মূলধারার নির্বাচনে বাঙালি : কমিউনিটির করণীয়

আমরা কথায় কথায় বলে থাকি-এই প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি বেড়ে চলেছে। দেশের রাজনীতি, দেশের ভাবনাসহ নানা উপলক্ষে কমিউনিটির নেতা হিসেবে যাদের আমরা চিনি, তাদেরকেও যথেষ্ট সক্রিয় দেখি। কমিউনিটিতে আমাদের মতো যারা সাধারণ মানুষ, তারা নেতাদের ডাকে বেশ সাড়াও দেন। বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে সাড়া দিয়ে সেসব বেশ উপভোগও করেন। ভাগাভাগি, রাগারাগি, গালাগালি, বিভক্তি-বিচ্ছেদ, পুলিশ ডাকাডাকি, হাতে হ্যান্ডকাফও দেখা যায়। সোসাইটিসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচনে লাখ লাখ ডলার ব্যয়ের খবরও শোনা যায়। মামলা-মোকদ্দমাতেও অনেকে অনেক অর্থ খরচ করেন বলে জানা যায়।
এত কিছুর পরও মূলধারায় বাংলাদেশিদের পদচারণ মৌলিক অর্থে তেমনটা নেই বললেই চলে। ‘মৌলিক অর্থে’ বলা হলো এ কারণে যে, অনেককেই বলতে শুনি-আমরা তো মেইন স্ট্রিমে রাজনীতি করি। কাউকে কাউকে ‘মেইন স্ট্রিটে রাজনীতি করি’ এমন কথাও বলতে শোনা যায়। হয়তো তা ভুলবশত কিন্তু প্রকৃত বাস্তবে যা দেখা যায়, তা বাংলাদেশিদের প্রবাসী-কমিউনিটির প্রয়োজনে কতটা কাজে লাগে, তা নিয়ে ২০ বছর আগেও যে ধারণা ছিল মানুষের, আজও জরিপ চালালে তার খুব পরিবর্তন ঘটেছে বলে প্রতিষ্ঠা পাবে না। পেছনে অনেক কারণই দাঁড় করানো যাবে হয়তো, কিন্তু সত্য এটাই যে আমরা মূলস্রোতে নিজেদের কমিউনিটি হিসেবে যতটা প্রয়োজন ছিল ততটা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারিনি। খুব বেশি হলে ব্যক্তিগতভাবে দু-একজনের কিছুটা হয়তো জায়গা হয়েছে হাই-হ্যালোর মধ্যে। আর মূলধারার যারা রাজনীতিবিদ আমাদের ভোট এবং সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হচ্ছেন, তারা আমাদের মাঝে এসে শুধু ‘কেমন আছেন, সালামু আলাইকুম, শুভ নববর্ষ, আমি তোমাদের ভালোবাসি’-এ কথায় ভুলিয়ে আমাদের ভোট নিয়ে নিজেদের কাজ হাসিল করে নিচ্ছেন।
বিনিময়ে আমাদের আরো অনেক কিছুই পাওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিকদের যে সংখ্যার কথা শোনা যায় এবং জ্যামাইকা, ওজনপার্ক, ব্রুকলিনে জনসংখ্যার যে ঘনত্ব- তাতে দু-একজন জনপ্রতিনিধি ইতোমধ্যেই নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। তা হয়নি। চেষ্টা যে দু-একজন করেননি, তা নয়। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন নির্বাচনী প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নামলেও আজ পর্যন্ত সফল হয়েছেন, এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে নাগরিক সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, নির্বাচনে দাঁড়ানোর সংখ্যাও বাড়ছে। এও বিশ্বাস রাখি-একদিন কেউ না কেউ সফল হবেন। আমরা নির্বাচিত আইনপ্রণেতাও পাব অবশ্যই একদিন। একবার না পারিলে দেখো শতবার। সে ক্ষেত্রে সাফল্য একদিন ধরা দেবেই।
সেই প্রত্যাশায় হয়তো এবারো অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই সে লক্ষ্য অর্জনে কাজও শুরু করে দিয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরা যেমন অনেকেই বারবার চেষ্টা করছেন, আমরাও বারবার আশা করে যাচ্ছি। আশা করি, একদিন ব্যাটে-বলে লেগে যাবেই। এবার নির্বাচনে যারা নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ইতিমধ্যেই এবং আরো দুয়েকজন যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত রয়েছেন বদরুন নাহার খান মিতা, মিসবাহ আবদীন, জয় চৌধুরী, মেরি জুবায়েদ, সোমা সাঈদ, ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, তৈয়বুর রহমান হারুন ও শাহ শহীদুল ইসলাম। মিতা খান এবং জয় চৌধুরীকে নিয়ে মতবিনিময় সভা, ফান্ডরেইজিং ডিনারও হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো হবে এবং আমরা যারা আশা করি, নিজেদের একজন আইনপ্রণেতা পাব, তারাও আশা করতে থাকবে।
নিউইয়র্কের বাইরে ফ্লোরিডা, আটলান্টা, মিশিগান, নিউজার্সি, ক্যালিফোর্নিয়াতেও আমাদের অনেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইতিপূর্বে নিউইয়র্কের বাইরে কয়েকজন নির্বাচিত হয়েছেনও। এখনো নির্বাচিত দু-একজন আছেন। আমরা এবারও তাদের সাফল্য কামনা করি। তাদের নিয়েও আমাদের সম-অহংকার। তারা নিজেদের যোগ্যতা-দক্ষতা দিয়ে কমিউনিটি এবং বাইরের ভোটারদের মন জয় করে নির্বাচিত হচ্ছেন। তাদের সাফল্য আমরা এই প্রবাসে যে যেখানেই বসবাস করি না কেন, আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, দেশের মর্যাদা বাড়ায়।
নিউইয়র্কের বাইরে যারা নির্বাচিত হন, তাদের নির্বাচনে বিজয় লাভের পেছনে রহস্য কী কে জানে! তবে কেবল যে বাংলাদেশি বলেই সব বাংলাদেশি ভোটকেন্দ্রে ভিড় করে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে দেবে আরেক বাংলাদেশিকে, এমন ভাবনা নির্বাচনে জয় অর্জনের জন্য পজিটিভ ভাবনা নয়। মূলধারার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা আমাদের অনেক থাকলেও তাদের অন্দরে প্রবেশ করার জন্য সবচেয়ে প্রথম প্রয়োজন এ দেশের ভাষায় দক্ষতা অর্জন। যেকোনো সমাজেই তার মূলে প্রবেশ করার প্রথম শর্ত- তার নিজস্ব ভাষায় তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পরই কেবল তার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পাকিস্তান ২৪ বছর পূর্ব পাকিস্তানকে কেবল শাসন এবং শোষণই করেছে, জানা এবং বোঝার চেষ্টা কখনো করেনি। তাই তো পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষা নিজেরা রপ্ত না করে উল্টো বাঙালিদের মুখ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে বছরের পর বছর বাস করেও বাংলা ভাষা শেখার তাগিদ বোধ করেনি। সে কারণেই ধর্ম এক হয়েও তারা এবং আমরা পৃথকই থেকে গেছি, এক হতে পারিনি। এবং একসময় স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওরা ওদের ভোট দিয়েছে, আমরা আমাদের ভোট দিয়েছি।
দ্বিতীয়ত, এ কথা মনে করাও মনে হয় বড় একটা ভুল যে, বাঙালি হলেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সবাই বাঙালি প্রার্থীকে ভোট দিয়ে আসবেন। ভোট বড় এক জটিল বিষয়। সাধারণ সব হিসাব-নিকাশ নির্বাচনে অচল। ভোটাররা কী বলেন, আর কী করেন মহা-অঙ্কবিদেরাও মেলাতে পারেন না। এ দেশে এক্সিট পোলে হিসাবের কিছুটা জানা গেলেও বাঙালি ভোটারদের বোঝা মুশকিল। একজনের পান-বিড়ি খেয়ে ভোট অন্যজনকে দিয়ে আরেকজনের চা-নাশতা খেয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
কথা আরো আছে। আমাদের কমবেশি সবারই অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্তত যারা ভোটার তাদের মধ্যে এ দেশে যারা নির্বাচনের রাজনীতি করেন, তাদের প্রচার পদ্ধতি নিয়ে। বছরজুড়েই তারা ভোটার সংযোগ করেন। নিজ ডিস্ট্রিক্টের অধীন সব পদের প্রার্থী প্রত্যেকে ভোটারকে চিঠি দিয়ে, ফ্লায়ার দিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করেন। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা চিঠি দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এমনকি জন্মদিন উপলক্ষেও অনেকে হ্যাপি বার্থ ডে উইশ করে চিঠি দেন। বাঙালি প্রার্থী যারা তাদের এই প্রচারণার ব্যাপারে খুব দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। মনে হয়, বিশেষ একটি গ্রুপ তাদের পরিচালনা করে এবং সেই সব গ্রুপ, প্রার্থীদের তাদের নিজ নিজ বলয়ের মধ্যেই ঘুরপাক খাওয়ান। বৃত্তের বাইরে আর প্রার্থীদের মুখ তোলার সুযোগ দিতে চান না। কিন্তু স্বদেশি হোক আর যেই হোক, সব ভোটারই চান প্রার্থী সরাসরি একটু তাদের কাছে ভোট চান, ভোটারদের একটু খোঁজখবর রাখুন।
যা হোক, আমরা আশা করি, দিনে দিনে আমরাও একদিন সব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব। মূলধারার নির্বাচনে মূলধারার মতোই প্রচারণা চালিয়ে সাফল্য অর্জনে সক্ষম হব। সাফল্য অর্জন এখন আমাদের জন্য সময়ের দাবিই শুধু নয়, মর্যাদারও ব্যাপার। এ দেশে কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয়, যদি মূলধারায় আমাদের কণ্ঠ সোচ্চার না হয়। আমাদের ভোটার আছে, কণ্ঠ আছে, মূলধারায় ওঠাবসা আছে। মূলধারার অনেক গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিও আমাদের মাঝে এসে আমাদের নানা অবদানের কথা বলে উৎসাহিত করে আমাদের হাততালি এবং ভোট নিয়ে যান, আমাদের ঝুলি শূন্যই থাকে। আমরা শুনি মূলধারায় ভোট এবং পদ থাকলে কমিউনিটির জন্য অনেক কিছু আদায় করে নেওয়া যায়। এবার যেন আমরা সেই পথ ধরে অগ্রসর হতে পারি।
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা আর যেন ভুল পথে না হাঁটি। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা-নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। আমাদের শুধু একদলের সঙ্গে অন্য দলের বৈরিতা নয়, দলের মধ্যেও উপদল, বিভক্তি, ভাঙন। নিজ দলে নিষ্ক্রিয় থাকলেও উপদলে ভীষণভাবে সক্রিয়। এক সংগঠনের ভাঙন, এক এলাকার মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, মনোমালিন্য। মূলধারায় জায়গা পেতে হলে নিগেটিভ সবকিছু দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। অন্তত মূলধারার নির্বাচনের প্রশ্নে সব বিচ্ছিন্নতা ঝেড়ে ফেলে মাঠে নামতে হবে। কয়টা আসনে জয় আসবে, না ভেবে পজিটিভ ফলাফলের জন্য কোমর বেঁধে কাজ করতে হবে।
আমরা সব প্রার্থীর সাফল্য কামনা করছি।