মৃত্যুর ৬ মাস পর জানা গেল পরিচয়!

নিউজার্সির কবরস্থানে অন্তিম শয়নে ছয়মাস হিমঘরে পড়ে থাকা গোলাম মাহমুদ।

ঠিকানা রিপোর্ট : নিউইয়র্ক সিটিতে ছয় মাস আগে মারা যাওয়া বাংলাদেশি গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের (৫৫) পরিবারের খোঁজ পরিচয় মিলেছে। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরায়। ২০২২ সালের ১৪ জুলাই ব্রুকলিনের লিটল নাসাউ স্ট্রিটের একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পুলিশ তার মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল।
দীর্ঘ ছয় মাস পুলিশ গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের আত্মীয়-পরিজনকে খুঁজে পায়নি। ফলে তার মৃতদেহ রাখা ছিল হিমাঘারে। অবশেষ পরিবারের সদস্য হিসাবে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের বোনকে পাওয়া গেছে। তার বোনের খোঁজ পাওয়ার পর লাশ দাফন করা হয়েছে গত ১৫ জানুয়ারি রোববার নিউজার্সির মালবরো মুসলিম কবরস্থানে।
পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের দুই ভাই ও এক বোন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না। ছেলে-মেয়ে মায়ের সঙ্গেই বাংলাদেশে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর একা ছিলেন গোলাম কিবরিয়া মাহমুদ। পরে কিছুদিন ব্রঙ্কসে বোনের বাসায় ছিলেন। সেখানে বনিবনা না হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয় তার। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। কিন্তু ভাই-বোনের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৪ জুলাই লাশ উদ্ধার করলেও পুলিশের ধারণা আরো ৪-৫ দিন আগে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদ মারা গিয়েছিলেন। তিনি যে বাংলাদেশি ছিলেন তা নিশ্চিত হয়েছিল নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু স্বজনদের খোঁজ না পাওয়ায় লাশের কোনো সুরাহা হচ্ছিল না। পরিবার-স্বজনদের পরিচয় জানতে সিটির পক্ষ থেকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে খোঁজ নেওয়া হয়। কনস্যুলেট মৃত গোলাম কিবরিয়ার স্বজনদের পরিচয় জানতে ব্রুকলিনে বসবাসরত সিনিয়র সাংবাদিক সোহেল মাহমুদসহ বেশ কয়েকজনের সহায়তা চায়।

গোলাম মাহমুদ কিবরিয়ার পাসপোর্টের ছবি

এদিকে সাংবাদিক সোহেল মাহমুদ নানাভাবে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালান। তিনি প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়টি তুলে ধরতেন। অবশেষে কানাডা ও নিউইয়র্কের বাফেলো’র দুটি সূত্র থেকে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের বোনের খোঁজ পান সোহেল মাহমুদ। তাকে এ কাজে সহায়তা করেন মানবাধিকার কর্মী কাজী ফৌজিয়া।
স্বপ্নের আমেরিকা! হায় আমেরিকা!
সাংবাদিক সোহেল মাহমুদ তার ফেসবুকে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদকে নিয়ে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন। এটি পোস্ট এখানে তুলে ধরা হলো- ৬ মাস ধরে একটা মানুষ হিমঘরে পড়ে ছিলো। ছয়টা মাস! মানবতার ফেরিওয়ালা, গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী আমেরিকায় এ চিত্র। কেউ হয়তো বলবেন, এটা সাধারণ ঘটনা নয়। মানে, সাধারণত এমন ঘটনা ঘটে না আমেরিকায়। হয়তো ঘটে না। কিন্তু, এই একটা ঘটনায় কী দেখলাম? এটা কি অবহেলা নয়?
গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের মরদেহ পাওয়া যায় ১৪ জুলাই ২০২২ খৃস্টাব্দে। ঠিক ৬ মাস আগে। ধারণা করা হয়, এর কয়েকদিন আগে তার মৃত্যু হয়। নিজের বাসায়। এককক্ষের সে বাসায় তিনি একা থাকছিলেন। এবং, সেটি ছিলো সিটির একটা আশ্রয়কেন্দ্র।
গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের মরদেহ ৬ মাস ধরে সিটির হিমঘরে কেনো ছিলো? একজন মার্কিন নাগরিক হবার পরও কি তার পরিচয়-বৃত্তান্ত খুঁজে বের করা সিটির জন্য কঠিন কোন কাজ ছিলো? যে আশ্রয়কেন্দ্রে গোলাম কিবরিয়া মাহমুদ ছিলেন, সেটির ম্যানেজার জানিয়েছেন, ৩ মাস পর্যন্ত তার ব্যবহারের জিনিসপত্র আর সাথে কিছু ডকুমেন্ট তারা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। এরপর সেগুলো ধংস করে ফেলা হয়। সেখানে সবুজ রঙের একটা পাসপোর্টও ছিলো বলে জানায় আশ্রয়কেন্দ্রের ক্লিনার। এর মানে, গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের পরিচয় বের করার মতো তথ্য আশ্রয়কেন্দ্রেই ছিলো। সিটির চিকিৎসা বিভাগ কিংবা পুলিশ বিভাগ সেগুলো কি সংগ্রহে নেয়নি? নিলে তারা গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের পরিচয় উদ্ধারে কিংবা তার পরিবার পরিজনকে খুঁজে পেতে চেষ্টায় ৬ মাস ব্যয় করলো কেনো?
নিউইয়র্ক সিটিতে এর আগে দুই বাঙালি তরুণের পরিচয় উদ্ধারে কাজ করেছিলাম। এর একজন ৬-৭ দিন ধরে হাসপাতালে অজ্ঞাতনামা হিসেবে পড়েছিলেন। আরেকজন ১৩ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন, তাকে পরে পাওয়া গেছে হাসপাতালে। তাদের পরিচয় উদ্ধারেও পুলিশের কর্মতৎপরতা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলো। সেই তরুণদ্বয়ের পরিচয় উদ্ধারে যতগুলো যোগসূত্র মিলেছিলো, গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের বেলায় এর চেয়ে বহু ভালো অবস্থা ছিলো। তার গ্রিনকার্ডের ফটোকপি ছিলো। সবুজ একটা পাসপোর্ট ছিলো, সোশাল সিকিউরিটি কার্ড ছিলো। একটা সচল মোবাইল ফোন ছিলো। ছবি ছিলো। এতোকিছুর পরও আমেরিকার মতো দেশে একটা মানুষের পরিচিতি পেতে ৬ মাস লেগে গেলো নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষের? তাও, সেটি তাদের দ্বারা নয়।
সিটি কর্তৃপক্ষ যে কাজ ৬ মাসে করতে পারেনি, মাত্র কয়েকঘন্টায় সেটা করে দেখিয়েছি আমরা। আমরা মানে জনগণ। কর্তৃপক্ষ নয়। কর্তৃপক্ষ তাহলে কী করেছে? ওনারা হিমঘরের জায়গা খালি করেছে। রুটিন ওয়ার্ক। নাগরিকের সেবায় মত্ত হয়নি তারা।
গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের বাংলাদেশি পরিচয়টা জানতো সিটি। আরো আরো তথ্য ছিলো তাদের কাছে। সেটা বোঝা গেছে সিটির চিফ মেডিকেল এক্সামিনারের ইমেইল দেখে। তিনি নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে যে ইমেইলটি পাঠিয়েছেন, তাতে কিছু তথ্য দেয়া ছিল। আচ্ছা, এই ইমেইল দিতে তাদের ৬ মাস লাগলো কেনো? হিমঘরের জায়গা খালি করা, তাইনা? মানবিকতা কিংবা কর্তব্য নয়।
গাড়ির ধাক্কায় আহত যে ছেলেটি হাসপাতালে অজ্ঞাতনামা হয়ে পড়েছিলেন, তার পরিচয় উদ্ধারে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ছিলো। আন্তঃবিভাগীয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার ত্রুটি সামনে এসেছে। তখন ছেলেটির পরিবারকে বলেছিলাম এ গাফিলতির বিচার চাওয়ার জন্য। তারা মামলা করেনি। প্রতিকার চায়নি। সেটা নাকি ভীতির কারণে। কার প্রতি ভীতি?
গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের পরিচয় উদ্ধারে মাঠে ছিলাম আমি। পুরো অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছে, এই অবহেলার অবসান হওয়া উচিত। গোলাম কিবরিয়া মাহমুদের পরিবারের উচিত হবে প্রতিকার চাওয়া। সেজন্য যদি কারোর বিরুদ্ধে আদালত যেতে হয়, যাওয়া উচিত।