মেট্রোরেল যুগে বাংলাদেশ

ঠিকানা অনলাইন : বাংলাদেশে চালু হচ্ছে প্রথম মেট্রোরেল। ১৬ কোটি মানুষের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পরিণত হচ্ছে বাস্তবে। এতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। ২৮ ডিসেম্বর (বুধবার) উদ্বোধন হতে যাচ্ছে মেট্রোরেল। এর মধ্যদিয়েই বিশ্বের বুকে আরেকটি ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উন্নত দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেট্রোরেলের যুগে এখন বাংলাদেশ। স্বপ্নের এই মেট্রোরেল দ্রুতগতিতে ছুটবে রাজধানীর বুকে। নগরবাসী স্বল্পসময়ে পৌঁছাবেন ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

মেট্রোরেল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় বেলা ১১টার দিকে উদ্বোধন করে মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রীও হবেন তিনি।

আগামীকাল থেকে চড়বেন নগরবাসী। প্রথম পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে উত্তরা উত্তর ডিপো পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারবেন যাত্রীরা।

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, উদ্বোধনের পর সবুজ পতাকা দুলিয়ে মেট্রোরেলের যাত্রা সূচনা করবেন সরকার প্রধান। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের আদলে মেট্রোরেল উদ্বোধনের দিনও একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে সেই অনুষ্ঠানে মেট্রোরেলের ফলকের একটি প্রতিরূপ উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

২৭ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, বুধবার বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে পায়রা অবমুক্তকরণ ও ফায়ারওয়ার্কসের পরিকল্পনা থাকলেও সেটা বাদ দেয়া হয়েছে। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে মোনাজাত হবে। সুধী সমাবেশ শুরু হবে ১১টা ২৫ মিনিটে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমসিটিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন ছিদ্দিকের সঞ্চালনায় সেখানে কয়েকজন বক্তব্য দেবেন। ১২টা ২৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেবেন। এরপর এরিয়াল ভিউ প্রদর্শনী হবে। থিমসং পরিবেশন হবে। সুধী সমাবেশে বক্তব্য শেষে উত্তরা উত্তর স্টেশন পরিদর্শন করবেন শেখ হাসিনা। মূল ফলক পরিদর্শন করে ফলকের পাশে একটি তেঁতুল গাছের চারা রোপণ করবেন। এরপর সেখান থেকে প্ল্যাটফরমে উঠে টিকিট মেশিন ব্যবহার করে টিকিট কিনবেন সরকারপ্রধান। সেখানে তাকে মেট্রোরেল ও প্ল্যাটফরমগুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়া হবে। প্ল্যাটফরমে প্রধানমন্ত্রী সবুজ পতাকা নেড়ে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের চলাচলের শুভ সূচনা করবেন। স্মারক হিসেবে সবুজ পতাকায় স্বাক্ষর করবেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তার জন্য সংরক্ষিত কোচের দরজায় ফিতা কেটে ট্রেনে উঠবেন। ট্রেনে তিনি আমন্ত্রিত অতিথির সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন। তারপর আগারগাঁও স্টেশনে নেমে প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকে গণভবনে ফিরবেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬ এর প্রথম অংশ উদ্বোধন করবেন। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল অংশের কাজ শেষ করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন করা হবে। আর ২০২৫ সালে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেলের পুরো পথ উন্মুক্ত হবে। নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী মেট্রোরেল উচ্চবিত্তের যানবাহনে পরিণত হলো কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন যে অবস্থা ঢাকা শহরের; উত্তরা থেকে কমলাপুরের ভাড়া ১০০ টাকা। ৩৮ মিনিটে আসবেন। তাহলে কোথায় লস হলো। ভাড়া একটা বিষয়, এটা কোনোদিনই জেনারেলি একসেপ্টেবল হয় না, কোথাও না। কিন্তু বাস্তবে সবাই একসেপ্ট করে।

শিক্ষার্থীদের হাফ পাস থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমটিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক জানিয়েছেন, মেট্রোরেলে বাসের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া থাকছে না। তবে যারা এমআরটি পাস ব্যবহার করবেন, তারা ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। তিনি বলেন, অভিভাবকদের সঙ্গে তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত কোনো শিশু মেট্রোরেলে চলাচল করতে চাইলে ওই শিশুর টিকিট লাগবে না। মেট্রোরেলে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বিনা ভাড়ায় দেশের প্রথম এ মেট্রোরেলে চলাচল করতে পারবেন। মেট্রোরেলের ভাড়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিল আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এটা একটা বৈদ্যুতিক ট্রেন। যে দেশের সঙ্গে তুলনা করবেন, দেখতে হবে সে দেশে বিদ্যুৎ রেন্ট কতো। যে ভাড়াটা নির্ধারণ করা হয়েছে তা একদম সর্বনিম্ন ভাড়া। এই ভাড়া দিয়ে মেট্রোরেল লাভজনকভাবে পরিচালনা করা যাবে না। সেজন্য আমরা স্টেশন প্লাজা নির্মাণ করছি। সেখান থেকে ননফেয়ার ভাড়া দিয়ে বাকিটা যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম ভাড়া নির্ধারণ করা হলো সেটা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। অত্যাধুনিক মেট্রোরেল যেখানে হয়েছে, সবখানে এটা অনুসরণ করা হয়েছে।

এখন উত্তরা-আগারগাঁও ছাড়া যেসব স্টেশন চালু করা হচ্ছে না, সেগুলো কবে চালু হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে এন এম সিদ্দিক বলেন, প্রত্যেকটা স্টেশন প্রস্তুত আছে। এখানে কোনো তাড়াহুড়ার বিষয় নেই। আমরা একাধিকবার বলেছি। মানুষের অভ্যস্ততা হলো বড় বিষয়। মানুষের অভ্যস্ততার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য আমরা এটা করেছি। সরাসরি চললে উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত সময় লাগবে ১০ মিনিট ১০ সেকেন্ড। তিন মাস পরে ২৬শে মার্চ সবগুলো স্টেশনে ট্রেন থেমে যাবে এবং আস্তে আস্তে মানুষ যখন অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন ট্রেনের সংখ্যাগুলো বাড়বে। যাত্রীরা যাতে মেট্রোরেলের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়, সেজন্য শুরুর দিকে ২০০ জন করে যাত্রী নিয়ে চলবে ট্রেন। স্টেশনে ১০ মিনিট থেমে যাত্রী ওঠানামার কাজ করা হবে। যাত্রীরা অভ্যস্ত হতে থাকলে ক্রমান্বয়ে মাঝপথের স্টেশনগুলো থেকেও যাত্রী উঠানো শুরু হবে। আশা করছি মার্চের মধ্যে পরিপূর্ণ যাত্রী নিয়ে পুরোদমে চালাতে পারবো আমরা।

মেট্রোরেলের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। কাল থেকে মেট্রোরেল চালু হচ্ছে উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত। এই অংশের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা। এর মাঝে মেট্রোরেলের আরও সাতটি স্টেশন রয়েছে। পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ট্রেন চলবে উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত। তখন ওই দূরত্বের ভাড়া হবে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। তবে এমআরটি পাসে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন যাত্রীরা। প্রথমদিকে একাধিকবার ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করা এমআরটি পাস সংগ্রহ করতে হবে স্টেশনের টিকিট কাউন্টার থেকে। একটি পাসে প্রতিবার শুধুমাত্র একজন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন কিংবা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে আবেদন করে নিতে হবে এমআরটি পাস। এমআরটি পাসের জন্য শুরুতে মোট ৪০০ টাকা জমা করতে হবে। এরমধ্যে ২০০ টাকা জামানত (ফেরতযোগ্য) এবং ২০০ টাকা ভাড়া।

মেট্রোরেলের ব্যয়: মেট্রোরেল প্রকল্পের পিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের জুলাইয়ে অনুমোদিত উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল অর্থাৎ ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-৬ (এমআরটি-৬) নির্মাণ প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি সাত লাখ টাকা। তবে এই ব্যয় বেড়ে এখন ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ বা ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন করে মেট্রোরেলের নির্মাণব্যয় বাড়ছে ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাবে সরকারের পক্ষ থেকে ১৩ হাজার ৭৯৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা দেয়া হবে। আর জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ দেবে ১৯ হাজার ৬৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এদিকে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এক দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত করতে গিয়ে পূর্ত কাজে ৭১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, বৈদ্যুতিক ও মেকানিক্যাল ব্যবস্থা (ই অ্যান্ড এম) স্থাপনে ৩২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ) খাতে ৫০ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় বাড়বে। অর্থাৎ বর্ধিত অংশের জন্য ব্যয় বাড়ছে মোট এক হাজার ৮৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

যাত্রীরা যেভাবে উঠবেন মেট্রোরেলে: মেট্রোরেলের শুরুর স্টেশন হবে উত্তরার দিয়াবাড়ি। তিনতলা স্টেশন ভবনের উপরের তলার প্ল্যাটফরম থেকে যাত্রীরা ট্রেনে উঠবেন। এজন্য এস্কেলেটর দিয়ে স্টেশনের দ্বিতীয়তলায় কনকোর্স হলে প্রবেশ করতে হবে যাত্রীদের। প্রতিবন্ধী কিংবা বয়স্ক মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে। কনকোর্স হলে প্রবেশ করলে ডিজিটাল টিকিট কাউন্টারের মাধ্যমে মেশিনে টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করবেন যাত্রীরা। এ ছাড়া টপআপ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও টিকিট কাটার ব্যবস্থা রয়েছে। ডিজিটাল এসব পদ্ধতি ছাড়াও ম্যানুয়াল কাউন্টারের সুবিধাও রয়েছে স্টেশনে। প্ল্যাটফরমে ওঠার প্রবেশ পথে টিকিট পাঞ্চ করে যাত্রীরা দোতলা থেকে নির্ধারিত এস্কেলেটর বা সিঁড়ি দিয়ে মেট্রোরেলের প্ল্যাটফরমে যাবেন। প্ল্যাটফরমে ট্রেন এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে যাবে। এরপর ট্রেনে থাকা যাত্রীরা নামার পর উঠার সুযোগ পাবেন অন্য যাত্রীরা।

সড়কে মিরপুরবাসীর ভোগান্তি দূর: ২০১৭ সালে রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই দুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হয় মিরপুর এলাকা। সড়কের সংকীর্ণতা, অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, ধুলাবালি, যানজটে অতিষ্ঠ ছিল মানুষ। বিশেষ করে নির্মাণকাজের জন্য সড়কে রাখা সামগ্রী ও ট্রাফিক ব্যারিয়ারের কারণে সড়কের ৩০-৪০ শতাংশ বন্ধ থাকতো। চলাচল করতে হতো সরু সড়কে। তবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়ায় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত এসব সামগ্রী ও ট্রাফিক ব্যারিয়ার সরানো হয়েছে। এতে ভোগান্তি দূর হয়েছে আগারগাঁও, তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, মিরপুর ১০-১২ এসব এলাকার বাসিন্দাদের। এখন মেট্রোরেলের নিচের সড়কগুলো ব্যবহার করেও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন।

ঠিকানা/এসআর