শ্রদ্ধা : বারী সিদ্দিকী বিরতিহীন যাত্রার সমাপ্তি

শিল্পী বারী সিদ্দিকী তাঁর জীবনের বিরতিহীন যাত্রার সমাপ্তি করেছেন। তিনি দেহকে বিলোপ করে অবিনস্বর আত্মাকে নিয়ে গেছেন ঊর্ধ্বগগনে। প্রেমের অমৃত আর বিচ্ছেদের হলাহল পান করার বাইরে চিরকাল বিরাজ করবেন অদৃশ্য জগতে। বারী সিদ্দিকী আর আমার বন্ধুত্ব দুই যুগের। ভেবেছিলাম এ বন্ধুত্ব জ্বলবে চিরদিনের তারার মতো। কিন্তু কোনো বার্তা না দিয়েই বারী সিদ্দিকী না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় আমাদের বন্ধুত্বে আপত্কালীন ছেদ ঘটেছে।

বন্ধুত্বের শুরুতেই বংশীবাদক বারী সিদ্দিকীর মাঝে আমি অফুরন্ত সুরের আগ্নেয়গিরি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলাম, বারী সিদ্দিকী হচ্ছেন সেই তিরন্দাজ, যিনি দেখতে পান তাঁর লক্ষ্যবস্তু। যিনি আপন হৃদয় উন্মোচনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যিনি সর্বান্তকরণে সংগীতের দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। আমি প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছিলাম বারী সিদ্দিকীর ভেতর ঐশ্বরিক সুরের নীল শিখা, যা প্রতিনিয়ত তাকে ধাবিত করছে। আড্ডা, অবসর—সবকিছুতেই বারী সিদ্দিকী যে সুরের অদৃশ্য সম্পদ বহন করে যাচ্ছেন, তাঁর আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। মনে হলো দুঃখ-বেদনা বিচ্ছেদ সব যেন আত্মসাৎ করে নিয়েছেন। তাই আমার গানের জগৎ নির্বিচারে বারী সিদ্দিকীর হাতে তুলে দিই। একক অ্যালবাম, মিক্সড অ্যালবাম, সিনেমা ও নাটকের গান—সব মিলিয়ে আমার লেখা প্রায় ৮০টি গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। আর তাঁর গানসহ সর্বমোট আমার ১০০ গানে সুরারোপ করেছেন।

বারী সিদ্দিকী খুব খোলা মনে জীবনটা দেখতে পারতেন। হৃদয়ের প্রেম প্রকাশে আন্তরিক, প্রার্থনায় আস্থাবান, বিশ্বাসে অটুট, প্রেমের তৃষ্ণায় পিপাসার্ত, রহস্যের প্রশ্নে কৌতূহলী। বারী সিদ্দিকী তাঁর নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তিনি তাঁর সুর ও কণ্ঠ দিয়ে বাংলা গানে নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করেছেন—মানুষের হৃদয়ের গভীর তলদেশ স্পর্শ করেছেন। আবেগের উচ্চতায় মানুষের চরিত্রে মাহাত্ম্য নির্মাণে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অনুভূতির তীব্রতা-প্রগাঢ় জীবনবোধ আগাগোড়া চৈতন্যে নির্ভরতা, ভাবের ভাবুকতা তার স্বাতন্ত্র্যকে উদ্ভাসিত করেছে।

গানের সুর ও ছন্দ নির্মাণে বারী সিদ্দিকীর মুনশিয়ানা, শব্দের অনুভবী চেতনার প্রয়োজনে ছান্দিক ভঙ্গি-সুরের শৃঙ্খল, শৈল্পিক বিন্যাস, তাল ও লয় ভাঙার পারদর্শিতা এবং গানের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাণী নির্বাচনে দক্ষতা তাঁকে গানের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সংগীতের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থেকে একচুল না নড়েও অনাবিষ্কৃত সুরের জাল বোনে কী এক অসাধারণ প্রকাশভঙ্গি দিয়ে বাঙালির হৃদয়কে দখল করে নিয়েছেন বারী সিদ্দিকী। আর এসব কারণেই আমি উন্মোচিত করতে পেরেছি অনেক বিরহী গানের সরণি।

ফোকের প্রবহমান সুরের সঙ্গে ক্লাসিক্যালের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বারী সিদ্দিকী যে নতুন ধারার সৃজন করেছেন, ভিন্ন ধারার প্রবর্তন করেছেন, তিনিই তাঁর পথপ্রদর্শক। তিনি সংগীত আত্মস্থ করেছেন রোগ-শয্যা-যন্ত্রণা কোনো কিছুই তাঁর উত্কর্ষকে ম্রিয়মাণ করতে পারেনি।

গান নির্মাণের প্রয়োজনে একদিন আড্ডা দিচ্ছি দুজন। হঠাৎ বারী ভাই বললেন, একটি গান লেখেন চিরকালের জায়গা নিয়ে। আমি জানতে চাইলাম, কোন বিষয়টা প্রাধান্য দেব। বারী ভাই বললেন, ছোট্ট একটি মাটির ঘর। আমিও দ্রুত মনোনিবেশ করলাম। লিখে দিলাম, ‘ছোট্ট একটি মাটির ঘর কেউ আসে না নিতে খবর, আমার কাছে আমিই প্রতিবেশী—পাই যে শুধু মাটিরই আদর’। বারী ভাই আনন্দিত, সুর করার সময় যা সচরাচর দেখা যায় না। আমি জানতে চাইলাম, কী হলো? তিনি বললেন, আমার কাছে আমিই প্রতিবেশী, এটা একটা বিস্ময়কর অনুভূতি—ভালো লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ইন্দ্রিয়ের তন্দ্রে তন্দ্রে যে সুরলহরী খেলা করেছিল, তা সুরে প্রকাশ করল। এভাবে আমাদের অসংখ্য গান নির্মাণ হয়েছে। আমার গানে তাঁর সুর আমার মননে মুগ্ধতা-পবিত্রতা আর বিশুদ্ধ ভালোবাসা বিস্তার করে দিয়েছে।

‘আমার মন্দ স্বভাব জেনেও তুমি কেন চাইলে আমারে’—এ গান লেখার পর কৈফিয়ত দাবি করলেও সে গানে সুর করার পর দেখেছি ভাবাবেগে গভীরভাবে আলোড়িত হতে। অনুতাপের ভয়ংকর অগ্নি, মানবজাতির পাপের প্রতি ভয়ানক সতর্কীকরণ, বেদনার হাহাকার, পবিত্রতার আলো দিয়ে আত্মাকে পরিশোধন করার তাগিদ সৃষ্টিই ছিল আমাদের গানের লক্ষ্য।

বারী ভাই মাটির নিচে চিরকালের জন্য গভীর নৈঃশব্দ্যে সমাহিত। এ সুযোগ আমারও ঘটবে বারী ভাই, আর বেশি দেরি হওয়ারও নয়। দুজনই চিরনিদ্রায় শায়িত থাকব। আবার দুজন মুখোমুখি হব—আবার দেখা হবে।