে কীভাবে এবং কখন থেকে যুক্ত হলেন? চাকরি থেকে অবসর নিলেন কবে?
আপেল মাহমুদ : সোহরাওয়ার্দী কলেজ হতে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। মাঝখানে অনেক গ্যাপ গেছে। ১৯৬৮ সাল, আধুনিক, গজল, নজরুল সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক এবং পল্লীতে প্রথম হই। আর তখনই মরহুম বীর আলী ভাই, নাজমুল হুদা বাচ্চু ভাই, সমর দাস (বোর্ডের সদস্য), রেডিও পাকিস্তান শাহবাগ কেন্দ্রে আসতে বললেন। মনে পড়ে যদ্দুর. ফেব্রুয়ারি মাসের ১ম সপ্তাহে আমি বেতার শিল্পী হই। একই বছর পিটিভি ঢাকার এনলিস্টমেন্ট হই। সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে ১৯৭১-এর ১ জুন রেডিওতে যোগদান করি।
প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হওয়ার স্মৃতিচারণ করবেন কী?
আপেল মাহমুদ : ২৫ মার্চ হতে তদানীন্তন ক্যাপ্টেন মতিউরের নেতৃত্বে নরসিংদী হতে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ১০ এপ্রিল নরসিংদী ফল হলে চলে যাই ভৈরব, আশুগঞ্জ, আজমীরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চুনারুঘাট, চাদপুর এবং তেলীপাড়া। যদ্দুর মনে পড়ে ২৪/২৫ মে কর্র্ণেল ওসমানী, এমআর সিদ্দিকী, আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শফি ভাই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন। তার আগে আগরতলায় নিয়ে রাখেন। আমি প্রায়ই যারা অপারেশনে ঢাকা যেত তাদের কাছে শিল্পীদের ঠিকানা দিতাম এবং সম্ভব হলে তাদেরকে দিয়ে আসার অনুরোধ করতাম। এমনি করে মো. আব্দুল জব্বার ভাইকে আগরতলায় আনা হলো। অবশ্য তিনি শুরুতেই ২ এপ্রিল নরসিংদী এসে আমার সাথে দেখা করে যান। আগরতলায় চিফ মিনিস্টারের অনুরোধে শরণার্থীদের জন্য শো করেছিলাম। সেখানে সভাপতিত্ব করেছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ অনুষ্ঠানটির জন্য মহড়ার ব্যবস্থা ছিল। তাতে বেশ কিছু শিল্পীর সন্ধান পেলাম তা থেকে আমি, জব্বার ভাই তিনজনকে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলাম। ১ জুন স্বাধীন বাংলা বেতারে যুক্ত হই।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অন্য কোন অভিজ্ঞতা রয়েছে কি?
আপেল মাহমুদ : ১০ এপ্রিল নরসিংদী ছাড়তে হলো সন্ধ্যায়। স্যাভর জেট-এর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে নরসিংদী জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেল। সেদিন একজন মহিলাই নরসিংদী শহরে ছিলেন। আর ৮২ জন আমরা মুক্তিযোদ্ধা। বাচ্চু, ছাত্তার, নজরুল, আলীসহ ক্যাপ্টেন মতিউরের নেতৃত্বে আর সে মহিলাটি আমার মা। তিনি যাবেন না আমাকে ফেলে। আমার ছোট ভাই ডালিমও আমার সাথে। বাচ্চুকে ছাত্তার ভাইকে ইশারা করে জোর করে আম্মাকে বড় একটি নৌকায় (পূর্বেই ঠিক করে রাখা) ধাক্কা দিয়ে ডালিমের ওপর ফেলে দিয়ে নৌকা মেঘনায় ভাসিয়ে দিয়ে বলেছিলাম আম্মা বাঁচলে দেখা হবে। অনেক স্মৃতির ভেতর এটাই শ্রেষ্ঠ।
প্রশ্ন : ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’ এবং ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’….. গানের মত অবিস্মরণীয় আর কতটি গানে আপনি কক্ত দিয়েছেন?
আপেল মাহমুদ : মোরা একটি ফুলকে গোবিন্দ হালদারের লেখা, সুর আমার, গাওয়াও আমার। তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর আমার লেখা। আমার সুর এবং আমারই গাওয়া। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে গানটি লিখেছেন গোবিন্দ হালদার, সুর আমার এবং সমবেত কণ্ঠে গাওয়া। আমার মনে হয় সবচাইতে বেশি গেয়েছিলাম, ৩১টি গান আমি গেয়েছি।
প্রশ্ন : গীতিকার হিসেবে আপনার গানের সংখ্যা কত?
আপেল মাহমুদ : সর্বসাকুল্যে ২০০ (দুইশত) গান আমি লিখেছি।
প্রশ্ন : কক্তশিল্পী হিসেবে নিজেকে আপনি কতটা সম্মানীত বোধ করেন?
আপেল মাহমুদ : এটার পরিসংখ্যান করা আমার পক্ষে কঠিন। সমগ্র দেশই আমাকে সম্মান দেখিয়েছে, দেখাচ্ছে। আমি দারুণভাবে সম্মানীত।
প্রশ্ন : সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেয়ার কথা কখনো ভেবেছিলেন কি?
আপেল মাহমুদ : সরকারি চাকরি আর সঙ্গীত চর্চা বেতারের মতো প্রতিষ্ঠান খুবই কঠিন। সুর্যোদয় যদি বা কখনো দেখেছি সূর্যাস্ত কখনো দেখিনি চাকরিকালীন সময়ে। তাই সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেয়ার কথা মনে আসেনি।
প্রশ্ন : সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেয়ার মত পরিবেশ বাংলাদেশে তৈরী হয়েছে কি?

আপেল মাহমুদ : সত্যিকার জাত শিল্পী, যারা বর্তমানে সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তারা ভালই আছেন এবং বাংলাদেশে ভাল গানগুলো টেকসই হচ্ছে যদি ভাল কণ্ঠে গায়।
প্রশ্ন : বর্তমানের কক্তশিল্পীদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
আপেল মাহমুদ : ভাল কণ্ঠ আছে সামিনা, ফাহমিদা, কনক, আসিফ, মনির খানের এবং তারা ভাল গাইছে। সামিনার মতো কণ্ঠ কলকাতায়ও নেই।
প্রশ্ন : হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের সঙ্গীত চর্চায় কোন ফারাক মনে হয় কি?
আপেল মাহমুদ : বর্তমানে সঙ্গীত চর্চা বলতে যদি শুধু গান গাওয়াটা বোঝায় তবে চর্চা হচ্ছে কিন্তু গান শোনার মতো হচ্ছে কি? হাজার বছরের মতোই পার্থক্য হয়ে গেছে।
প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় নতুন প্রজন্মে পাশ্চাত্যের প্রভাব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং সে ধরনের সঙ্গীতের প্রতি দর্শক-শ্রোতাদের ঝোঁকও বেড়েই চলেছে?
আপেল মাহমুদ : অবশ্যই পাশ্চাত্যের প্রভাব এই প্রজন্মকে মোহগ্রস্ত করে ফেলেছে এবং সরকারের পক্ষ থেকেই সব দেশে একটি সীমারেখা টানা থাকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর, যা আমার দেশে নেই। সেই কারণে জনগণ, দর্শক শ্রোতারাও মোহগ্রস্ত হয় বৈকি।
প্রশ্ন : বেসরকারী টিভি চ্যানেল চালুর ফলে কক্তশিল্পীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রতিভা অন্বেষণের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে বলে কি আপনি মনে করেন?
আপেল মাহমুদ : বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর শিল্পীরা তাদের স্ব অর্থে নির্মিত সিডি দিয়ে প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে বৈকি তবে যাদেরকে প্রতিভা অন্বেষণের নামে টেনে তোলার প্রচেষ্টা হচ্ছে তা শুধুমাত্র ব্যবসার জন্যই মনে হয় করা হচ্ছে। এরা কদ্দূর যেতে পারবে পণ্য হিসাবে তা দেখা যাবে সত্বরই।
প্রশ্ন : এ যাবত আপনি কতটি গানে কক্ত দিয়েছেন? এরমধ্যে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে কতটি গান?
আপেল মাহমুদ : প্রায় শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছি। জনপ্রিয়তা বলতে আমি যা বুঝি হৃদয়ে গেঁথে থাকার মতো গান, আর তাই যদি হয় আপনিই বলুন না আমার গানের চেয়ে প্রিয় গানের ব্যাপারটা তবে জাতীয় সঙ্গীত সবচাইতে জনপ্রিয়।
প্রশ্ন : আপনার প্রকাশিত সিডির সংখ্যা কতটি?
আপেল মাহমুদ : তা জানি না, খুব বেশি নয়। তবে চুরি হয়ে যাওয়া আমার গানে সয়লাব দেখি বাজার, ধরতে পারছি না। ধরতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : রেডিও-টিভিতে প্রচারিত গানের রয়্যাল্টি পাচ্ছেন কি?
আপেল মাহমুদ : না রয়্যালিটি পাচ্ছি না। সিস্টেম নেই, এটা হওয়া উচিত। শুধু গীতিকার, নাট্যকারগণ পাচ্ছেন।
প্রশ্ন : রেডিওতে উচ্চতর পদে কাজ করেছেন বলেই কি রেডিওতে আপনার গান অধিক প্রচারিত হয়েছে? আপেল মাহমুদ : আমার গানের অনুরোধ এখনো সবচাইতে বেশি আসে, যেমন লিখেছ আর না আসিতে, আবার পাতা ঝরার দিন এল, একটি ফুলকে, তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর ইত্যাদি।
প্রশ্ন : আপনার কী কখনো মনে হয় যে রেডিওতে এখনও কক্তশিল্পীদের সিডিউল বন্টনে পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে?
আপেল মাহমুদ : এটা ঠিক নয়। আপনাদের কাছে (সাংবাদিক) সততা আশা করছি।
প্রশ্ন : সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেডিও ও বিটিভি কি শিল্পীদের সাথে যথাযথ আচরণ করছে?
আপেল মাহমুদ : রেডিও বরাবরই শিল্পীদের সাথে সদাচরণ করে থাকে। কারণ শিল্পী না থাকলে বেতার থাকার কোনো মানে নেই।
প্রশ্ন : বেসরকারী টিভিগুলোতে প্রায়ই শিল্পীদের পারিশ্রমিক যথাযথভাবে প্রদান করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আপনিও কি এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হন?
আপেল মাহমুদ : খুবই সত্যি কথা। শুধুমাত্র দিগন্ত এবং বৈশাখী ভালো পেমেন্ট দেয়। অন্য চ্যানেলগুলো খুবই কম পেমেন্ট দেয়। এটা লজ্জার ব্যাপার। অথচ বৈশাখী স্বল্প আয় করে অন্যগুলোর তুলনায়।
প্রশ্ন : ৩৫ বছর আগের আপেল মাহমুদ এবং আজকের আপেল মাহমুদের মধ্যে কতটা ব্যবধান বলে আপনি মনে করেন?
আপেল মাহমুদ : ৩০, ৩৫ বছর আগের বাংলাদেশের অবস্থায় অফিস আর নেই। যা দেখছি, কি দেখছি তা ভাবিনি কোনদিন।
প্রশ্ন : রেডিও থেকে অবসরের পর আপনার জীবন কাটছে কীভাবে? শুধু গান গেয়ে নাকি অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে?
আপেল মাহমুদ : জীবনের ব্যস্ততা কমেনি, কমবে বলে ভাবছি না। এটা আল্লাহর রহমত। আমি প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন প্রধান হিসেবে কাজ করছি এবং রেগুলার মিউজিকের কাজ করছি সাথে সাথে।
প্রশ্ন : আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
আপেল মাহমুদ ঃ আমার দুই মেয়ে। বড়টার বিয়ে হয়েছে। চলে গেছে সিডনিতে স্বামীর সাথে। এমবিএ পড়ছে ছোটটা। নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছে। আর আমার স্ত্রী, সর্বসাকুল্যে চারজনের সংসার এখন তিনজন। বড় মেয়ের নাম মাহজাবীন মাহমুদ। তার স্বামীর নাম নঈম মাহমুদ। ছোট মেয়ের নাম শাহনাজ মাহমুদ। আমার স্ত্রীর নাম নাসরীন আকতার মাহমুদ এবং আমার মায়ের নাম আমিনা রহমান।
প্রশ্ন : নতুন প্রজন্মের জন্য কোন পরামর্শ রয়েছে কি?
আপেল মাহমুদ : নতুন নতুন সবকিছুই শিখবে, তবে দেশপ্রেম হৃদয়ে গেঁথে নিতে হবে। বলতে হবে দেশই প্রথম এবং তার জন্যই মানুষ হতে হবে।
প্রশ্ন : একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির চলমান আন্দোলন সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? আপেল মাহমুদ : হঠাৎ মনে পড়ে। তাই আন্দোলন এদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে তাদের সাথে হালুয়া রুটি খাবার ইতিহাসও আছে রাজনৈতিক দলের। শুধু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যদ্দিন ঐক্যবদ্ধ না হবে ততোদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দূরের কথা, কিছুই হবে না। মুক্তিযোদ্ধারা অনেকভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে।
প্রশ্ন : সরকারী চাকরি থেকে অবসরে যাবার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি দলের সরকার দেখেছেন? সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো সরকার এবং সবচেয়ে মন্দ সেরকার কোনটি ছিল বলে আপনার মনে হয়।
আপেল মাহমুদ : বাংলাদেশ ঠিকই আধুনিক বিশ্বের সাথে দৃপ্তপদে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের তথ্য প্রযুক্তির নামে ধীরে ধীরে আরো সবল হচ্ছে।
প্রশ্ন : স্যাটেলাইট অথবা তথ্য প্রযুক্তির এ যুগের সাথে বাংলাদেশ কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পাচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?
আপেল মাহমুদ : প্রত্যেক শিক্ষিত স্বাধীন চেতা ব্যক্তি অবশ্যই রাজনৈতিক সচেতনতায় দৃপ্ত এবং একটি বিশ্বাস নিয়ে আছে। আমার বেলায়ও তাই।
প্রশ্ন : ব্যক্তিগতভাবে আপনার কোন রাজনৈতিক বিশ্বাস রয়েছে কি?
আপেল মাহমুদ : হিন্দী ঠেকাও, হিন্দী সংস্কৃতি উর্দুর মতোই আমাদেরকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন করার আহবান জানাই। এটা করতে পারলেই আমাদের মুখ থেকে ধুলাবালি সরে গিয়ে পরিষ্কার হবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনকে আরো পরিশিলীত করতে আপনার কোন পরামর্শ রয়েছে কি?
আপেল মাহমুদ : মানবেন্দ্র, মান্না দে’র গানই কৈশোর থেকে প্র্যাকটিস করেছি।

প্রশ্ন : প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাবার আগে আপনার কোন শিল্পীর গান ভালো লাগতো?
আপেল মাহমুদ : বাংলাদেশে সামিনা, ফরিদা পারভীন, পাকিস্তানে গোলাম আলী, মেহদী হাসান, নুরজাহান, ভারতে মানবেন্দ্র, মান্না দে, প্রতিমা, সন্ধ্যা মুখার্জি আরো অনেকে।
প্রশ্ন : আপনার গায়কীতে কারো প্রভাব পড়ে কি?
আপেল মাহমুদ : আমারই প্রভাব পড়ে।
প্রশ্ন : এখন আপনার পছন্দের শিল্পী কে বা কারা? আপেল মাহমুদ : সবাই গাইতে পারে তবে সিরিয়াস নয়। আমার আম্মা আমার সঙ্গীতের পেছনে।
প্রশ্ন : আপনার পরিবারের আর কেউ সঙ্গীত জগতে আছে কি? আপনাকে শিল্পী হতে কার প্রেরণা অধিক অনুপ্রাণীত করেছে?
আপেল মাহমুদ : আমি স্বপ্ন নিয়ে খুব একটা ভাবি না। আর যুদ্ধ করেছি দেশ স্বাধীন করেছি। বাংলাদেশ করেছি।
প্রশ্ন : কোন্ স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন? সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছি কি? না হয়ে থাকলে কেন হয়নি? এজন্যে কাকে দায়ী করবেন? আপেল মাহমুদ : আর বেশি কিছু ভাবছি না। তবে এদেশ নিকট ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী দেশ হবে, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উভয়ভাবে। যদি না আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি রাষ্ট্র আমাদের দাবিয়ে না রাখতে চায়। তবে চাইলেও দাবিয়ে রাখা যাবে না।
প্রশ্ন : কখনো কি মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ করে ভুল করেছেন?
আপেল মাহমুদ : মুক্তিযুদ্ধ করে ভুল করেছি- এ কথাটা যে বলবে সে উন্মাদ অথবা যুদ্ধ করেনি। আমি মুক্তিযোদ্ধা এর চেয়ে বড় গৌরবের আর কিছু আমার কাছে নেই।
প্রশ্ন : আপনি শেখ মুজিব, জিয়া, জেনারেল ওসমানীর মূল্যায়ন করেন কীভাবে?
আপেল মাহমুদ : বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা তার অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণেই আমরা ধাপে ধাপে একটি লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় উজ্জীবিত হয়েছিলাম এবং জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় বাকি কাজগুলো সমাপ্ত করতে মরণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ওসমানী সাহেবের ওপর যে দায়িত্ব তিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনালগ্নে, উনসত্তরের গণআন্দোলনের প্রাক্কালে আপেল মাহমুদের রচিত এবং সুরারোপিত এবং ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় গণসঙ্গীতের মধ্যে দু/তিনটি এখানে উল্লেখ করা হলো : বিধির এক নিষ্ঠুর খেলা তোমায় নিয়ে/ তোমার কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি সাজিয়ে দিয়ে,/ তোমার সোনার হাতে ভিক্ষা দিলে যাদের সেদিন/ তাদের দ্বারে তোমায় দেখে অশ্রু ঝরে।/ তোর পাটের টাকায় পিন্ডিতে/ তারা রাজধানী বানায়,/ আর তোর বাড়িতে শুইবার ঘরে/ চালা বেড়াও নাই।/ কোটি টাকা করছে খরচ/ পিন্ডির ঐ বেহেস্তখানা-তোরা/ হিসাব শেখো রে।/
আমার সোনার বাংলারে/ তোর কপালে এতো দুঃখ ছিল।/ এত দুঃখ তুই যে পাবি/ আগে কি কেউ ভাবছিল।/
১৯৬২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে জনাব আপেল মাহমুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এ দেশের মানুষের মনে স্থায়ী আসনের দাবিদার। একইভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন তার গাওয়া গান আজও এদেশের আপামর জনগণের মনে গেঁথে আছে এবং তার দেশাত্মবোধক গানগুলো এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো : এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে, তীর হারা ঐ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে, হুশিয়ার হুশিয়ার, এ ঘর দুর্গ ও ঘর দুর্গ, রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নিব আমরা, সারা বাংলা জেলখানা শিকল পায়ে রাখব না এবং পথে যেতে যেতে জন্ম হল এই কাহিনীর। তার গানগুলো আজও এ দেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে আপেল মাহমুদও ততোদিন বেঁচে থাকবেন তার এসব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ১৯৬৮ সাল থেকে আপেল মাহমুদ বেতার, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়ে আসছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্রানাডা টেলিভিশনের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ২নং সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধ এ্যাকশনকে নিয়ে ঘটর অভ ইর্ডধমভ নামে একটি ছবি তৈরি করা হয়েছিল। এ ছবিটির নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়েছিলেন জনাব আপেল মাহমুদ। কোন বিদেশি আন্তর্জাতিক মানের ছায়াছবিতে নেপথ্যে কণ্ঠদান ছিল কোন বাংলাদেশী সঙ্গীত শিল্পীর প্রথম। আজ অবধি তার গানের পাঁচটি লংপ্লে, চারটি ক্যাসেট ভলিউম, পাঁচটি এসপি এবং দুটি ইপি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে তার গানের দুটি সিডি বের হয়েছে। আপেল মাহমুদ জাতীয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে বহুবার বিদেশ সফর করেন। একজন বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে একক সঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়াও বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়েস ডেলে, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার রেডিও, টিভিতে সঙ্গীত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। আপেল মাহমুদ দেশের বাইরে শিল্পীদল পাঠানোর জন্য গঠিত জাতীয় নির্বাচন কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সঙ্গীত শিল্পী সংস্থার মহাসচিব, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সুজলা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সভাপতি এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কম্যান্ড কাউন্সিলের প্রাক্তন সাংস্কৃতিক সম্পাদক। আপেল মাহমুদ দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গান রচনায়, সুরে ও গায়কীতে এক নিজস্ব ধারার সৃষ্টি করেছেন যা দেশে-বিদেশে আপামর মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি শুধু একজন শীর্ষ পর্যায়ের কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং গীতিকার হিসেবেই পরিচিত নন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি শিল্পী, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর নিয়মিত লিখে থাকেন। দেশে বিদেশে বেসরকারিভাবে বহুবার তাকে বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের নামে প্রবর্তিত পদক ও সম্মাননা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেরে বাংলা স্বর্ণ পদক, জিয়া স্বর্ণ পদক, সেতু বন্ধের সম্মাননা পদক, তর্কবাগীশ স্বর্ণ পদক, জসীম উদদীন পদক, কুমিল্লা জেলা ফাউন্ডেশন স্বর্ণ পদক এবং বাচসস-এর লাইফ টাইম এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য। বিদেশে প্রাপ্ত সাফল্যের মধ্যে টোকিওতে জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির বিজয় দিবস স্বর্ণ পদক, বাংলাদেশ-জার্মান মৈত্রী সমিতির পক্ষ থেকে ফ্রাংকফুটে জার্মানির অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ স্বর্ণ পদক প্রাপ্তি এবং সঙ্গীতানুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টা ত্রিশ মিনিটের একক সঙ্গীত পরিবেশনা ছিল উল্লেখ করার মতো বিষয়। এছাড়া নিউজিল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়ায়ও তিনি একক সঙ্গীত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, তিনি বেতারের বহু নাটকেও অংশগ্রহণ করেছেন।