যাদের সাফল্যে আমরা উদ্ভাসিত

নতুন স্বপ্ন নিয়ে মানুষ নতুন বছরে পথচলা শুরু করেছে। স্বপ্নই মানুষের ভেতর তাড়না এবং উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা মানুষকে নিয়ত এগিয়ে নেয়। কিন্তু মানুষের চারপাশে যত না ইতিবাচক উদ্দীপক দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক উদ্দীপকের ছড়াছড়ি। আমরা নববর্ষকে যতই ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক..’ বলে স্বাগত জানাই না কেন, জীর্ণ পুরাতনই দেখা যায় আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে এবং মানুষের সামনে চলার পথ রুদ্ধ করে।
তারপরও পথের সব বাধা সরিয়ে কিছু মানুষ তাদের মেধা অঙ্গীকার এবং সাহসে ভর করে নিজেরা সামনে অগ্রসর হন এবং অন্যকেও অগ্রসর হতে প্রাণিত করেন, স্বপ্ন দেখান, সাহস জোগান। সমাজ, দেশ, সভ্যতা এভাবেই কিছু মানুষের হাত ধরে আজকের জাগায় পৌঁছেছে। আমরা প্রবাসে বসবাস করি। প্রবাস জীবনটাই চ্যালেঞ্জের জীবন। চারপাশটা প্রতিকূলতার কাঁটা দিয়ে ঘেরা। পদে পদে বাধা পাওয়া এবং হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা। তবু সবাই হোঁচট খান না। পথ হারান না। মেধায় শ্রমে উদ্ভাবন শক্তিতে এগিয়ে যান। মোক্ষ অর্জনে সফলকাম হন। এসব মেধাবী শক্তিমান সাহসী মানুষেরা দুর্গম পথ কেটে কেটে সামনে এগিয়ে যান এবং অন্যের জন্য মসৃণ পথ রেখে যান। যে পথ ধরে অন্যরাও এগিয়ে যেতে পারেন। তাদের অর্জিত সাফল্যের ফসল দেশ ও জাতির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ জীবনের বহুবিধ প্রয়োজন মেটায়, দেশকে সমৃদ্ধ করে এবং বিশ্ব সভায় মর্যাদার আসনে বসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আজকের এ সম্পাদকীয়তে কোনো হতাশার কথা নয়। সব সাফল্যের কথা। সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির কথা। প্রবাসে সেই সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে ডা. ইয়াসমীন, খান একাডেমি, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন। বাংলাদেশ মিশন ব্যতীত আর কেউই বাংলাদেশকে সামনে রেখে কাজ করেননি। তারপরও তাদের কর্ম ও সাফল্য আমাদের উজ্জীবিত এবং গর্বিত করে। ‘আমরাও পারি’ এ রকম প্রণোদনা জোগায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের।
এদের সাফল্যের দিকে একবার তাকানো যাক। প্রবাসীদের সামনে এই সাফল্য তুলে এনেছে ঠিকানা তার ৫ জানুয়ারি সংখ্যার শেষের পাতায় তিনটি পৃথক শিরোনামে। তিনটি সংবাদ পাশাপাশি সাজানো আছে। যে কারণে খুব সহজেই পাঠকের চোখে পড়ার কথা। এখানে সেভাবেই পরপর তিনটি খবর তুলে ধরা হচ্ছে। প্রথমটির শিরোনাম ‘জাতিসংঘে বিশেষ এক মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ।’ দ্বিতীয়টির শিরোনাম ‘খান একাডেমি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়’ এবং শেষটির শিরোনাম ‘ডা. ইয়াসমীনের অ্যাওয়ার্ড লাভ।’
‘জাতিসংঘে বিশেষ এক মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ’ শীর্ষক খবরটিতে বলা হয়েছে ‘গেল বছরে জাতিসংঘে বাংলাদেশ নিজের অবস্থানকে আরও সংহত’ করেছে। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত নবীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই মন্ত্রের এটা সাফল্য। এই সাফল্যের ফসলই হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আসন আজ এত মর্যদার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সফল কর্মকা-ের ফলেই জাতিসংঘে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের সফল শাখায় বাংলাদেশের নাম অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত এবং জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।
‘খান একাডেমি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়’ শিরোনামের সংবাদটিতে বলা হচ্ছে যে, ‘গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান মেধাবী ছাত্র সালমান খানের খান একাডেমির অললাইনে অঙ্ক শেখানোর পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী এমন এক প্রশংসিত স্থানে পৌঁছেছে যে তা আজ সর্বত্র সমাদৃত হচ্ছে এবং প্রবাসে ও স্বদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশের মানুষ গর্ব অনুভব করছে খান একাডেমির সাফল্যে। সালমান খানের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তবে তার পিতা ফখরুল আলম বাংলাদেশের বরিশালের আর মা মাসুদা খান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের। সালমান খানের অঙ্ক শেখানোর ভিডিও দেখেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীরা প্রায় ১২০ কোটি বার। ইতোমধ্যে তার ইউটিউব গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ লক্ষাধিক। বিশ্বব্যাপী সালমান খানের সাফল্য আর পরিচিতির পারদ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা অনুমান যেমন করা যায়, তেমনি বাংলাদেশি হিসেবে তা নিয়ে আমরা অহংকারও দেখাতে পারি।
খান একাডেমি প্রসঙ্গে এখানে আরেকটি প্রতিষ্ঠান নিয়েও আমরা কম গর্ববোধ করতে পারি না। দুটি প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যেও অনেক মিল রয়েছে। যে কারণে অনেকে মিশিয়ে ফেলে দুটিকে। সালমানের প্রতিষ্ঠান ‘খান একাডেমি’, অন্যটি খান’স টিউটোরিয়াল’। এটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত মরহুম ‘শিক্ষাবিদ ড. মনসুর খান। এখন পরিচালিত হচ্ছে তারই সুযোগ্য সহধর্মিণী নাঈমা খান এবং পুত্র ডা. ইভান খানের নেতৃত্বে। পাশাপাশি আরও আছে মামুনস টিউটোরিয়াল। এরাও নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের উপযুুক্তভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রভূত সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
ঠিকানায় প্রকাশিত আরেকটি সংবাদ হচ্ছে ‘ডা. ইয়াসমীনের অ্যাওয়ার্ড লাভ’। ডা. ইয়াসমীনও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। পিতা ডা. মোহাম্মদ আনোয়ার মিঞা এবং মাতা ডা. নাজমা মিয়া। মিস ইয়াসমীন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে কর্মরত আছেন। একই সঙ্গে ডা. ইয়াসমীন গরিবদের চিকিৎসাসেবা দানের লক্ষ্যে ইস্ট হারলেমে যৌথভাবে গড়ে তুলেছেন ইস্ট হারলেম হেলথ আউটরিচ পার্টনারশিপ। আর এই মহান সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার পুরস্কার হিসেবে লাভ করেছেন ‘হাউস কল এডুকেটর অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার। এটি আমেরিকা একাডেমি অব হোম কেয়ার মেডিসিনের ২০১৭ সালের সেরা পুরস্কার।
বাংলাদেশের মানুষের মেধা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। বাংলাদেশিদের মেধার স্বীকৃতি রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর সর্বত্র। ঘরকুনোর দুর্নাম বাঙালিরা বহু আগেই ঘুচিয়েছে বদ্ধঘরের অর্গল খুলে বিশ্বজয়ের নেশায় বিশ্বের সকল কোণে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ আজ যেখানে পৌঁছেছে, যে কারণে বাংলাদেশ বিশ্ব উন্নয়নের মডেলে পরিণত, তা মূলত দেশের কৃষক-শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষেরই কীর্তি। প্রবাসে আজ আমাদের যে অনেক অনায়াস জীবনযাপন, সে কীর্তিও আমাদের পূর্বসূরিদের। প্রবাসজীবনে এসে যে লড়াই সংগ্রাম তাদের করতে হয়েছে, তার ফসলই আজ আমরা ভোগ করছি। তাদের অর্জিত সাফল্য আমাদের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা মোকাবেলার পথকে সহজে করে দিয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিরা যে সময়ে যে পরিবেশে প্রবাসজীবন শুরু করেছেন, তা আজকের মতো এত সহজ এবং মসৃণ ছিল না।
তাই তো অনেক কিছু আমাদের হতাশাগ্রস্ত করে তুললেও অপ্রাপ্তির হাহাকারে ডোবালেও আমাদের সাফল্যও যে কম নয়, তা এই সম্পাদকীয় থেকে অনুভব করা যায়। তবে অবশ্যই এটুকুতেই আত্মতৃপ্তিতে ডুবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সামনে পথের শেষ নেই। আকাক্সক্ষারও শেষ নেই। সম্মিলিতভাবেই এগিয়ে যেতে হবে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে।
যারা আমাদের আকাক্সক্ষার ঝুলি ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় নিজেদের সব মেধাকে কাজে লাগিয়ে সাফল্য বয়ে আনছেন, তাদের অভিনন্দন। তারা আরও সফল হোক, আরও এগিয়ে থাক। আমরাও আরও উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হই। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, প্রবাস কমিউনিটি এবং ফেলে আসা স্বদেশের জন্য আমাদের সকলেরই অনেক দায়িত্ব।