মূলধারার নির্বাচনে বাঙালিদের উত্থান

বিশেষ রিপোর্ট : ২০২০ বছরটি নির্বাচনী বছর। এ দেশে প্রতিবছরই কিছু কিছু পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। তবে প্রতি চার বছর অন্তর অন্যান্য অনেক পদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছরটিকে বলা হয় নির্বাচনী বছর। এবার সেই নির্বাচনী বছর, যা নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে।
সেই নির্বাচনকে সামনে নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিজয় অর্জনে যা খুশি তা-ই করার প্রবণতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। একদিকে করোনার আক্রমণ, পাশাপাশি চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। এর মধ্যেই গত ২৩ জুন মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রাইমারি।
নিউইয়র্কে ইউনিয়ন ‘স্টেট’ সিটি পর্যায়ে বিভিন্ন পদে প্রাইমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার করোনার কারণে অ্যাবসেন্টি ব্যালটে ভোট দেওয়ার সংখ্যা বেশি হওয়ায় গণনা শেষে চ‚ড়ান্ত প্রাইমারির ফলাফল প্রকাশে বেশ বিলম্ব ঘটবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনেরা। তাই হার-জিতের কথা এখনই বলে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে মূল নির্বাচনে বাঙালি প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কম মানুষই তেমন আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারেননি। তা সত্তে¡ও এবারের নির্বাচনে বাঙালি প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় সরব পদচারণ লক্ষ করা গেছে যেমন, তেমনি উত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিতও মিলেছে। ভোটকেন্দ্রে সরাসরি ভোট প্রদানের ফলাফল একটি আশাবাদী ভবিষ্যতের আভাস দেয়। যদিও যেকোনো প্রতিদ্ব›িদ্বতার শেষ কথা-বিজয় অর্জন। তবু এবার ভোট এবং প্রচারণা অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে।
কেন হচ্ছে না এই বিজয়ের দেখা পাওয়া? নিউইয়র্কে যত বাঙালির বসবাস, তাতে এত দিনে দু-একটি সাফল্য দেখার কথা ছিল। তা সত্বেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার যোগ ঘটছে না। আমরা ভাবতাম, ভাষার একটা সমস্যা আমাদের আছে। সেই সমস্যাই আমাদের কাক্সিক্ষত সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এবার যারা বাঙালি হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অধিকাংশেরই সেই ভাষাগত বিপত্তি ছিল না। এবার প্রার্থী হয়েছিলেন মূল নির্বাচন ছাড়াও অন্যান্য পদে বদরুন নাহার খান মিতা, মৌমিতা আহমেদ, জয় চৌধুরী, মেরি জুবায়দা, সানিয়াত চৌধুরী, মাহফুজুর রহমান, মো. এম. রহমান, মাহফুজুল ইসলাম, মাহতাব খান, জোহরান খান, শাহানা হানিফ, এন. মজুমদার, এ কে চৌধুরী ও জামিলা আখতার উদ্দিন। ভাষার দিক থেকে তারা অনেক অগ্রসর।
তবু কেন হচ্ছে না! ভোটে অগ্রগতি হলেও ফল কেন যা তা-ই হতে চলেছে। কেন হচ্ছে না-এসব নিয়ে যারা ভাবনা-চিন্তা করেন, তাদের নানাজনের নানা মত। কেউ বলছেন, ওই যে বাঙালি হিসেবে প্রার্থী হওয়া, ওটাই কারণ। এ দেশের নির্বাচনে বাঙালি প্রার্থী নয়, এ দেশের অর্থাৎ আমেরিকান প্রার্থী হতে হবে। মানে মূলধারার প্রার্থী হতে হবে। আমরা যেমন এ দেশের এ, বি, সি’তে ভোট দিই, তেমনি ওদের ভোটও অ আ ক খ’র পক্ষে পেতে হবে।
কেউ আবার এমন মতও প্রকাশ করেছেন-প্রচারণায় ত্রুটিও আমাদের কাক্সিক্ষত সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের প্রচারণা একেবারেই বাঙালিকেন্দ্রিক হয়ে যেতে দেখা যায় এবং প্রতিবছর একই প্রার্থীর পেছনে প্রায় একই মানুষজনকে একই স্টাইলে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। যাদের অনেকেরই আবার বাঙালি কমিউনিটিতে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে। দেখে মনে হয়, এ যেন বাঙালিদেরই কোনো নির্বাচন! প্রার্থীরা বিভিন্ন বাঙালি অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দেন, ভোট চান। ভুলে যান যে এটা এ দেশের নির্বাচন। এ নির্বাচনে আপনার পাশে পেতে হবে ইংরেজ, স্প্যানিশ, বাঙালি, হিন্দি-সব ভোটারকে। প্রচারেও থাকতে হবে এ দেশের স্টাইল, ট্র্যাডিশন। নানা রকম ফ্লায়ার-চিঠিতে ভোটারদের বাস্কেট ভরে যায় অবাঙালি সব প্রার্থীর। বাঙালি প্রার্থীদের এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকতে দেখা যায়।
এ দেশের নির্বাচনে অর্থ একটা বড় ফ্যাক্টর। অনেকের মন্তব্য-অর্থের জোগানেও মনে হয় আমাদের প্রার্থীদের টানাটানি থাকে! এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা খুব জরুরি। এ ক্ষেত্রেও কমিউনিটির বাইরের মানুষের সমর্থন ফলপ্রসূ হবে। আমরা আমেরিকায় থাকি। আত্মীয়স্বজন-কমিউনিটি তো আছেই। তারা থাকবেন। সেই সঙ্গে নেইবারহুডও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে হবে। কথাবার্তা, ওঠা-বসা, সামাজিকতা বাড়িয়ে আমাদের দূরত্ব ঘোচাতে পারলে আমাদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাবে। নির্বাচনেও আমাদের সমর্থন এবং ভোট বাড়বে। এছাড়া বিপদে-আপদেও উপকারে আসবে। এ দেশে বসবাস করে এ দেশের কাউকেই এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তাহলে নিজেকে এ দেশের একজন বলে দাবি করা যাবে না শতভাগ অর্থে।
এ দেশের মানুষের সঙ্গে অর্থনীতি-রাজনীতি, সামাজিকতা-সংস্কৃতিতে সমভাবে অংশ নিতে হবে। এ দেশের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল অনুসরণ করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে এ দেশেরই অংশ হয়ে যেতে হবে।
আমাদের বাঙালি প্রার্থীদের নিয়ে অনেকের এ রকম মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে যে ‘নির্বাচনে তারা প্রার্থী হয়েছেন, এটাই যেন বড় কথা। প্রচার পেল, পরিচিতি, গুরুত্ব বাড়ল, মূলস্রোতে রাজনীতি করি’-এই অহংকার করার দাবি পোক্ত হলো, আর কী চাই!’ না, এটাই যথেষ্ট নয়, এটাই বড় কথা নয়। কমিউনিটি আরো অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখে। তারা বাঙালিদের বিজয় দেখতে চায়। তাই একজন প্রার্থীর দাঁড়ানো থেকে প্রচারণা-সবকিছুর মধ্যে তার বিজয়ের প্রত্যয় প্রকাশ পেতে হবে।
নির্বাচন শুধু নয়, যেকোনো প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হার-জিত থাকে। এ দেশেও অভিবাসী প্রার্থীরা একসময় হারতে হারতেই জয় পেয়েছেন। অনেকে আবার অনেকবার জিতেও কোনো বার হেরে গেছেন। আসলে জেতার জেদ নিয়ে এবং কলাকৌশল অবলম্বন করে লড়াই করতে হবে। তারপর ফল যা হওয়ার তা হবে।
এবার আমাদের বাঙালি প্রার্থীরা যদি হারেনও, তবু আমরা আশাবাদী। ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’প্রবাদ ঠিক আছে। তবে বিজয় অর্জনের জন্য সঠিক পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। বারবার একই ধারায় পরাজিত হয়ে কমিউনিটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেকটা পথ যেতে হবে।
আগামীতে কমিউনিটি বাঙালি প্রার্থীদের বিজয়ের স্বপ্ন দেখে।