যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক উৎপাদন বাড়াতে চান ক্রেতারা

ঠিকানা ডেস্ক : তৈরি পোশাকের ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। কম সময়ে শোরুমে পণ্য পাওয়ার প্রয়োজনে ভৌগোলিক দূরবর্তী অবস্থানে থাকা এশিয়ার দেশগুলো থেকে পোশাক নিতে পশ্চিমা ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সম্প্রতি চীনা পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক্ারোপের পর এ প্রবণতা আরও বেগবান হয়েছে। প্রধান আমদানি উৎস চীনের বিকল্প হিসেবে মার্কিন ক্রেতারা আবার যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শুরু এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। তৈরি পোশাকের শীর্ষস্থানীয় ২০০ ব্র্যান্ডের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের ওপর সম্প্রতি চালানো এক জরিপে দেখা যায়, ১৮০ নির্বাহী নিজ দেশে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পোশাক আমদানি বাড়াতে চান। ২০২৫ সাল নাগাদ এমন পদক্ষেপ কার্যকর শুরু হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড কোম্পানি এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সোর্সিং জার্নাল যৌথভাবে এ জরিপ পরিচালনা করে।পোশাক উৎপাদন কি আবার নিজ দেশে ফিরছে?Ñ শিরোনামে এ জরিপ পরিচালনা করা হয় গত সেপ্টেম্বরজুড়ে। ১৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে ম্যাকেঞ্জির প্রতিনিধি হ্যানড্রিক ম্যাগনাস বলেন, নিজ দেশে উৎপাদন এবং পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানিকে আরও বেগবান করবে চীনা পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও শুল্ক্ারোপের হুমকি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আবার পোশাক উৎপাদনে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করে বাংলাদেশে পোশাক খাতের উৎপাদন ও রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনের সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির গত ২০ অক্টোবর শনিবার বলেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্রে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক উৎপাদন হতো। এখন দেশটি উৎপাদনে নেই। ছিটেফোঁটা কিছু হয়তো উৎপাদন হতে পারে। কারণ, উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশটি পোশাক উৎপাদনে টিকতে পারেনি। নতুন করে ফিরে আসাও সম্ভব নয়। অনেক দেশ চেষ্টা করেও এ ব্যবসায় টিকতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশ কিংবা এশিয়ার অন্য দেশ থেকে পোশাক নেওয়া উৎপাদনের তুলনায় বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি লাভজনক। শেষ পর্যন্ত এটাই বাস্তবতা বলে তিনি উল্লেখ করেন।১৯৬০ সালের দিকে পোশাক কারখানায় মজুরি বৃদ্ধির কারণে কম মজুরির দেশ চীন এবং ব্রাজিলে কারখানা স্থানান্তর করে বড় ব্র্যান্ডগুলো। এ সময় এ দুটি দেশের কাছে উৎপাদনের বাজারও হারায় যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাগুলো।জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ ভাগ নির্বাহীই মনে করেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আমদানি-রফতানির সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ কোম্পানির বিকল্প আমদানি উৎস দেশ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে নির্বাহীদের ৩০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলেছেন। মেক্সিকোর নাম বলেছেন ২০ শতাংশ প্রতিনিধি। জরিপের ফল অনুযায়ী, ইউরোপের জন্য বড় উৎস হিসেবে তুরস্কের নাম উঠে এসেছে।চীন থেকে আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক্ারোপের বিষয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার অনেক আগে থেকেই ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা প্রতিনিধিদের মধ্যে এ ধরনের আমদানি ও আমদানি-বিকল্প চিন্তা কাজ করছে। লিড টাইম বা কম সময়ে শোরুমে পণ্য পাওয়ার প্রয়োজনেই এ আলোচনা শুরু করেন ৪০০ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে পিভিএইচ ও আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। আলোচনায় বলা হয়, পণ্যের নকশা করার পর ক্রেতার শোরুমে পৌঁছানো কিংবা অনলাইনে স্টোরে সাজানোর সময়ের ব্যবধান এখন অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোক্তাদের ফ্যাশন চাহিদা খুব দ্রুতই পরিবর্তন হচ্ছে।জরিপের ফলে বলা হয়, একসময় ফ্যাশন সাইকেল বা পণ্যের নকশা করার পর ক্রেতার শোরুমে পৌঁছানো পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল ছয় মাসের মতো। এখন সেটা ছয় সপ্তাহে নেমে এসেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিতে সমস্যা প্রসঙ্গে নির্বাহীরা বলেন, এতে পরিবহন ব্যয় এবং সময় বেশি লাগে। এ ছাড়া পরিবেশের বিষয়ে সচেতন আধুনিক ক্রেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিও একটা বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে আবার উৎপাদন শুরু করা কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানি বাড়ানো প্রসঙ্গে চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মজুরি বৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এশিয়ার দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কম মজুরির সুবিধাটি এখন আর নেই। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, ২০০৫ সালে চীনের মজুরি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১০ ভাগের এক ভাগ।এখন এই ব্যবধান তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। অর্থাৎ চীন থেকে আমদানিতে অর্থনৈতিক সুবিধা অনেকে কমে গেছে। বাংলাদেশে পোশাক খাতের উৎপাদন ও রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর দাবি, গত ১০ বছরে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ৪০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।তবে এশিয়া থেকে রাতারাতি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে করেন জরিপে অংশ নেওয়া নির্বাহীরা। জরিপে বাংলাদেশের কথা নিন্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করে বলা হয়, যদিও চীন এবং এশিয়ার অন্য দেশে পোশাক উৎপাদনে যে ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও উৎপাদন কৌশল আয়ত্ত করেছে, তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কিংবা অনুসরণ করা অনেক কঠিন হবে। ইউরোপিয়ান সুতা এবং কাপড় শুধু বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা চলে। নতুন করে এখন সুতা কিংবা কাপড় উৎপাদনের কারখানা স্থাপন সময়সাপেক্ষ। বড় ধরনের পুঁজি জোগানেরও বিষয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনে ক্রেতা প্রতিনিধিরা আধুনিক প্রযুক্তিকে ভরসা মনে করছেন।