মেসিদের অপ্রত্যাশিত হারে স্তব্ধ ফুটবল বিশ্ব

ড্রয়ে শুরু যুক্তরাষ্ট্রের, ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের বড় জয়, লেভানডফস্কির পেনাল্টি মিস

স্পোর্টস রিপোর্টার : আরব্য রজনীর নতুন রূপকথা লিখে ফেলল ‘আন্ডারডগ’ সৌদি আরব। লুসাইল স্টেডিয়ামে ২২ নভেম্বর মঙ্গলবার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অঘটনের শিকার হলো লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। শুরুতে এগিয়ে গিয়েও তারা সৌদি আরবের কাছে হার মেনেছে ২-১ গোলে, যা একেবারে অপ্রত্যাশিত। এমন একটি ফল হবে কেউ কল্পনাও করেনি। লুসাইল স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার পর নিস্তব্ধ গোটা আর্জেন্টিনা, উৎসবে মেতে ওঠে সৌদি আরব। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তৃতীয় আর্জেন্টিনা হেরে গেছে র‌্যাঙ্কিংয়ে ৫১তম সৌদি আরবের বিপক্ষে। আর্জেন্টিনা যেখানে বিশ্বকাপ মানেই ফেবারিট, আর স্কালোনির এই আর্জেন্টিনা অপরাজিত ছিল টানা ৩৬ ম্যাচ, অথচ এই দলটাই কিনা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা সৌদির কাছে হারল। তাও এমন একটি দল, যারা আগের চারবার বিশ্বকাপ খেলে মাত্র একবার দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে, সেটাও ২৮ বছর আগে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে।
১৯৯০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার হিসেবে নেমেছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেবার ক্যামেরুনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেই হারের ধাক্কা সামলে একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় লা আলবিসেলেস্তারা। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে হারতে হয়, যে ম্যাচকে অনেকেই মনে করেন জোর করে হারানো হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। সেবারই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারে আর্জেন্টিনা। গতবার তারা প্রথম ম্যাচে ড্র করেছিল আইসল্যান্ডের বিপক্ষে। এবার আবার হারতে হলো নীল-সাদা জার্সিধারীদের। মেসিরা কি এবার প্রয়াত ম্যারাডোনার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবেন? সৌদি আবরের বিপক্ষে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের রূপেই দেখা গিয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে মেসিদের দেখা গেল সৌদি আরবের আক্রমণ ঠেকাতেই ব্যস্ত। ৪৮-৫৩ এই ৫ মিনিটের আরব-ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় আর্জেন্টিনার ডিফেন্স। এই দুটি আক্রমণ থেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটনের দুটি গোল হজম করে লা আলবিসেলেস্তারা। দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরবের খেলা বিশ্ববাসীর মন জয় করে নিয়েছে। মনে হচ্ছিল, সৌদি আরব আর্জেন্টাইনদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে আর আর্জেন্টিনা হয়ে গেছে সৌদি আরব। তবু শেষ দিকে প্রায় ১০ মিনিট এবং অতিরিক্ত (ইনজুরি টাইম) আরো ১০ মিনিট এককভাবে খেলেছে আর্জেন্টিনা। চেষ্টা ছিল একটি গোল অন্তত বের করে আনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের। সৌদি আরবের ডিফেন্স এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মেসিদের একের পর এক চেষ্টা বিফলে চলে যায়। এমনকি শেষ মুহূর্তে (ইনজুরি টাইমে) আর্জেন্টিনার নিশ্চিত একটি গোল লাইনে দাঁড়িয়ে হেড করে ফিরিয়ে দেন সৌদির এক ডিফেন্ডার।
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাদের ডিফেন্সের মারাত্মক ভুলে গোল হজম করে বসে লিওনেল মেসির দল। ৪৮তম মিনিটে বাঁ-পায়ের দুর্দান্ত এক শটে লা আলবিসেলেস্তেদের জালে বল জড়ান সৌদি আরবের সালেহ আল সেহরি। ৫৩তম মিনিটে আবারো গোল। এবার সৌদি আরবের ১০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড় সালেম আল দাওসারি রদ্রিগো ডি পল এবং নিকোলাস ওতামেন্দিকে কাটিয়ে ডান পায়ের দুর্দান্ত এক শটে বল জড়ান আর্জেন্টিনার জালে। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে হার্ভ রেনার্ডের শিষ্যরা। দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করতে হলে ২৬ নভেম্বর মেক্সিকো এবং ৩০ নভেম্বর পোল্যান্ডকে হারাতে হবে মেসি-ডি মারিয়াদের। অন্যদিকে ফলাফল অন্য রকম হলে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
এর আগে ২০ নভেম্বর রোববার মরুর বুকে পর্দা উঠল ফুটবল বিশ্বকাপের ২২তম আসরের। নাচ-গান আর নানান দেশের তারকাদের মন মাতানো পারফরম্যান্সে মাতল কাতারের খোর শহরের আল বায়াত স্টেডিয়াম। তারকারদের পারফর্মের কিছুক্ষণ পরই বাজল বিশ্বকাপের বাঁশি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক কাতারের মুখোমুখি হয় লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর। দুই দেশের লড়াই দিয়ে শুরু হয় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপের নতুন আসর। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপ মঞ্চস্থ করার ইতিহাসে পা রাখে কাতার। তবে উদ্বোধনী ম্যাচটি স্মরণীয় করে রাখতে পারল না স্বাগতিকরা। কাতারকে ২-০ গোলে হারায় লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর। ইকুয়েডরের পক্ষে দুটি গোলই করেন অধিনায়ক এনের ভ্যালেন্সিয়া।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দিনে ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় তিনটি ম্যাচ। দিনের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ইংল্যান্ড ৬-২ গোলে হারায় ইরানকে। ইংলিশদের হয়ে জোড়া গোল করেন সাকা। একবার করে জালের দেখা পেয়েছেন বিলিংহ্যাম, রাহিম স্টার্লিং, জ্যাক গ্রিলিশ ও মার্কোস র‍্যাশফোর্ড। ইরানের হয়ে গোল দুটি করেন মেহেদি। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে ২০১৮ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই না করার চার বছর পর বিশ্বকাপে জয় দিয়ে ফিরেছে নেদারল্যান্ডস। কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সেনেগালকে ২-০ গোলে হারিয়েছে ডাচরা। দলের হয়ে গোল করেছেন কোডি গেকপো ও ডেভি ক্লাসেন। দুটি গোলই আসে দ্বিতীয়ার্ধে। একই দিন ‘বি’ গ্রুপের তৃতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েলস। এই ম্যাচ দিয়ে দীর্ঘ ৬৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রত্যাবর্তন হলো ওয়েলসের। খেলার প্রথমার্ধের পুরোটা জুড়েই আধিপত্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে দেন লাইবেরিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার জর্জ উইয়াহর ছেলে টিমোথি উইয়াহ, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বকাপে তার প্রথম গোল। বাকি সময়ে কোনো দলই আর গোল না পেলে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে এসে দেখা মিলল ভিন্ন এক ওয়েলসের। ম্যাচে ফিরতে মরিয়া চেষ্টা চালায় ইউরোপের এই দলটি। একের পর এক আক্রমণ করে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের রক্ষণে। খেলার ৮২ মিনিটে আসে নাটকীয়তা। গ্যারেথ বেলকে ফাউলের কারণে পেনাল্টি পায় ওয়েলস। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নেমে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান বেল। নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হলে ১-১ গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে দুই দল।
২২ নভেম্বর মাঠে গড়ায় চারটি ম্যাচ। দিনটা শুরু হয়েছিল সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার পিলে চমকে যাওয়া দিয়ে। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে এবার ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের ডেনমার্ককে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিল তিউনিসিয়া। তৃতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয় মেক্সিকো ও পোল্যান্ড। মেক্সিকোর অনেক সুযোগ হাতছাড়ার মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার রসদ পেয়ে যায় পোল্যান্ড। প্রতিপক্ষের ফাউলের সুবাদে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সেই পেনাল্টির সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেন না দলের সেরা খেলোয়াড় রবার্ট লেভানডফস্কি। যার খেসারত দিতে হলো পুরো দলকে। জয়ের বদলে ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো পোলিশদের। দিনের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার জালে গোল উৎসব করল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। কাতার বিশ্বকাপের সেরা অঘটন সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শুরুতেই ৯ মিনিটে ফ্রান্সের গোল খাওয়া আরেকটি অঘটনের আভাস দিচ্ছিল। কিন্তু ফ্রান্স যে বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট, তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিল তারা। সকারুদের ৪-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা করল দিদিয়ের দেশমের দল। ফ্রান্সের হয়ে জোড়া গোল করেন জিরু; আর একটি করে গোল করেন এমবাপ্পে ও রাবিও। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন গুডউইন।