যেসব অমীমাংসিত প্রশ্ন বাংলাদেশকে আজও বিদ্ধ করে…

জয়া ফারহানা :
ছেচল্লিশ বছর দীর্ঘ সময়। এত দীর্ঘ সময় কোনো রাষ্ট্রই অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক অবস্থানে স্থির থাকে না। বাংলাদেশও থাকেনি। বাংলাদেশেরও কিছু অর্জন রয়েছে। কিন্তু সে অর্জনের সুফল সবাই পাচ্ছে কিনা, শিক্ষা স্বাস্থ্য যোগাযোগ শিল্প কৃষি তথ্য প্রযুক্তি সেবা সবার দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করতে পারল কিনা প্রশ্ন সেটাই। এই যে বহুল আলোচিত নি¤œ আয় থেকে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে প্রমোশন তারই বা কতটুকু ফল পাচ্ছে সর্বসাধারণ? ১৬ ডিসেম্বর রেহমান সোবহান প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, প্রশাসনিক দক্ষতা, সহজে ব্যবসা করার সূচক, দুর্নীতির বিস্তার এসব মানদণ্ডে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা দুর্বল। সুশাসনের অভাব সবাইকে উন্নয়নের সুফল পেতে দিচ্ছে না এবং যদি দুর্নীতি কমানো যেত তবে প্রবৃদ্ধির হার দুই-এর ঘরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।
অর্থনীতি ভালো করছে। কিন্তু দুর্নীতি ভালো করছে তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থায় আপনি পরের অর্থে পদ্মা সেতু করুন আর নিজের অর্থেই করুন তার ফল সাধারণ জনগণের ঘরে পৌঁছবে না। এখনো চার কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে আছে, ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যের মতো একেবারে প্রাথমিক চাহিদাও কোটি কোটি মানুষের চাহিদার নাগালের বাইরে রয়ে গেছে, অপুষ্টির ভয়ঙ্কর রকম সমস্যা রয়ে গেছে, রোহিঙ্গা ইস্যু জান্তব মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু তারও চেয়ে বড় সমস্যা বিভক্তির রাজনীতি। বিভক্তি বিভাজনের চেহারা খারাপ হতে হতে বীভৎস রূপ নিয়েছে। আপনি বলতে পারেন একাত্তরে যে জামায়াতে ইসলাম বর্ণবাদী নাৎসি বা ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যানের মতো বর্ণবাদী দলের ভূমিকা পালন করেছে তাদের সঙ্গে কীভাবে মিলমিশে রাজনীতি সম্ভব? বিভাজনের চেহারা এ পর্যায়ে থাকলে কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু বিভাজন গড়িয়েছে আরো বহুদূর পর্যন্ত। ঠিক যে ২০০১ সালের বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবেই যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেছে, এও ঠিক কিছু যুদ্ধাপরাধীর বিচার সংঘটন মানেই যুদ্ধাপরাধীর রাজনৈতিক মতবাদের মৃত্যু নয়। বিভাজনের রাজনীতি নিয়ে অভিযোগ করলে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সবসময় যুদ্ধাপরাধ ইস্যুই বিভাজনের মূল কারণ হিসেবে বলা হয়। এটা খুবই স্পষ্ট করে জানানো দরকার যে আমরা সব যুদ্ধপরাধের বিচার চাই, যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে তা নিয়েও আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। গণজাগরণ মঞ্চের ভরা কোটালের কালে, গণজাগরণ মঞ্চের জোয়ারের কালে সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি বন্ধ করা হবে বলে বহুবার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছিল। গণজাগরণ মঞ্চের এখন মরা কোটাল, সরকারও প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে এবং আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধের খাস দল ক্ষমতায় থাকাকালীন কীভাবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে ভরে উঠছে তালিকা। খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন হায়দারের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’ গ্রন্থের লেখক কামরুল হাসান ভুঁইয়া অভিযোগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় নামে আমাদের একটি মন্ত্রণালয় আছে যার কাজই হলো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করা।
বিজয় দিবসে আপনি নির্ভার মনে ঘর থেকে বের হতে পারেন? আপনার মনে কি কোনো শঙ্কা কোনো সংশয় কাজ করে না? আপনি বলতে পারেন, কেন নির্ভার মন নিয়ে বের হতে পারব না? এটা তো সেই একাত্তর নয় যে পথের মাঝখানে কোনো পাকিস্তানি সৈন্য বন্দুকের নলের মুখে ‘বোল শালে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বা ‘ভাগ শালে, কাফের কা বাচ্চা ইহাসে’ বলে পিঠে স্টেনগান উঁচিয়ে ধরবে। ঠিক সেই শঙ্কা নেই। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে রিকশা চড়ে আপনি বিজয় উৎসব উদযাপন করতে যাচ্ছেন সেই রিকশার চালক একজন মুক্তিযোদ্ধা নন এবং আপনার রিকশার পাশ দিয়ে যে সর্বাধুনিক মডেলের গাড়িটি বাতাস কেটে কেটে রাজহংসের মতো আপনার রিকশাকে বহুদূর ছাড়িয়ে মাড়িয়ে সাঁই সাঁই চলে যাচ্ছে সেটা কোনো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নয়? এখন সেই দিন যখন মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে মান্যবর সচিব সাহেব চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন। কেনই বা নেবেন না, সচিব সাহেবদের প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধার তালিকা পড়ে দেখেছেন? শুধু প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা নিয়েও যদি ক্ষান্ত দিতেন, তবু বলার কিছু থাকত না কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটার কমিশন ভোগ থেকে শুরু করে যে কোনো ধরন ও মাত্রার দুর্নীতির দক্ষতায় কোন কোন সহকারী সচিব থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব এবং সচিবরাও অবিশ্বাস্য পারঙ্গমতা দেখাচ্ছেন। শুধু প্রশাসনের কথাই বা বলি কেন, মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সার্টিফিকেট এখন এমন এক জাদুদণ্ড যা হাতে থাকলে যে কোনো মনোবাঞ্ছা পূরণ করা সম্ভব। সত্যিই বড় হতভাগ্য আমরা। যে দেশকে জš§ দিতে পাকিস্তানি সেনাদের অকহতব্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, যে অপরিসীম মূল্য দিতে হয়েছে সেই দেশের বিজয়কে কোনো দিন আমরা ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। পঁচাত্তরের পর একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিজয় দিবসে জাতীয় দৈনিকগুলোর সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ‘আজ মহান বিজয় দিবস। একাত্তরের এই দিনে দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নয় মাসব্যপী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।’ তা তো বটেই। ‘দখলদার বাহিনীরই আত্মসমর্পণ’ কিন্তু কোন দখলদার বাহিনী? হ্যাঁ দীর্ঘ একুশ বছর সেই দখলদার বাহিনীর নাম লেখা যায়নি। ভাসুরের নাম মুখে আনা অপরাধের মতো একুশ বছর পর্যন্ত সম্পাদকীয় বিভাগ লিখতে পারেনি এই দখলদার বাহিনীর নাম পাকিস্তান। লেখা যায়নি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে পা রেখে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে প্রস্তুত করেছেন তার নামও। সেন্সরশিপের সেই সম্পাদকীয় পড়ে যেমন আমরা কষ্ট পেয়েছি তেমন এখনো কষ্ট পাই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবিটি দেখেও, যেখানে ভারতীয় জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করছেন জেনারেল নিয়াজী। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর একমাত্র সদস্য এ কে খন্দকারের একটি ছবি কোনোরকম দেখা যায় কি যায় না। কেন ওই ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী নেই? এ কে খন্দকারের লেখা ভেতর বাহিরের গ্রন্থের ৯৯ পৃষ্ঠায় লেখা আছে ‘আমার মনে হয়েছিল ভারতীয়রা প্রথম দিকে যুদ্ধটি শুধু টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, কোনো কিছু অর্জন করতে চায়নি। ভারতীয়দের সহযোগিতার কথা বলতে গেলে বলব তারা সীমান্তে কতগুলো সামরিক ঘাঁটি তৈরি, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু লজিস্টিক সহায়তা এবং হালকা অস্ত্র দিয়ে সাহায্যের বাইরে অতিরিক্ত কিছু করেনি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ’ (পরে ফিল্ড মার্শাল) বিএসএফ প্রধান কে এফ রুস্তমজীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন সীমান্তে তারা ততটুকু ফোর্স চালু রাখবেন যতটুকু পাকিস্তানিরা সহ্য করতে পারে। ভারতীয়দের সেই সময়ের সহযোগিতা মুক্তিযুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ভারতীয় বাহিনী জুলাই মাস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সিগন্যাল সরঞ্জাম দেয়নি। অথচ সিগন্যাল সরঞ্জাম ছাড়া কোনো যুদ্ধই কল্পনা করা যায় না। জুলাই মাস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বার্তা আদান প্রদানের জন্য নিকটস্থ ভারতীয় সেনাবাহিনী বা বিএসএফ-এর সিগন্যাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। ফলে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় অথবা বাংলাদেশ বাহিনীর সদর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ খুব বিঘিœত হতো।’ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু হয় তখন বাঙালি যোদ্ধারা অস্ত্র ব্যবহার জানুক না জানুক তাদের প্রত্যয় ছিল তারা যুদ্ধ করবেই। মান্ধাতা আমলের কিছু থ্রি নট থ্রি, কিছু পুরনো স্টেনগান আর হ্যান্ড গ্রেনেড এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষায় যার যা কিছু আছে তা নিয়েই পাকিস্তানি শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র কৃষক জনতা পেশাজীবী শ্রেণিগোত্র নির্বিশেষে মুক্তিবাহিনীর সামগ্রিক অর্জনই মুখ্য। মেজর কামরুল হাসান ভুঁইয়ার বহুল পঠিত ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’ গ্রন্থে মুক্তিবাহিনীর এই মুখ্য ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা রয়েছে। একটি জায়গায় তিনি লিখছেন ‘মুক্তিবাহিনীর সামগ্রিক অর্জন ও কার্যকরী সহায়তার কারণেই মুখ্যত ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হয়েছে মাত্র আট ডিভিশন সৈন্য দিয়ে পাকিস্তানের পাঁচটি পদাতিক ডিভিশনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া, তাও মাত্র তেরো দিনের মধ্যে। অথচ ভারতীয় সেনা নায়করা কোথাও তাদের বইতে লিখলেন না মুক্তিবাহিনী কীভাবে শত্রুদের অন্ধ ও বধির করে ফেলেছিল, লিখলেন না তাদের পিটি ৭৬ উভচর ট্যাঙ্ক মেঘনা নদী সাঁতরিয়ে পার হতে পারছিল না তখন বাংলাদেশের গ্রামবাসী দেশি নৌকা দিয়ে টেনে এগুলোকে পার করে। কাদার রাস্তায় আশুগঞ্জ-ভৈরবের যুদ্ধে কীভাবে তাদের ভারি মর্টার ভারি সরঞ্জাম গ্রামের লোক বয়ে নিয়ে গেছে তাদের জন্য। রংপুরের বদরগঞ্জে হারিকেন হাতে কীভাবে বাংলাদেশের ছেলেরা ট্যাঙ্কের সামনে হেঁটে হেঁটে ওদের পথ দেখিয়েছে। তারা লিখলেন, ১.৮ : ১ আনুপাতিক হারে তারা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। পাকিস্তানি ও ভারতীয়দের একটি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো প্রশংসা তারা করেননি।’ আত্মসমর্পণের সময় নিয়াজী এ কথার পরিষ্কার প্রমাণ রেখেছেন।
তবুও ভারতীয় বাহিনীই মিত্র বাহিনী, সহযোগী বাহিনী নয়। এই কথায় মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতায় কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে কৃতঘœতার অভিযোগ উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির মধ্যে বিভাজনের অভিযোগও উঠবে। কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি যুদ্ধের কৌশল থেকে শুরু করে নানান বিষয়ে ভারতের সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যেই বিভাজন ছিল। জেনারেল মানেকশ’ চাইতেন অল্প কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে হাজার হাজার গেরিলা সৃষ্টি করা হোক। বিপরীতে পূর্বাঞ্চল কমান্ডের সিজিএস মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব চাইতেন স্বল্প সংখ্যক গেরিলাকে ট্রেনিং দিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হোক। বিভক্তি এবং বিভাজনের আরো নজির দেখছি সেই একাত্তরের যুদ্ধের ময়দান থেকেই।
কলকাতার লর্ডস সিনহা রোডের তাজউদ্দীন-ইন্দিরার মিটিংকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই যে ভালো চোখে দেখেননি তার উদাহরণও আছে। ‘তরুণ নেতা শেখ মণি বলে ওঠেন, আপনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেন কেন? কে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে? এটা কি মন্ত্রী মন্ত্রী খেলার সময়? অপ্রস্তুত হন তাজউদ্দীন। তবে একেবারে অবাক নন। তিনি জানেন শেখ মণি প্রভাবশালী তরুণ নেতা, শেখ মুজিবের আত্মীয় প্রিয়ভাজন। তিনি এও খোঁজ পেয়েছেন শেখ মণি তার সহযোগী তরুণ নেতা সিরাজুল আলম খান, তরুণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে ভারতে এসে তাজউদ্দীনের সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ না করে মুজিব বাহিনী নামে এক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার এক উদ্যোগ নিয়েছেন। শেখ মণি আরো বলেন, এখন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সবাইকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে এবং একটি বিপ্লবী পরিষদ তৈরি করতে হবে। বঙ্গবন্ধু এ রকমই নির্দেশ দিয়ে গেছেন আমাকে। বিরক্ত মর্মামত হলেন তাজউদ্দীন কিন্তু শান্ত কণ্ঠে ওই ক্রান্তিকালে ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে আলোচনার স্বার্থে একটি আইনগত সরকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের কথা বললেন এবং সেই প্রেক্ষিতে তার সঙ্গে ইন্দিরার আলাপের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেন। এ নিয়ে আলাপ চলল দীর্ঘক্ষণ এবং বৈঠকে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ নেতাই তাজউদ্দীনের বক্তব্যকে মেনে নিলেন। মানলেন না শুধু একজন, শেখ মণি। [ক্রাচের কর্নেল : শাহাদুজ্জামান]। আমরা এও জানি শেখ মণি ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব আরেকজনও মেনে নেননি। তিনি খন্দকার মোশতাক। যিনি পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে অভ্যুত্থান এবং হত্যাকারী মেজরদের সূর্যসন্তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। শাহাদুজ্জামান ক্রাচের কর্নেলে লিখেছেন ‘লক্ষ রাখা দরকার বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার সেই ভ্রুণাবস্থায় বিভক্তির বীজ বপন করলেন দু’জন মানুষ। শেখ মণি ও খন্দকার মোশতাক। এর তাৎপর্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে।’ শুধু কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই বিভাজন? সেনাবাহিনীর মধ্যেও কি বিভক্তি ছিল না? কোয়েটায় নজরবন্দি থাকা বাংলাদেশের সেনা অফিসারদের একটি অংশ বহু কষ্টে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে এসেছিলেন বাংলাদেশে, যুদ্ধে অংশ নিতে। অন্য অংশটি আসেননি। কিছু আমলা পাকিস্তান সরকারের অধীনতা অস্বীকার করে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। অন্য আরেকটি বড় অংশ পাকিস্তান সরকারের আদেশ নির্দেশ মেনে রাজাকার বাহিনীকে নিয়মিত ভাতা দিয়ে গেছেন। যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা আমলা এবং পাকিস্তান সরকারকে সহায়তাকারী এই দুই অংশই বা কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করবে? এমনই আরো কত বিভেদ বিভাজন থেকে গিয়েছিল পেশাজীবীদের প্রত্যেকটি অংশে, যা সেদিনও মীমাংসা হয়নি। আজও অমীমাংসিত।
বিপুল ভোটে বিজয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার যে রাজনৈতিক অমীমাংসা থেকে বাংলাদেশের জš§, বাংলাদেশের কপাল থেকে অমীমাংসার সেই দুর্ভাগ্য এখনো ঘোচেনি। আমরা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে কৃত্রিম বুদ্ধির মানবী সোফিয়াকে দেখলাম। আছে ভবিষ্যতে মোবাইল সুপার কম্পিউটিং, চালকবিহীন গাড়ি, নিউরো প্রযুক্তির ব্রেইন, জেনেটিক এডিটিং এবং ড্রোনভিত্তিক নানান কর্মসূচি দিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়ার আশ্বাস। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস আমাদের শতভাগ স্বস্তি দেয় না। বিভক্তি ও বিভাজনের সংস্কৃতি ম্যালথাসের সূত্রমাফিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয় হয় এই বিভক্তি ও বিভাজন শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের কাতারে না দাঁড় করিয়ে দেয়।
লেখক : কলাম লেখক