যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু-১

পৃথিবীত ভালো মানুষ খুবই কম। মন্দলোকের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু খারাপ লোককে সহজে চেনা যায় না। তেমনি ভালো মানুষ খুঁজে পাওয়াও বেশ কঠিন। কারণ অধিকাংশ মন্দ লোকই ভালো মানুষ সেজে থাকে। সমাজ থেকে খারাপ মানুষগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলে হয়ত অবশিষ্টদের দিকে আঙ্গুল তুলে বলা যেত এঁরা ভালো লোক। সে কাজটা বোধ করি আরও কঠিন। সে জন্যেই সম্ভবত ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় ও লোম বাছতে কম্বল উজাড় কথা দুটোর উৎপত্তি হয়েছে এবং তা এত ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। সেই রাজার গল্পটা ভিন্ন অর্থে খুবই প্রাসঙ্গিক হবে যিনি রাজ্যের সব লোককে একটা বড় মাঠে সমবেত হতে বলেছিলেন যার একধারে ছিল নদী আর অন্য পাশে ছিল পাহাড়। সবাইকে বলা হয়েছিল, যারা নিজের স্ত্রীকে ভয় পাও তারা পাহাড়ের দিকে যাও। আর যারা স্ত্রী ভয়ে ভীতনা তারা নদীর তীরে থাকো। দেখা গেলো একজন বাদে সবাই পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে দাঁড়ালো। মন্ত্রী মহোদয় সেই একমেবাদ্বিতীয়মটিকে রাজার কাছে নিয়ে গেলেন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কী হে বাপু, তুমি কী স্ত্রীকে ভয় পাওনা? সে বীর পুরুষ কী বলেছিল জবাবে সেটাও বোধকরি কারও অজানা নয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এই গল্পটা পরিবেশন করেছিলেন এবং তা ব্যাপক প্রসিদ্ধি পেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে। স্ত্রী বলে দিয়েছিল, ‘খবরদার ভিড়ে যেওনা’। তাই সে বীরপুঙ্গব একলা দাঁড়িয়েছিল সুবোধ বালকের মত। রাজা খুশি হয়েছিলেন দেখে যে রাজ্যের সব লোকই তার মত স্ত্রৈণ। রাজা ধরে নিয়েছিলেন, তার জীবন বোধটাই শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ স্ত্রৈণ হওয়াটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। এ গল্পের মাজেজা একটু ভিন্ন কিন্তু শানে নজুল অভিন্ন। তবু ভালো আর মন্দের সমাবেশ ঘটালে তার ফলাফল এ রকম এক পক্ষে ১০০ ভাগ হয়ে যেতে পারে। ভালো যারা তারা সুযোগের অভাবে চরিত্রবান। এমন হওয়ার সম্ভাবনাকে কলিকালে ও আখেরি জমানায় একেবার উড়িয়ে দেয়া যায়না।

রবীন্দ্রনাথ সেই যে বলেছিলেন, “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?” কবি প্রশ্নটা রেখেছিলেন তাঁর ভগবানের কাছে। কিন্তু ক্ষমা করা এবং ভালোবাসার ব্যাপারটা মানুষের কাছেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মানুষ দুষ্ট লোককে চিনতে পারেনা। সে জন্যে অপাত্রে ক্ষমা ও ভালোবাসা দান করে বসে।

আমরা মহামানবের জীবন কাহিনী পড়ছি ছোট বেলা থেকে। কিন্তু তাঁদের জীবন থেকে কোন শিক্ষা নেইনি। যুগে যুগে বিভিন্ন পয়গম্বর, নবী, অবতার, ধর্মপ্রচারক, ধর্মগুরু মানুষকে যেসব সদুপদেশ দিয়েছেন তা যদি আমাদের “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিত” তাহলে চালচিত্রটা অন্যরকম হতে পারেতো। কিন্তু সেটা হতে পারেনি। আমরা সব ধর্মগ্রন্থ সযত্নে সসম্মানে রেহেলে সাজিয়ে রেখেছি। ধর্মের আলখেল্লা পরে কিছুলোক বাণিজ্য করে পেটপালন করছে এবং দুঃশাসনের বর্ম হয়েছে। ধর্মাবতারদের মাথার তাজ বানিয়ে রেখে স্বর্গবাসের স্বপ্নে বিভোর থেকেছে ৬/৭ শ’ কোটি মানুষ।
“বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে// আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে” সেই দুর্ভাগ্যেই “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে” এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে দুর্বৃত্ত দুর্জন ও দুষ্কৃতিদের চিনতে হবে। জানতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। লড়াই করে বাঁচতে হবে। সে লড়াইয়ে জিততে হবে।

বিশ্বে দুষ্কৃতি দুর্জনের সংখ্যা যেমন বিশাল তেমনি পৃথিবীর মহামানব ও মহাপুরুষের তালিকাও একেবারে ছোট না। শুধু বিগত কয়েক শতাব্দিতে যাঁরা মানুষের স্বাধীনতা, মুক্তি, সমতা ও কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন, লড়েছেন এবং জীবনপাত করেছেন তাঁদের স্মরণ করতে গেলেও বিরাট পরিসর চলে যাবে। তবু তাঁদের নাম উল্লেখ না করে শুধু ভিলেনদের কথা লিখলে আমাকে ‘একপেশে, একচোখা ও পক্ষপাতদুষ্ট’ হওয়ার অপবাদ মাথা পেতে নিতে হবে। তাই মহান মানুষের তালিকায় প্রথমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “ফাউন্ডিং ফাদারস” নামে খ্যাত জর্জ ওয়াশিংটন, জন জে, এডামস, বেঞ্জামিন, ফ্রাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, থমাস জেফারসন ও জেমস মেডিসনের নাম লিখতে চাই। তার পরে কার্লমার্কস, এঙ্গেলস, রুশো ভলতেয়ার লেনিন, মাওয়েদঙ, হোচি মিন, কিম ইলসুঙ, টিটো, প্যাট্রিস লুমুম্বা, সুকর্ণ, আলেন্দে ও শেখ মুজিবের নাম লিখছি। আমার বিবেচনায় সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ মানুষ এঁরা সবাই। আর বাঙালি জাতির পিতা মুজিবই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। খারাপ মানুষের কথা লিখলে জারমানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি, স্পেনের আজীবন স্বৈরশাসক ফ্রাঙ্কো, দ.ভিয়েৎনামের নগো দিনদিয়েম, ইরাকের নূরী আস সাঈদ ও ইরানের রেজা শাহ পাহলভি থেকে পাকিস্তানের আইয়ুব -ইয়াহিয়া, বাংলাদেশের জিয়া- এরশাদ এবং চিলির পিনোশে ও ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর মত দুষ্কৃতিদের কারও নামই বাদ দেওয়া যাবেনা। কিন্তু আজ আমি এমন একজনের কথা লিখছি যার ভিতর সব শয়তানকেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

সাধুবেশে বেটা পাকা চোর অতিশয়: ছাত্র জীবনে ছিল একজন তুখোড় বক্তা, দুর্দান্ত তার্কিক, শক্তিমান লেখক, খেলাধূলায় পারদর্শী এবং অসাধারণ মেধার অধিকারী। সাঁতার, বক্সিং এবং কুস্তিতেও ছিল তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ম্যানিলায় অবস্থিত ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে সেরা ছাত্র হিসাবে তার খ্যাতি ছিল। ১৯৩৯ সালে সর্বোচ্চ আইন পরীক্ষায় পেয়েছিল ৯৮.০৮ % নম্বর। কিন্তু সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে চিটিংবাজির অভিযোগ আসে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনায় শেষ পর্যন্ত তার মেধার মান ৯২.৩৫% এ নেমে আসে।

আমি ফিলিপিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট কুখ্যাত স্বৈরাচার, দুর্বৃত্ত দুরাচার ও বিশ্বসেরা দুর্নীতিবাজ ‘ফার্ডিনান্ড ইমানূয়েল এডরালিন মার্কোস সিনিয়ার’, এর কথা বলছি। ফিলিপিনের এই রাজনীতিকের নামের সাথে ইংরেজি “ক্লেপ্টোক্রাট” শব্দটা সেঁটে গেছে। ক্লিপ্টোমেনিয়া একটা ব্যাধি। এ ব্যাধির শিকার (ক্লেপ্টোক্রাট) যারা তারা চুরি না করে থাকতেই পারে না। ১৯৭২ সালের সামরিক শাসন থেকে ১৯৮১ অবধি তার শাসনামল দুর্নীতি, অপব্যয় এবং নৃশংসতার জন্য কুখ্যাত। মার্কোস ১৯৭২ সালে ফিলিপাইনসে সামরিক শাসন জারি করে সংবিধানের চেহারা পাল্টে দেয়। ১৯৬৫ সালে কারচুপির নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। ১৯৮৬ সালে তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে ন্যাক্কারজনকভাবে। একটা মানুষ কতটা মেধাবী হতে পারে ? তার একটা তারকা দৃষ্টান্ত হচ্ছে সিনিয়ার মার্কোস। অবিশ্বাস্য রকমের স্মৃতিশক্তির অধিকারী মানুষ ছিল মার্কোস। ‘দি মার্কোস ডাইনেস্টি ‘ নামক গ্রন্থে তার অসাধরণ স্মৃতিশক্তির নিদর্শন তুলে ধরেছেন লেখক ‘এলেন সিয়েগ্রেভস ’। মার্কোস প্রথমে ছিলেন এটর্নী। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৯ ছিলেন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। সিনেটর ছিলেন ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৫ অবধি। সে সময়ে ফিলিপিনের ১৯৩৫ সালের সংবিধান ছিল তার কন্ঠস্থ ও ঠোঁটস্থ। সংবিধানের শুরু থেকে শেষ পর‌্যন্ত অনর্গল অবৃত্তি করতে তার কোন জুড়ি ছিল না।

২৫ মার্চ ২০১২, ‘দি ফিলিপিন স্টার’ পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে . সিনেটর মিরিয়াম তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি ছিলেন মার্কোসের বক্তৃতা লেখক। একবার আইন সচিব তাকে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট আমাকে বলেছিলেন তার বক্তৃতা লেখানোর কথা। সে কথা আমি তোমাকে বলতেই ভুলে গিয়েছি। আইন কলেজের ছাত্রদের অনুষ্ঠানে আজই তিনি বক্তব্য রাখবেন। দেখো এটাকে এখন একটা এমারজেন্সি মনে করে তুমি যা হোক একটা কিছু খাড়া করে ফেলো’। কী করি তখন ? আমি প্রেসিডেন্টকে সব কথা খুলে বললাম। মার্কোস বললেন, ঠিক আছে, এখন আর তা’হলে লেখার দরকার নেই। তুমি শুধু বলে যাও। আমি শুনি। আমি যা বললাম, লিখলে সেটা ২০/২৫ পৃষ্ঠা হত। তিনি লম্বা বক্তৃতা দেয়াই পছন্দ করতেন। সেই সন্ধ্যায় আমি তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি তাকে যা শুনিয়েছিলাম মার্কোস তার সবটাই মুখস্থ বলে গেলেন। এমনি বিস্ময়কর ও অবিশ্বাস্য স্মৃতি শক্তি ছিল তার।

প্রতারণা আর কাকে বলে? : মার্কোস সেনাবাহিনীতে মেজর পর্যন্ত হতে পেরেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তার উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ ছিল। তবে অসংখ্য বীর পদক পেয়ে মার্কিন বাহিনীতে ফিলিপিনের শ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে খেতাব পাওয়ার যে দাবি ছিল, সে সবই ছিল তার গুলপট্টি। সেরেফ ভাওতা ও মিথ্যাচার। মার্কিন যুদ্ধ দলিলে তার যুদ্ধকালীন বীরত্বের সব দাবিকে প্রতারণা এবং অবাস্তব বলে নাকচ করা হয়। তার ২০ বছরের শাসনামলের প্রথম এবং মধ্যবর্তী অংশ কেটেছিল দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিকাশের ধারায়। কিন্তু শেষ হয়েছিল জনগণের জীবনযাত্রার কঠিন সঙ্কট, চরম দারিদ্র্য এবং ঋণ সঙ্কটের মধ্যদিয়ে।
সামরিক শাসন ও গণবিপ্লব: ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭২, মার্কোস দেশে সামরিক শাসন জারি করে সংবিধানের চেহারা পাল্টে দেয়। সংবাদ মাধ্যমগুলোর টুটি চেপে ধরে। রাজনৈতিক বিরোধিতাকে লোমশ পা দিয়ে পিষে ফেলে। সে সময়ে অধিকার সচেতন মুসলিম জনগোষ্ঠী, কম্যুনিস্ট মতাদর্শী এবং সেই সাথে সাধারণ মানুষ তার অবর্ণনীয় দুঃশাসন ব্যভিচার ও নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়। ১৯৭৩ সালে বিতর্কিত এক গণভোটে তার সামরিক শাসন জারির বিষয়টা ৯০’৭৭ শতাংশ ভোটে অনুমোদন লাভ করে। যদিও ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৯.২৩%। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি ও গণপীড়নের দরুন মার্কোসের জনপ্রিয়তায় ধস নামে। ১৯৮৩ তে বিরোধী নেতা বেনিগনো একুইনো মার্কোসকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার জন্যে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরছিলেন। তিনি ছিলেন উদারপন্থী গণতান্ত্রিক নেতা। কিন্তু তাঁকে কম্যুনিস্ট অপবাদ দিয়ে বেঘর করা হয়েছিল। তবে তিনি দেশে পা রাখতে পারলেন না। বিমান বন্দরেই তিনি আততায়ির গুলিতে নিহত হন। সেই হত্যাকান্ড এবং জনগণের অর্থনৈতিক দুর্গতির কারণে ১৯৮৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করে। গণঅসন্তোষ বাড়তে খাকে। অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যায়। যুদ্ধকালীন বীরত্বের ভাওতাবাজির হাড়িও ভরাহাটে ভেঙে পড়ে। এই সব সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে ১৯৮৬ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে মার্কোস তার পাপের ভারে ভেঙে পড়ে। গণহারে ভাওতাবাজি, উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য স্বৈরাচার মার্কোসকে চরম মূল্য দিতে হয়। ফেব্রæয়ারি ১৯৮৬ গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এ সময়ে ম্যানিলায় সেনাবাহিনীর মার্কোসপন্থী এবং মার্কোস বিরোধী অংশের লড়াই হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। দেশ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়ায়। তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সিনেটর পল লাক্সাল্টের মাধ্যমে মার্কোসকে ‘চুপচাপ কেটে পড়ার’ পরামর্শ দেন। মার্কোস হাওয়াইতে পালিয়ে যান। তারপরেই, আতোতায়ির গুলিতে নিহত বিরোধীদলীয় নেতা সিনেটর একুইনো, জুনিয়ার, এর বিধবাপত্নী কোরাযন “কোরি” একুইনো ফিলিপিনের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: বেশি দিনের কথা না। বাংলাদেশে তখন মার্কোসের চ্যালা দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসক লে. জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ ছিল তুঙ্গে। ভাড়াটে ঘাতকরা তার পূর্বসূরী জেনারেল জিয়াকে হত্যা করলো। আইনের ভাষায় জিয়াকে অবৈধ রাষ্ট্রপতি বলা হয়েছে। ঘাতকরা স্বৈরাচার জিয়াউর রহমনেকে ব্রাশ ফায়ারে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে তার লাশ গুম করলো ৩০ মে ১৯৮১। সেই খুনের দায় আমার শৈশবের বন্ধু ও সতীর্থ সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে বিনা বিচারে হত্যা করা হ’ল। এরশাদ হাত ধুয়ে ক্ষমতা দখল করলো। জিয়ার বিধবা পত্নী খালেদা জিয়া বিদেশী মদদে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি এরশাদ উৎখাতের আন্দোলনে রাজপথে নেমে আসলেন ২৭ নভেম্বর ১৯৮৩। মুহুর্মুহু টিয়ার গ্যাস বিস্ফোরণের মধ্যে পানি জবজবে রুমাল নিয়ে সচিবালয়ের উত্তর পাশের ফুটপাতে আমি তাঁর পাশে গিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলাম। তার দলের নেতাকর্মীরা সবাই শব্দ শুনেই ভেগেছিল। আন্দেলনের মাঠে সবাই সক্রিয় না থাকলেও রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার জন্যে তার পাশে ছিলেন হাফ ডজন ব্যারিস্টার, অনেক সাবেক আমলা, বেশ কিছু বড় ব্যবসায়ী এবং একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার লে. জেনারেল মীর শওকত আলী, মেজর জেনারেল মজিদ উল হক(অবঃ), কর্ণেল ওলি আহমদসহ কমকরে এক ডজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা। রাজপথে তাঁর অনুগত ছাত্র-যুবকরা এক সময় স্লোগান তুলেছিল : ‘খালেদা হবে কোরাযন, এরশাদ যাবে সুন্দরবন’। খালেদার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল সাত দলীয় ঐক্যজোট। ঘটনাচক্রে এই অকৃতি অধমও সেই জোটের অংশ হয়ে রাজপথের আন্দোলনে সামিল থেকে জেলজুলুমের অংশীদার হতে পেরেছিল। অন্যদিকে জেনারেল জিয়ার কারসাজিতে ও মার্কিন মদদপুষ্ট রাজনীতিক খন্দকার মুশতাকের ষড়যন্ত্রে খুন হওয়া বাঙালি জাতির পিতা মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ১৫ দলও তখন কৌশলগত কারণে এরশাদ বিরোধী রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। ২৭ নভেম্বর ১৯৭৩ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে শেখ হাসিনা নিজে এবং তার জোট সঙ্গীরা সক্রিয় ছিলেন।

১০০ হোন্ডা ২০০ গুন্ডা: এরশাদ আমলে বলা হ’ত ১০০ হোন্ডা ২০০ গুন্ডা না থাকলে নির্বাচন জেতা যাবে না। ক্ষমতাচ্যুতির ৬ বছর পর, ১৯৯৬ সালে জেনারেল এরশাদের সাথে আমার প্রথম ও শেষ সাক্ষাৎ ঘটে আমার এক উচ্চাভিলাষী বন্ধুর সৌজন্যে। তার গুলশানের বাসায় গিয়েছিলাম মানুষটাকে সামনা-সামনি দেখার জন্যে। সেই সাক্ষাতেই এরশাদ আমাকে বলেছিলেন, “আরেফিন সাহেব আপনি বলেন ভালো, লেখেন ভালো। কিন্তু একটা কথা বুঝেন না যে, ১০০ হোন্ডা আর ২০০ গুন্ডা না থাকলে নির্বাচনে জেতা যায়না। আর সে জন্যেই আপনি এত আন্দোলন করে, এতবার জেল খেটেও ১৯৯১ সংসদ নির্বাচনে হেরে গেলেন”।

কথিত আছে যে, ফিলিপিনে মার্কোসের শাসনামলে সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভোট ক্রয়, ভোট ছিনতাই এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজের মুঠোয় ধরে রাখতে ইংরেজি বর্ণমালার তিনটা “জি অক্ষর” ব্যবহার করা হত। বন্দুক বা মঁহং এর জন্য একটা দম; গুন্ডা বা মড়ড়হং এর জন্য দ্বিতীয় ম এবং তিন নম্বরটা ব্যবহার হ’ত মড়ষফ বা সোনা তথা অর্থের জন্যে। এরশাদের সাথে মার্কোসের মিল রয়েছে রাষ্ট্রীয় মাল চুরি, লাম্পট্য ও দলন পীড়নে এবং গুলি করে বিরোধীদের খুন করার ব্যাপারেও। আর জিয়াউর রহমানের সাথে তার সবচেয়ে বড় মিলের জায়গাটা হচ্ছে ভোটারবিহীন গণভোটে ৯৮% ভোট পেয়ে সামরিক শাসন অনুমোদনের বাপারটায়।

ইমেলদার ১০ বিলিয়ান, খালেদার ১২ বিলিয়ান ডলার: কোরাজনের মত আন্তর্জাতিক আনুকুল্য পেয়ে খালেদা জিয়া (পুতুল ) ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ অবধি সাগর চুরি। সৌভাগ্যক্রমে আড়াই মেয়াদে একযুগের বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু তাকে শেষ অবধি রাষ্ট্রীয় তহবিল তসরুফ, এতিমের টাকা আত্মসাৎ, গণদলন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের পাপে ডুবে ইমেলদা মার্কোসের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। ইমেলদার রয়েছে তিন হাজার মূল্যবান পাদুকা সম্ভারের কলঙ্ক এবং ১০ বিলিয়ন ডলার চুরির দায়ে কারাবাসের রেকর্ড। খালেদারও রয়েছে জাপানি সাজুগুজু, লাখ টাকা দামের শত শত সিফন শাড়ি সজ্জিত উগ্র ভোগবিলাসিতার সুনাম ও দুর্নীতিতে ইমেলদার সমকক্ষতা। কয়েদ খাটার অভিজ্ঞতা অবশ্য এখন খালেদারই বেশি। সৌদি সরকার খালেদা জিয়ার ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন। সৌদি আরব ও কাতারসহ অন্যান্য আরব দেশে তার নিজের দেশ থেকে পাচার করা অর্থে খালেদা জিয়া এইসব সম্পদ হাসিল করেছেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। তাঁরা বলছেন, সৌদি আরব ও কাতারে প্রয়াত কোকোর নামে যত সম্পদ রয়েছে তার আসল মালিক হলেন খালেদা জিয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে এই বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন খালেদা। ‘এই সব সম্পদ আছে। তা’ উদ্ধার করা হবে এবং বাজেয়াপ্ত করা হবে’। খালেদা জিয়া, পাকিস্তানের নেওয়াজ শরীফ এবং অন্য একটি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ৫ বিদেশী নাগরিকের চুরি করা সম্পদের ব্যাপারে তদন্ত করছে সৌদি সরকার। স্বদেশের ১৯ ‘হারামখোর’ এর বিপুল সম্পদের ব্যাপারেও তারা তদন্ত করছেন।

খালেদার ১২ বিলিয়ন ডলার কী তিনি একাই চুরি করেছেন? নাকি জিয়াউর রহমানের ভাঙা সুটকেস থেকেও কিছু পেয়েছেন ? সে ব্যাপারে এখনও কোন জবানবন্দী মিলেছে কিনা সেকথা ‘আলজাজিরা’ সূত্রে জানা যায়নি। তবে ‘হাওয়া ভবনের’ মাল যুক্ত হলে জিয়া পরিবারের সম্পদ মার্কোস দম্পতির সম্পদকে টেক্কা দেবে সে ব্যাপারে আমি কোন সন্দেহ পোষণ করিনা।

একেই বলে সাগর চুরি: মার্কোস দেশছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর কোরাজন সরকার ক্ষমতাসীন হলে “সুশাসন সম্পর্কিত প্রেসিডেনশিয়াল কমিশান (পিসিজিজি)” গঠন করা হয়। সেই সূত্রে মার্কোস দম্পতির প্রায় বিশ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় তহবিল চুরির তথ্য প্রকাশ পায়। ‘পিসিজিজি’ এর তদন্ত বিবরণে মার্কোস পরিবারের নিয়ম ও বিধি বহির্ভূত অনৈতিক জীবন যাপনের তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কথা। তাদের সেই বিলাসী জীবনযাপনের খাতেও কয়েক বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। রাষ্ট্রীয় কাজে ইমেলদার ব্যাপক হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তাদের অপশাসনামলকে স্বামী-স্ত্রীর ‘দাম্পত্য একনায়কত্ব’ নামে অবিহিত করা হয়। রাষ্ট্র শাসনে ইমেলদা যে পন্থায় নিজের অধিকার প্রয়োগ করে লুটপাট করে তাকে টেরিফিক না বলে “ইমেলডিফিক”বলা হয়। দশ বিলিয়ন ডলার তসরুফের কারণে ইমেলদাকে কারাদন্ড দেয়া হয়। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তাদের দুই সন্তান ঈমী মার্কোস এবং ফার্ডিনান্ড “বংবং” মার্কোস পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়।

৩০ ডিসেম্বর ১৯৬৫ ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধান ডায়েসডাডো মাকাপাগালকে নিজস্ব কায়দায় নির্বাচনে হারিয়ে মার্কোস ফিলিপিনের দশম প্রেসিডেন্ট হলেন। সেখান থেকেই তার দুই দশক স্থায়ী শাসনামলের শুরু। ১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্রে ৪ বছর করে দু মেয়াদে ৮ বছর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বিধান ছিল। মার্কোস কারচুপি ও ছলচাতুরির নির্বাচনে জিতে তার দোসর আইয়ুব খান এর ১৯৬৪ স্টাইলে রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট বানিয়ে সংবিধান কেটে ছিড়ে ‘নিজের পায়ের মাপে জুতা বানান’। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে সেই পন্থা চুরি করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত ১৯৭২ সালের সংবিধানের উপর ইচ্ছে মত ছুরি চালান। ১৫ আগস্ট ’৭৫ এর খুনিদের রক্ষা করেন। এরশাদও একই কাজ করেছিলেন ১৯৮৮ সালে আ.স.ম. রবকে গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতা বানিয়ে। সব স্বৈরাচারের ‘মোডাস অপারেন্ডি’ একই নিয়মে বাঁধা। তারা স্বজাতি ও স্বগোত্রীয়। তাদের গডফাদারও বোধ হয় অভিন্ন।

জাপানের পরেই ছিল ফিলিপিনস: মার্কোস ক্ষমতায় বসার আগে ফিলিপিনস এশিয়ার ২য় বৃহত্তম অর্থনীতির অধিকারি ছিল। জাপানের পরেই ছিল তার স্থান। মার্কোস তার প্রথম মেয়াদে বিপুল পরিমান বৈদেশিক ঋন নিয়ে দেশের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করে। তার ফলে প্রথম মেয়াদে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। তবে তাতে বড় রকমের মুদ্রাস্ফীতিজনিত তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। পরিণামে ১৯৭২ সালে সামরিক শাসন নেমে আসে। ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কোস সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করে ১৪ বছর স্থায়ী একনায়কত্বের সূচনা ঘটায়। ১৭ জানুয়ারি ১৯৮১ সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও মার্কোসের একনায়কত্ব অব্যাহত ছিল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট পদে বসেই মার্কোস বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ এনে সেনাবাহিনীর ব্যাপক স¤প্রসারণ ঘটায়। স্কুল নির্মাণ খাতে ব্যয় দেখিয়ে সেই অর্থ সামরিক খাতে খরচ করা হয়।নজির বিহীন ভাবে নিজেই প্রতিরক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করে সামরিক বাহিনীকে কুক্ষিগত রাখে। মার্কোসের অনুগত জেনারেলদের অবসর গ্রহণের পরেও বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিরোধী নেতা সিনেটর বেগিগনো এস . একিনো ১৯৬৮ সালে অভিযোগ করেন যে দেশটাকে একটা ‘গ্যারিসন স্টেট’ বানানো হচ্ছে। মার্কোস তার ক্ষমতার খুটি শক্ত করার জন্যে বর্ধিত সামরিক শক্তির একাংশ ভিয়েৎনাম যুদ্ধ এবং দক্ষিণ ভিযেৎনামে বিনিয়োগ করে। ক্ন্তিু উন্নয়ন খাতের জন্যে ঋণ করে সে অর্থ সামরিক খাতসহ অনুৎপাদনশীল খাত সমূহে ব্যায় দেখিয়ে নগদে কমছেকম ১০ বিলিয়ন ডলার চুরি ছাড়াও ইমেলদার নামে ইউরোপ আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন নগরে স্থাবর সম্পদের পাহাড় গড়া হয়। এসবের পরিণামে বিপুল পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতি সঙ্কট সৃষ্টি হয়। মার্কোসের উন্নয়ন গরীবের গলার ফাঁসে পরিণত হয়। তাতেই গণবিস্ফোরণ ঘটে। সেই পাপেই মার্কোস তলিয়ে যায়। এদিকে জনগণের ঘাড়ে বৈদেশিক ঋণের পাহাড় চেপে বসে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফএর মত লগ্নিকারক সংস্থা থেকে নেয়া সেইসব ঋণের বোঝা ফিলিপিনের জনগণকে ২০২০ সাল পর‌্যন্ত বহন করতে হবে। এই চরম দুর্ভাগ্যের জন্য ফিলিপিনের জনগন কোনদিনও মার্কোস ও ইমেলদা মার্কোসকে ক্ষমা করবে কিনা তা জানিনা। তবে লেবু কচলালে তিতা হয়ে যায়। তাই আমি মার্কোসের পাপের গল্প আর টানতে চাইনা। তাছাড়া কেঁচো খুড়তে সাপ বের হোক তাও চাইনা।
-ক্যালিফোর্নিয়া।