যুক্তরাষ্ট্রের গভীর পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিনিধি : আন্তর্জাতিক শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তা প্রতিপালনের জন্য বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করার নীতি বাংলাদেশে এবার যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তাদের বিঘোষিত নীতিই এখানে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকেও মানসিক ও রাজনৈতিক শক্তি জোগাচ্ছে। তবে এতে যথেষ্ট ঝুঁকিও রয়েছে। বিএনপি ও তার সহযোগীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কি না, পরিকল্পিতভাবে নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার, সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিরোধী দলকে দমনে অগণতান্ত্রিক, অনৈতিক, আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে কি না, তা-ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জন্য সুবিধা যেমনি রয়েছে, তেমনি সমস্যা, ঝুঁকিও কম নয়। বিরোধী দলকে নির্বিঘ্নে, কোনো রকম বাধা ছাড়াই সভা-সমাবেশ, মিছিল করার নিশ্চয়তা দিয়েছে সরকার। বিদেশিদের চাপের মুখেই সরকার নমনীয়তা নিয়েছে। বিভিন্ন মহানগরে বিরোধী দল সমাবেশ করছে। সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি দল তাদের মিছিল, সভা-সমাবেশে বাধা দিচ্ছে- এমন অভিযোগও জোরালোভাবে বিরোধী দল থেকে করা হচ্ছে না। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা অবশ্য ঘটছে। সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জোরালো বাধা না থাকা বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপকভাবে সমাবেশে উপস্থিতির অন্যতম কারণ। বিনা বাধায় বিরোধীদের সভা-সমাবেশ করতে দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের চাপ রয়েছে। বিএনপি সেই সুযোগটাই পুরোমাত্রায় নিচ্ছে।
সমাবেশে কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে উৎফুল্ল কেন্দ্রীয় নেতারা। স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সফল সমাবেশ শেষে সরকার ও সরকারি দলের প্রতি এই হুমকিও দিয়েছেন, সরকারি দল বিএনপির সমাবেশে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে দেখুক, পাল্টা হামলার সম্মুখীন হতে হবে তাদের। বিদেশে পলাতক অবস্থায় থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সর্বাধিক বিশ্বস্তজন বলে পরিচিত আমীর খসরুর এই ঘোষণা বিএনপির কর্মীদের প্রচণ্ড মারমুখী হতে উৎসাহিত করবে। এ পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেল হত্যা দিবসের আলোচনায় ঘোষণা করেছেন, আওয়ামী লীগের আর একজন কর্মীকে আঘাত করা হলে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আমীর খসরু এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়েছে, কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ। দুই পক্ষে সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রাজপথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য মানসিক, রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আছেন।
বিএনপির সফল সমাবেশ তাদের নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত, উজ্জীবিত করেছে, সন্দেহ নেই। তাদের সমাবেশে সরাসরি বাধা না দিয়ে সরকার, সরকারি দল ভিন্নতর কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বাস-লঞ্চ মালিক-শ্রমিকদের মাধ্যমে তাদের অভিন্ন দাবিদাওয়ার নামে বিএনপির সমাবেশের দুদিন আগে ধর্মঘট পালন করা হয়েছে। বাস-লঞ্চ মালিক-শ্রমিকদের দাবিগুলো নতুন নয়। তারা ধর্মঘট বিএনপির সমাবেশের আগে বা পরেও পালন করতে পারেন। তা না করে বিএনপির সমাবেশের আগে কেন তাদের ধর্মঘট? জনমনে এ নিয়ে সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রসহ কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, অতীতের মতো বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাস, বোমাবাজি, সরকারি-বেসরকারি সম্পদ ও যাত্রীবাহী বাসে বোমাবাজি করে মানুষ হত্যার ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তির ভয়ে বাস-লঞ্চ মালিক-শ্রমিকেরা নিজেদের সিদ্ধান্তমাফিক ধর্মঘট করছেন। এতে সরকারের হাত নেই। কিন্তু বাস-মিনিবাস শ্রমিকেরা বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাস, বোমাবাজি, হত্যার রাজনীতির কথা বলছেন না। তারা তাদের নিজস্ব সমস্যার কথাই বলছেন।
বিএনপির সভা-সমাবেশ বিনা বাধায় করার আড়ালে অতীতের অগ্নিসন্ত্রাস, বোমাবাজি, বাসে বোমা হামলা, সম্পদ ধ্বংসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বিএনপি থেকে অমূলক বলা হচ্ছে। এ ধরনের আশঙ্কাকে অমূলক, সরকার, সরকারি দলের পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে দাবি করছেন তারা। কিন্তু বিএনপি, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং মাঠে তার সম্ভাব্য প্রতিফলনের আশঙ্কাও হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল এ দিকটি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিতে আন্দোলন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মুরব্বিরা বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিনিধিত্বশীল অবাধ, সুষ্ঠু, প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। এ ব্যাপারে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট করে তাদের সরকারের মনোভাবের কথা দেশগুলোর ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতরা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে সরকার ও নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের ভাষায় বিদেশিদের সন্তোষজনক জবাব দেওয়া হয়েছে। এমনকি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক করতে সরকারের দিক থেকে বিভিন্ন ছাড় দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধান ও আইনের বাইরে সরকারের পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব নয় বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পূরণ করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সরকার তা করবে না। সরকারের এই অনড় অবস্থানের কথা বিএনপিসহ অপর কয়েকটি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের রাষ্ট্রদূতদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি কঠোর আন্দোলন অব্যাহত রাখলে এবং কোনো অঘটন ঘটলে বিদেশিদের অবস্থান কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপি তার সহযোগীদের নিয়ে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাচ্ছে। সরকার, সরকারি দল বিরোধীদের মোকাবিলা, বিশেষ করে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন করবে। সরকার, সরকারি দল সতর্ক থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নীতি নিয়েছে।
বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগও সভা-সমাবেশের কর্মসূচি নিয়েছে। প্রথমে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণার কথা বলা হলেও পরে সরকারি দল তা থেকে সরে এসে দলীয়ভাবে কর্মসূচি নিয়েছে। ডিসেম্বরে মহান বিজয়ের মাসে আওয়ামী লীগ ঢাকায় বিশাল কর্মসূচি পালন করবে। ১০ ডিসেম্বর বিএনপিও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ ধরনের কর্মসূচি হিংসাত্মক হওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও নতুন বছরে বিরোধীদের হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা, সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কঠিন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ নাও হতে পারে। তৃতীয় কোনো শক্তির অশান্ত, নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশে জঙ্গিদের নব-উত্থান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের উগ্রপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা বিএনপির বর্তমান দুর্বল নেতৃত্বের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে, সে সংশয়ও রয়েছে।