যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একেবারেই দেউলিয়া

ঠিকানাকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী

সাঈদ-উর রব : কাইয়ুম চৌধুরী। কেউ বলেন সব্যসাচী চারুশিল্পী। কেউ বলেন শ্যামল বাংলার শিল্পাঙ্গনে এক জীবন্ত কিংবদন্তী। আমাদের শিল্পের অগ্রজ পতাকাবাহী। ফেনীতে জন্ম ১৯৩২ এ। ছোট বেলা থকে রং পেন্সিল নিয়ে আঁকা-ঝোকা। কখনো ে ট, কখনো খাতার পাতা অথবা কখনো ঘরের দেয়াল ছিল তার শৈশব-কৈশোরের ক্যানভাস। ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পরই আর্ট কলেজে। তারপর এই জগতেই স্থায়ী বসবাস। তার মননে মেধায়, তুলিতে-রঙে- সবকিছুইতেই বিশাল বাংলা। বাংলার প্রকৃতি এবং নিসর্গ তার শিল্পের প্রধান উপাদান। বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পের তিনি পথিকৃত। এক্ষেত্রে অনেকেই তাকে বলে থাকেন বাংলাদেশের সত্যজিৎ। সরকারি শিল্পকলা ইন্সটিটিউট যা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ফাইন আর্ট, সেখানে দীর্ঘ ৩৭ বছর অধ্যাপনা। তারপর প্রফেসর হিসেবে অবসর গ্রহণ সেও আজ ১২ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে। এখনও অবিরাম শিল্প সাধনায়। আজকের পরিচয় ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট।
১৯৫৪তে সরকারি ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে বিএফএ ডিগ্রী নেয়ার পর থেকেই তিনি শিল্পের জগতে চলমান। আঁকাআঁকির জীবনে স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসরকারি এওয়ার্ড একুশে পদক লাভ করেন ১৯৮৬ সালে। শেলটেক পদক পান ২০০০-এ, ১৯৯৯ সালে সুলতান পদক, ১৯৯৪তে ষষ্ঠ বঙ্গবন্ধু পদক, ১৯৮৩তে লিপজিগ বুক ফেয়ার পুরস্কার পান বইয়ের ইলাস্ট্রেশনের জন্য, ১৯৭৭ এ পান শিল্পকলা একাডেমী এওয়ার্ড, গ্রন্থ ডিজাইনে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের স্বর্ণপদক লাভ ১৯৭৫, কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটস এর সিলভার জুবিলী মেলা এওয়ার্ড ১৯৭৩, তেহরান বাইয়েনেল ইম্পেরিয়াল কোর্ট প্রাইজ ১৯৬৬, পাকিস্তানের লাহোরে জাতীয় আর্ট এক্সিবিশনে প্রথম পুরস্কার ১৯৬১ সালে, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদ ডিজাইনে প্রথম পুরস্কার ১৯৬৩, ৬৪, ৬৬, ৭০, ৭৫, ৭৮, ৭৯, ৮১, ৮২ এবং ৮৮ সালে। রেলওয়ে টাইম-টেবিল কভার ডিজাইনে ১৯৬০ এবং ১৯৯৫ সালে প্রথম পুরস্কার। এতকিছু প্রাপ্তির পরও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ভাষায়, তার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রাপ্তি হচ্ছে শিল্প-বোদ্ধা এবং বাংলাদেশের প্রগতিশীল শিল্পপ্রেমিক মানুষের ভালবাসা।
সম্প্রতি তিনি নিউইয়র্ক এসেছিলেন এশীয় সমকালীন শিল্প মেলায় যা ৬ থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় নিউইয়র্কের ৯২ পিয়ারে। সেখানে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয় ঠিকানার পাঠকদের জন্য। সাক্ষাৎকারে তিনি সমকালীন শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি এবং রাজনীতি-সমাজনীতি নিয়ে কথা বলেন। এখানে প্রশ্নোত্তরাকারে সেটা তুলে ধরা হলো।
ঠিকানা: কত দিন থেকে ছবি আঁকছেন? প্রথম আঁকেন কত বছর বয়সে?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমার ছবি আঁকার ইচ্ছা ছিলো একেবারে ছোট বেলা থেকেই। সেই সময় আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে গেলে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে আসতে হতো। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর বাবাকে বললাম আমি আর্ট স্কুলে ভর্তি হবো। আমরা তখন ময়মনসিংহে থাকতাম। বাবার চাকরির সূত্রে আমাদের ময়মনসিংহ থাকতে হয়েছে। আমি ময়মনসিংহ সিটি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছি। আমাদের বাড়ির পাশে ছিলো শিল্পী জয়নুল আবেদীনের বাসা। ১৯৪৮ এ প্রথম আর্ট স্কুল হল ঢাকায়। আমি আর্ট স্কুলে ভর্তি হলাম ১৯৪৯ এ। সেই থেকেই ছবি আঁকা শিক্ষা শুরু হলো।
ঠিকানা: তুলি এবং ক্যানভাসে শুরু করলেন কখন থেকে?
কাইয়ুম চৌধুরী: তুলি এবং ক্যানভাস শুরু করলাম আর্ট স্কুল থেকে। আমি আর্ট স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করার পরই তুলির সঙ্গে পরিচিত হই। তার কিছু দিন পর ক্যানভাসের সঙ্গে পরিচিত হলাম।
ঠিকানা: ছোট বেলা থেকেই কি আপনার ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিলো?
কাইয়ুম চৌধুরী: হ্যাঁ ছোট বেলা থেকে আমার ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিলো। এটা মনে হয় সবারই থাকে। সব বাঙালির যেমন একটা বয়সে এসে কবিতা লেখার ইচ্ছা হয়- ঠিক তেমনিভাবে ছবি আঁকার একটা ভাব জাগে।ঠিকানা: অন্য পেশায় না গিয়ে ছবি আঁকাকে পেশা হিসাবে নিলেন কেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: এটার জন্য আমার বাবা আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরীর অনুপ্রেরণা ছিলো। আমার বাবা কখনো প্রফেশনালী ছবি আঁকতেন না, কিন্তু তিনি তার অডিট পেন্সিল দিয়ে কিছু কাজ করতেন, ছবি আঁকতেন। সেই সময় আমি দেখেছি, আমাদের পরিবারে একটা সাহিত্যপ্রীতি ছিলো। আমার বাবার কালেকশনে ভারত বর্ষ, প্রবাসী, বসুমতি এই সব কাগজ দেখেছি এবং সেই সব কাগজে বিখ্যাত শিল্পীদের প্রিন্ট ছাপা হতো। এই ছবিগুলো আমি আগ্রহ সহকারে দেখতাম এবং তাদের ছবি কপি করতাম। তখন বাবা আমাকে পেন্সিল এবং রং- এর বাক্স কিনে দিয়েছিলেন।
ঠিকানা: আপনি যখন ছবি আঁকা শুরু করলেন তখন আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ কতটা এই মাধ্যমের অনুকূলে ছিলো?
কাইয়ুম চৌধুরী: অনুকূলতো ছিলো না। তখন ধারণা ছিলো যারা ছবি আঁকে তারা না খেয়ে মরে। আমি যখন ছবি আঁকার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম তখন বাবা- মার পক্ষ থেকে আমি কোন বাধা পাইনি কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং আত্মীয়- স্বজনরা বাবা- মাকে বলতেন একে যে আর্ট কলেজে পড়াচ্ছেন এতো না খেয়ে মারা যাবে। সেই সময় আর্টিস্টদের চেহারা ছিলো কাঁধে একটা ব্যাগ, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, শার্টের বোতাম আছে কি নেই, পায়ের স্যান্ডেলের অর্ধেক আছে তো নেই। আমরা আর্ট স্কুলে ভর্তি হবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করি ছবি আঁকাকে ভালবাসতাম বলেই। তখন ছবি আঁকা কোন প্রফেশন ছিলো না, ছিলো না কোন ভবিষ্যত। এমনকি স্কুলে ড্রয়িং টিচারের চাকরিও চালু হয়নি। সেই অবস্থায় আমরা আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তাই করিনি। লক্ষ্য ছিলো ছবি আঁকবো।
ঠিকানা: আপনি কতটা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন চারপাশের পরিবেশ থেকে?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমার বাবার কারণে আমি তেমন একটা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। আমাদের দেশে এখন প্রতিবন্ধকতা আসছে মৌলবাদীদের দিক থেকে। আমার মনে হয় তখন ধর্মটা যার যার মত করে পালন করতেন। এখন বাইরের বা ধর্মের যে বহি:প্রকাশ দেখি তা আগে ছিলো না।
ঠিকানা: আপনার অনুপ্রেরণা এবং এই মাধ্যমে টিকে থাকার সাহস কার কাছ থেকে পান?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমার বাবার কাছ থেকে। অন্য কেউ না।
ঠিকানা: আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন কোথায়?
কাইয়ুম চৌধুরী: ঢাকা চারুকলা থেকে।
ঠিকানা: শিক্ষক ছিলেন কারা? মুসলিম কোন শিক্ষক ছিলেন কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: সেই সময় জয়নুল আবেদীন, শফি উদ্দিন আহমেদ, আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান- এরাই আমার শিক্ষক ছিলেন।
ঠিকানা: কাকে আপনি ফলো করতেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমরা চেষ্টা করতাম জয়নুল আবেদীন বা কামরুল হাসানের মত ছবি আঁকার। কিন্তু আর্ট স্কুলের সিলেবাস ছিলো সম্পূর্ণ একাডেমিক। একাডেমিক কাজে অনুপ্রেরণা পাবার মত সেই সময় অতটা সুযোগ ছিলো না। আমরা একাডেমিক স্টাইলেই ছবি আঁকার চেষ্টা করতাম। আর্ট স্কুল থেকে পাশ করে বের হবার পর যখন একটু এক্সপেরিমেন্টাল কাজের দিকে গেলাম তখন কিছু কিছু শিক্ষকের অনুপ্রেরণা আমাদের মধ্যে ছিলো।
ঠিকানা: আপনার পরিবারের আর কেউ ছবি আঁকেন কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমার এক কাজিন আমার দেখাদেখি পরে আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সে পাসও করেছিলেন কিন্তু পরে এটাকে পেশা হিসাবে নেননি।
ঠিকানা: জীবনে এতটা পথ পার হয়ে এসে কি মনে হয় এই পথ বেছে নেয়া আপনার ভুল হয়েছে ?
কাইয়ুম চৌধুরী: অবশ্যই মনে হয়েছে আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি ভুল করিনি।
ঠিকানা: বাংলাদেশে অতীতের এমন দুম্বএকজন শিল্পীর নাম করবেন যাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি এবং বর্তমানে এমন দুম্বচারজনের নাম নিবেন যাদের সম্ভাবনা রয়েছে?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমাদের শিক্ষক যারা ছিলেন তাদের নিয়েই আমরা গর্ব করতে পারি। আমিতো মনে করি জল রং-এ জয়নুল আবেদীনের যে দক্ষতা তার ছবিতে দেখেছি, কামরুল হাসানের ড্রয়িং-এর যে চাতুর্য দেখেছি- সারা বিশ্বের দশজন শিল্পীর মধ্যে তারা পড়েন। পরবর্তীকালে অর্থাৎ আমাদের সময়ে রশিদ চৌধুরী ছিলেন। মোস্তুজা বসির ভাল কাজ করছেন, আমিনুল ইসলাম ভাল করছেন এবং মোহাম্মদ কিবরিয়া ভাল কাজ করছেন। এদের শক্ত পটভূমি বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনে সহযোগিতা করছে।
ঠিকানা: আন্তর্জাতিক মানে আমাদের আর্ট কেন পৌঁছাতে পারেনি?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমার মনে হয় আমাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। সরকারি প্রচেষ্টায় সম্মিলিতভাবে এ কাজটি আমাদের দেশে হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অনেক শিল্পী যারা বিদেশে লেখাপড়া করেছেন তারা অনেক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরস্কারও পেয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে স্পেনে মনিরুল ইসলাম, প্যারিসে সাহাবুদ্দিন এবং আমাদের দেশেও এমন গুনী শিল্পী রয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পরিচিত করার উদ্যোগ সরকারিভাবে নেয়া হয়নি, ব্যক্তিগত পর্যায়েও হয়নি। আমাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটিই।
ঠিকানা: এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?
কাইয়ুম চৌধুরী: এর থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে- বেঙ্গল গ্যালারির মত সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। সেই সাথে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতার। বাংলাদেশের বর্তমান যে অবস্থা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিদের পাঠানো রেমিটেন্সে আজ বাংলাদেশ সচল। যারা অর্থনীতিকে সচল রাখছেন তারা যদি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন এবং দৃষ্টি দেন তাহলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে। এই ক্ষেত্রে আমি একটি তুলনা তুলে ধরতে পারি। ভারতীয় চিত্র শিল্পীরা আজকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আজকে নিউইয়র্কে তাদের ছবির অকশন হয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন প্রবাসী ভারতীয়রা। এইভাবেই তারা আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান। আমি মনে করি আমাদের সংস্কৃতিকে যদি প্রবাসী বাংলাদেশীরা ভালবেসে এগিয়ে আসেন তাহলে এটা প্রতিষ্ঠিত হতে বেশি সময় লাগবে না।
ঠিকানা: আমাদের এই শিল্প মাধ্যমে অনেকেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এবং পটুয়া কামরুল হাসানের পর আপনাকে স্থান দেন। আপনি এই দুই মহান শিল্পীর মূল্যায়ন করবেন কি এবং আপনার ব্যাপারে যে মূল্যায়ণ সে সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া কী?
কাইয়ুম চৌধুরী: তারাতো আমার শিক্ষাগুরু। তাদের কাছ থেকে আমি শিল্প শিক্ষার পাঠ নিয়েছিলাম। তারা আমাকে তৈরী করেছেন। জয়নুল আবেদীন যে পরিমাণ কাজ করেছেন এবং কাজের যে বলিষ্ঠতা, তিনি সেই কাজগুলোকে যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারতেন তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে জয়নুল আবেদীন আজকে স্বীকৃত থাকত আরো বেশি। বাংলাদেশে একটা চিত্রকলার প্রতিষ্ঠান হবে এবং সেখানে একটা চিত্র আন্দোলন গড়ে তুলবেন- এই স্বপ্ন মাথায় রেখে তিনি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সর্বোপরি আমাদের তৈরী করেছেন। তিনি তার শিল্পী জীবনকে সেক্রিফাইস করেছেন। তিনি যদি নিজের উন্নতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইতেন তাহলে হয়ত শিল্পকলা আন্দোলনটা হতো না- কিন্তু তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তার সেক্রিফাইসের জন্য বাংলাদেশের চিত্রকলা আজ এই পর্যায়ে এসেছে। এখন দায়িত্ব আমাদের এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার। আমি মনে করি- বাংলাদেশে যারা ক্ষমতায় থাকেন, প্রশাসনে যারা থাকেন তাদের মধ্যে সংস্কৃতির মূল্যবোধটা একেবারেই নেই- বলা চলে শুন্যের পর্যায়ে। তারা চিন্তাও করতে পারেন না একজন শিল্পী কীভাবে দেশকে বাইরে পরিচিত করতে পারেন। শিল্পের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী একটি দেশকে দেখতে চায়। আমরা সবাই জানি আমাদের দেশটি ছোট। যে কারণে শক্তির দিক থেকে কোন দেশই আমাদের কাউন্ট করে না। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে বিশ্ব পরিমন্ডলে একটি দেশকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা যায়। আমরা নিজেরাই বলি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। আমরা মুখে যে কথা বলি সেটা কাজে দেখাতে পারি না। কোন চেষ্টাই নেই। আমরা কয়েকজন মুষ্টিমেয় শিল্পী ছবি আঁকছি। বাংলাদেশের নাটক বহি:বিশ্বে খুবই সুনাম অর্জন করেছে, বাংলাদেশের পল্লীগীতি সবার কাছে সমাদৃত। পল্লীগীতি সব দেশেই মিল আছে। বাংলাদেশের ফোক গানের সূর আমরা অনেক বিদেশী গানের মধ্যেও দেখতে পাই। সে জন্য সংস্কৃতির মাধ্যমেই বাংলাদেশকে বহি:বিশ্বে পরিচিত করা যায়- যা রাজনীতির মাধ্যমে সম্ভব নয় এবং রাজনীতিবিদরা যেহেতু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একেবারেই দেউলিয়া সেহেতু তাদের কাছে আমাদের আশা করার কিছু নেই। আপনারা যারা নিউইয়র্কে আছেন তাদের রাজনীতি যতটুকু প্রভাবিত করে তার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করে ব্রডওয়ের একটি শো বা মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে একজন শিল্পীর চিত্র প্রদশর্নী। অনেকেই ভাবেন এই দুজন মহান শিল্পীর পর আমার অবস্থান। কিন্তু আমি মনে করি আমার চেয়ে ক্ষমতাবান শিল্পী বাংলাদেশে আছে। তারা আমার উপরে স্থান পেতে পারেন।
ঠিকানা: চারুকলা ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পৃথক ফ্যাকাল্টি হওয়ায় শিল্প চর্চায় মৌলিক কোন পরিবর্তন দেখেন কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: ফ্যাকাল্টি হওয়ার আগে যেভাবে চারুকলা ইনস্টিটিউট ছিলো সেইভাবে থাকলে আমরা নিজেরা নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে পারতাম অন্যভাবে। যেমন একাডেমিক যে সিস্টেম আমরা আগে পেয়ে আসছি, আমাদের যে স্বাধীনতা ছিলো এখন ফ্যাকাল্টি হওয়ার পরে হয়ত বিভাগীয় উন্নতি হবে, আর্থিক সংকট থাকবে না। যেমন আমরা চেষ্টা করেছিলাম গ্রাফিক ডিজাইন যেহেতু কম্পিউটারাইজড। কিন্তু আমরা তার বাস্তবায়ন করতে পারিনি। যারা এই বিভাগে পড়েন তাদের চাকরি এখানেই শেষ হয়ে যায়। আমরা একবার চেষ্টা করেছিলাম। আমার সঙ্গে এবার এসেছেন মাহমুদুল হক। তিনি জাপানে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি একটি অনুদান নিয়ে এসেছিলেন কম্পিউটারসহ অন্যান্য বিভাগের উন্নতির জন্য। জাপান সরকার যখন অনুদান দিচ্ছে তারা তখন প্রশ্ন করলো আমরা এই অনুদান দিবো কিন্তু এটা ব্যবহার কিভাবে এবং কারা করবে? তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হলো- আমরা তো এটা বলতে পারবো না। তখন জাপান সরকার ঐ অনুদান তুলে নিয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারলো না যে, এটা আমরা দেখবো। তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলা হলো তোমরা টাকাটা নিচ্ছ কেন- আমাদের তো এয়ার কন্ডিশন দরকার তোমরা এটা আমাদের দিয়ে দাও- পরে তাই হলো। এটা আমাদের ব্যর্থতা।
ঠিকানা: এখন শিল্পকলার কোন বিভাগে ভাল কাজ হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমি মনে করি ড্রয়িং এন্ড প্রিন্টিং বিভাগ এবং গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে ভাল কাজ হচ্ছে।
ঠিকানা: আপনিতো বললেন কম্পিউটার নেই, সেক্ষেত্রে গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ কীভাবে ভাল কাজ করছে?
কাইয়ুম চৌধুরী: যারা এই বিভাগে আছেন তারা খুবই ট্যালেন্ট। তারা হাতে যে ডিজাইনটা করে তারও প্রচুর চাহিদা আছে। কোম্পনীগুলো যখন তাদের ইন্টারভিউ নেয় তখন তারা দেখে যে তার মধ্যে ট্যালেন্ট আছে। যে কারণে তারা তাদের নিয়ে কম্পিউটারের উপর প্রশিক্ষণ দেয় , তাতে করে তারা পূর্ণাঙ্গ শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়। এই সব শিল্পী যদি আর্ট কলেজ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হতে পারতো তাহলে তারা আরো ভাল করতো।ঠিকানা: আপনি কোন মাধ্যমে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দবোধ করেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমি ক্যানভাসে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি এবং এটা আমার ফেভারিট। নিউইয়র্কের এই ফেয়ারে যেকটা কাজ আছে তার মধ্যে সব কম্বটাই ওয়েল অন ক্যানভাস। তারপরেই জল রং।
ঠিকানা: আপনার কাজের মধ্যে নানা রং আসে- এর কারণ কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমাকে প্রভাবিত করে আমাদের লোক শিল্প। লোকশিল্পে সব সময় প্রাইমারী কালারটা ব্যবহার করা হয়- লাল, নীল, সবুজ এবং খুব ব্রাইট ওয়েতে। আমার কাজগুলোতে দেখবেন আমি যে নকসাগুলো ব্যবহার করি, সেইগুলো আমি তুলে নিয়ে আসি আমাদের নকসিকাঁথা থেকে। লোকজ রংটাই আমার কাজের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
ঠিকানা: বাংলাদেশে ভাস্কর্য ও ছাপচিত্র, রেখাচিত্র এবং রং এর এ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ বেশি দেখা যায়। কারণটা কী?কাইয়ুম চৌধুরী: একেক জন শিল্পীর একেক রকম এ্যাপ্রোস টুয়ার্ডস দেয়ার ওয়ার্কস, টুয়ার্ডস দেয়ার লাইফ। এখন যে যেভাবে এটাকে ব্যাখ্যা করেন, যে যে ভাবে উপস্থাপন করেন। এটা তাদের কোয়ালিটি। সব শিল্পীই চেষ্টা করেন শিল্পক্ষেত্রে নিজস্ব একটা অবস্থান, স্টাইল বা শৈলী তৈরী করতে। যেমন একটা ক্যানভাস দেখেই আমি বলে দিতে পারি এটা কার কাজ। এটা হচ্ছে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সবদেশেই তা লক্ষ করা যায়। এখন পৃথিবী ছোট হয়ে যাচ্ছে। গ্লোবালাইজেশনের কারণে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। আমি মনে করি আমার কাজে যদি আমার দেশের গন্ধ না থাকে, মানুষ না থাকে, প্রকৃতি না থাকে- তাহলে মনে করবো আমি ব্যর্থ।
ঠিকানা: এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পর্যায়ে কতটা প্রদর্শনী করেছেন একক বা যৌথ?
কাইয়ুম চৌধুরী: একক চিত্র প্রদর্শনী আমি দেশের বাইরে দুম্বদেশে করেছি। একটা আমেরিকায় ১৯৭৭ সালে, অন্যটা ভারতে। আমি আগেই বলেছি- আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। যে কারণেই বিদেশে যাওয়া হয় না। ইদানিং এই কাজটি বেঙ্গল গ্যালারি করছে। আমার জীবনতো এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, এখন আমরা ভাববো নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে। যারা আগামীকালের শিল্পী আছেন তারা হয়ত আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আমাদের চাইতে বেশি নিজেদের এবং দেশকে নিয়ে যেতে পারবেন।
ঠিকানা: ১৯৭৭ সালের পর কেন আসেননি?
কাইয়ুম চৌধুরী: না আসার কারণ হচ্ছে সুযোগ এবং সুবিধা। কোনটাই আমার ছিলো না। এখন আমাদের ছবি বিক্রি হয়। আগেতো আমাদের ছবিই বিক্রি হতো না। আমি গ্রাফিক ডিজাইনে কাজ করি। যদিও আমার কোন রকম শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। ১৯৫২ সন থেকে কাজ করে আসছি। আমি যখন আর্ট স্কুলে পড়তাম তখন আমরা ছয় ভাই- বোন একসঙ্গে লেখাপড়া করতাম। আমার বাবা একা ইনকাম করতেন। তিনি আমাকে পড়ার খরচ দিতে পারতেন না। উনি মাসে আমাকে চারটি টাকা দিতেন আর আর্ট স্কুলের বেতন। বাকিটা আমাকে সংগ্রহ করতে হতো। সেই থেকে যে কাজ শুরু করলাম ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেই কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে ছাড়তে দেয়া হয়নি। এখনো এই বয়সে একুশে ফেব্রুয়ারির আগে বই এর কাভারের জন্য এত চাপ আসে যে তা আমি এভয়েড করতে পারি না। গ্রাফিক ডিজাইনের কারণে আমি এখন বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের এডভাইজার হিসাবে কাজ করছি।
ঠিকানা: বই এর কাজ করতে গিয়ে আপনার শিল্পকর্মের কি কোন ব্যাঘাত হয়?
কাইয়ুম চৌধুরী: না, হয় না। কারণ আমি প্রেন্টিংটাকে বুক কভারে নিয়ে যাই। এখানে শিল্পীর একটা দায়িত্ব আছে। শিল্পীকে যদি ক্লায়েন্ট নিদের্শনা দেন তাহলে শিল্পী ভাল কাজ করতে পারেন না। বরং শিল্পীর উচিত ক্লাইয়েন্টকে নিদের্শনা দেয়ার। আগে যখন কাজ করতাম তখন আমাকে তিনটা লেআউট করতে হতো। এখন আমাকে লে-আউটও দেখাতে হয় না। আমি যেটা দেবো সেটাই নিয়ে নেন। যখনই আমার প্রচ্ছদ কম্পিটিশনে গিয়েছে তখনই আমি পুরস্কার পেয়েছি। সুতরাং সবার একটা বিশ্বস্ততা আমি অর্জন করতে পেরেছি। আমার বই এর কভার করতে গিয়ে আমি বাংলা টাইপোগ্রাফি এবং বাংলা ক্যালিওগ্রাফি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছি। এ ব্যাপারে এক সময় পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও আমার আলাপ- আলোচনা হয়েছিলো। আমি দেখেছি বাংলা টাইপোগ্রাফির উপরে সত্যজিৎ রায়ের অবদান অসাধারণ। আমি ফ্রি ব্রাস লাইনে টাইপোগ্রাফি- ক্যালিওগ্রাফির একটা চেষ্টা করেছি। আজকে যখনই আমার কাছে কেউ বই এর কভার বা পোস্টার করতে আসেন তারা বলেন আপনি কম্পিউটারের টাইপ ব্যবহার করবেন না, আপনার হাতের লেখা ব্যবহার করবেন।ঠিকানা: আপনি কখন ছবি আঁকেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমি ছবি আঁকি সকালে। আমি সকাল থেকেই কাজ শুরু করি। কাজের যদি চাপ থাকে তাহলে তা সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়, তা না হলে দুপুরেই শেষ করি। আর গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করি রাতে। আমার কাজের জায়গা দুটো। একটা আমার ছবি আঁকার স্টুডিও আর গ্রাফিক ডিজাইনের কাজগুলো করি বাসায়।
ঠিকানা: এ পর্যন্ত পুরস্কার কতটা পেয়েছেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আন্তর্জাতিক পুরস্কার খুব একটা পাইনি। দেশে একুশে পদক পেয়েছি। আমাদের আর্ট কলেজের সিলভার জুবলীর প্রথম পুরস্কার পেয়েছি। আরেকটা পুরস্কার পেয়েছি পাকিস্তান আমলে। পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক এই তিনটি দেশের শিল্পীদের চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিলো। সেই প্রদর্শনীতে আমি পুরস্কার পেয়েছিলাম।
ঠিকানা: ছবি আঁকার বাইরে আপনি কী করেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: ছবি আঁকার বাইরে আমি গ্রাফিক ডিজাইন করি। বাচ্চাদের জন্য ছড়া লেখি। আমার কয়েকটা বইও আছে। তবে আলসেমির জন্য লেখা হয় না। তাছাড়া আমার একটা দুর্নাম আছে- আমাকে যদি কেউ কাজ করতে দেন তার নাকি এক জোড়া জুতা কিনে আমার কাছে যাওয়া- আসা করতে হয়। কারণ কাজ বুঝে নেয়ার জন্য তার নাকি জুতাটা ক্ষয় হয়ে যায়।
ঠিকানা: বাংলা সাহিত্যের ধারাক্রম নিয়ে কিছু বলবেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমাদের বাংলা সাহিত্যে কবিতার ক্ষেত্রে আমি মনে করি একটা সময়ে অসাধারণ কবিতা রচিত হয়েছে। কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, নির্মেলেন্দু গুন- এরা যে কবিতা লিখেছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরাট স্থান করে নিয়েছে। এক সময় কবি শহীদ কাদরী আমাদের শক্তিশালী কিছু কবিতা উপহার দিয়েছেন। এখন তিনি লিখছেন না। আমরা তার অভাব খুব অনুভব করি। উপন্যাস ভাল রচিত হচ্ছে না। এখন যারা লিখছেন তাদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক ভাল করছেন।
ঠিকানা: এর পরে কারা আছেন?
কাইয়ুম চৌধুরী: এর পরবর্তীকালে হেলাল হাফিজ ভাল কবিতা লিখছেন।
ঠিকানা: নিউইয়র্কে এই প্রদর্শনীতে এসে কেমন লাগছে?
কাইয়ুম চৌধুরী: ভাল লাগছে। আমি মনে করি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের যাত্রা হলো। এটাকে যদি আমরা ধরে রাখতে পারি তাহলে খুব দ্রুত আমরা এগিয়ে যাবো।
ঠিকানা: সম্প্রতি সময়ে দেখা যাচ্ছে দেশে ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলছে মৌলবাদীরা- এই ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমি বলবো যে মাওলানা সাহেবদের ভাস্কর্য সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। তারা এটা ভাস্কর্য বলে না, তারা এটাকে বলে মূর্তি। আমি পৃথিবীর অনেক ইসলামী কান্ট্রিতে গিয়েছি। যেমন আমি আলজিরিয়াতে গিয়েছি, সেখানেতো এই সব দেখিনি। আমাদের দেশেই ধর্মের সঙ্গে কালচারের বিরোধ আমরা দেখি। কিন্তু বাইরে দেখি না। বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছিলো বা ইসলাম ধর্মের জন্ম হয়েছিলো, সেই সব দেশে ভাস্কর্য নিয়ে এত চেঁচামেচি হয় না। ইরাকে ভাস্কর্য ছিলো, সিরিয়াতে ভাস্কর্য আছে, অন্য সব ইসলামী দেশে ভাস্কর্য আছে, কেন আমাদের দেশে মৌলবাদীরা ভাস্কর্য ভাংচুর করছে এবং রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে? ভাস্কর্য নিয়ে তো কেউ পূজা করতে যায় না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য যখন দেখতে পাই তখন আমরা ষ্ক্র৭১ কে মনে করি। আমাদের গৌবরময় অধ্যায়কে স্মরণ করি। যারা দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন- আমরা তাদের স্মরণ করি, শ্রদ্ধা করি- এদের মধ্যে ধর্মের সম্পর্ক কী? কোন সম্পর্ক নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের কথা বলতে গেলে বলতে হয়- সরকারে মৌলবাদীদের লোক রয়েছে এবং তারা সব সময় এই বিষয়টাকে মদদ দেয়। আজকে বাংলাদেশে মৌলবাদের যে উত্থান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতেই সেটা হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মৌলবাদের উত্থান সম্ভব নয়। তারা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের কর্মকান্ড এই পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা অর্থ দিয়ে অনেক কিছু করছে। বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে এখন মৌলবাদীদের দেখতে পাওয়া যায়, তাদের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।
ঠিকানা: প্রবাসে আপনার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন। তারা শিল্পকর্মেও লিপ্ত আছেন। তাদের সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: অনেকই হয়ত ভাল কাজ করছেন। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন।
ঠিকানা: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলবেন কি?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমাদেরতো স্বপ্ন ছিলো স্বাধীন- সার্বভৌম বাংলাদেশ হবে। যেখানে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, আমরা শিল্প- সাহিত্যকে অবলম্বন করে দেশটাকে তুলে ধরবো। সেই স্বপ্নটা বোধ হয় আমরা দেখে যেতে পারবো না।
ঠিকানা: তাহলে দেশকে স্বাধীন করে লাভ হলো কী?
কাইয়ুম চৌধুরী: লাভ হলো আমরা একটা ভূখন্ড পেয়েছি। এই ভূখন্ডকে তৈরী করার দায়িত্ব আমাদের।
ঠিকানা: বাংলাদেশে দেখা যায় যারা শিল্প সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন তাদের মধ্যে বিরোধ- এর কারণটা কী?
কাইয়ুম চৌধুরী: এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, অনেক দেশেই আছে। সবার মধ্যেই একটি জেলাসি থাকে। রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভক্তির কারণ হলো নিজের উন্নতির জন্য, দেশের উন্নতির জন্য নয়। যেমন অনেকেই বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে যত ক্রিয়েটিভ লোক আছে, বিএনপির মধ্যে সেটা নেই। বিএনপি হালে চেষ্টা করেছে কিছু লোককে তাদের সপক্ষে দাঁড় করানোর। সম্প্রতি যে ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে তা তৈরী করেছেন যিনি তিনি বিএনপির বেনিফিসিয়ারী। সে স্পন্সর সংগ্রহ করে এবং সরকারকে ম্যানেজ করে কাজ করে। ভাল জিনিস তৈরী করার পরিবর্তে শহরের মধ্যে একটি কুৎসিত জিনিস তৈরী করে। ঢাকাতে প্রচুর ভাস্কর্য পাওয়া যাবে যেগুলো দৃষ্টিকটু। এখানে কমিটি থাকা দরকার এবং নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আমিতো নিজের ইচ্ছা মত যা খুশি তা তৈরী করতে পারি না। এটাতো এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। প্রতিবাদী একজন আমাকে জানিয়েছেন, ম. ইউ আহমেদের কাছে আমরা প্রতিবাদ এবং দোষীদের গ্রেফতার জানাতে গিয়েছি। কারণ তার কাছেই ক্ষমতা, ফখরুদ্দীন আহমেদেরতো কোন ক্ষমতা নেই।
ঠিকানা: ছবি আঁকা ছাড়া আপনি আর কী করেন?
কাইয়ুম চৌধুরী ছবি আঁকা ছাড়া আমি বই পড়ি, গান শুনি। গানের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। রবীন্দ্র সঙ্গীত আমার ফেভারিট।
ঠিকানা: কার বই পড়েন?
কাইয়ুম চৌধুরী: বাংলাদেশ ও পশ্চিবঙ্গের বই পড়ি। আবার বিদেশী বইও পড়ি।
ঠিকানা: ভারত এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের আর্টের অবস্থান কোথায়?
কাইয়ুম চৌধুরী: আমরা ভারতের বা অন্যান্য দেশের চাইতে কম নয়। যেহেতু আমাদের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী নেই, সেহেতু আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের অবস্থান ভাল।
ঠিকানা: আপনাকে ধন্যবাদ।
কাইয়ুম চৌধুরী: আপনাকে এবং ঠিকানা পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ।