যে গ্রামে সাঁতারু জন্মে

স্পোর্টস রিপোর্ট : কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সাঁতারু পল্লীর সাঁতারুরা এবারও বাংলাদেশ যুব গেমসে আলো ছড়িয়েছে। গেমসের সাত ইভেন্টের মধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে নিকলীর চার কিশোরী স্বর্ণ ও তিন কিশোরী রুপা জিতেছে। এ গ্রামের প্রতিবন্ধী কিশোর নাদিম মার্চে ইন্দোনেশিয়ায় প্যারা অলিম্পিকে অংশ নিতে যাচ্ছে। যুব গেমসে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সেতু আক্তার দুটি এবং ঈশা মনি একটি স্বর্ণ ও আঁখি আক্তার একটি স্বর্ণপদক এবং সুবর্ণা আক্তার, মীম আক্তার ও মীম সুলতানা একটি করে রুপা পেয়েছে। এ গ্রামের সাঁতারু ও কোচদের দাবি, অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে পারবে। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তাদের বিস্ময়কর সাফল্যে তিনি বিস্মিত।
কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত পশ্চাৎপদ উপজেলা নিকলী। ঘোড়াউত্ররা নদীর তীরে অবস্থিত নিকলী উপজেলার নিকলী সদর গ্রাম শত বছর ধরে সাঁতারুদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এ গ্রামের সাঁতারু কারার মিজান ও কারার সামিদুল সাফ গেমসসহ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জিতেছেন। সাঁতারের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে এ গ্রামে গড়ে উঠেছে ভাটিবাংলা ও নিকলী সুইমিং ক্লাব। এ দুটি ক্লাবে ৩২০ জন শিক্ষার্থী সাঁতার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে ৩০ জন জলকন্যা। আটজন কোচ বিনা বেতনে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
নিকলী সাঁতারু পল্লীর সাঁতারুদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও কৃষক পরিবারের। প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার সামর্থ্য নেই। ইচ্ছাশক্তি আর পরিবার ও ক্লাবের অনুপ্রেরণা তাদের সাফল্যের কারণ। নিকলী সাঁতারু পল্লী সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় প্যারা অলিম্পিকের জন্য মনোনীত মেধাবী খুদে প্রতিবন্ধী স্থানীয় জেসি মডেল হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র সাঁতারু নাদিমের সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাদের সুখ-দুঃখের পাঁচালি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান নাদিম জানায়, ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর সুযোগকে কাজে লাগাবে সে। সে আরও জানায়, এখানে যদি একটি আন্তর্জাতিকমানের সুইমিংপুল থাকত এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হতো, তাহলে এ গ্রাম থেকে আরও অনেক প্রতিভাবান সাঁতারু বেরিয়ে আসত।
কথা হয় গ্রামের ভাটিবাংলা ও নিকলী সুইমিং ক্লাবের কর্মকর্তা ও কোচদের সঙ্গে। জানা গেল, বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারার মোহাম্মদ এনামুল হক ও আবদুল জলিলসহ আটজন কোচ এ সাঁতারু পল্লীর ৩২০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে সাঁতার শেখাচ্ছেন। জানা যায়, বিনা পারিশ্রমিকে তারা প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের আনন্দের নিচেই চাপা থাকে তাদের অভাব-অনটন ও ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ। গ্রামের কৃতী জাতীয় সাঁতারু কারার মিজানের ভাতিজা নিকলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কারার শাহরিয়ার আহমেদ তুলিত তাদের সহযোগিতা করেন। কারার শাহরিয়ার আহমেদ তুলিত জানান, যেখানে সরকার কৃতী ক্রীড়াবিদদের পৃষ্ঠপোষকতায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিকলীতে স্থানীয় প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা সুইমিং ক্লাব থেকে অসংখ্য কৃতী সাঁতারু তৈরি হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াহ্ ইয়া খান জানান, নিকলী সাঁতার পল্লীর সাঁতারুরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। এখানে কোনো সুইমিংপুল কিংবা সাঁতারুদের প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। তিনি আরও জানান, এখানে সরকারি উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিকমানের সুইমিংপুল গড়ে তোলা এবং সাঁতারুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে সাঁতার শিক্ষা প্রদানকে যারা পেশা হিসেবে নিয়েছেন তাদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত। নিকলী সাঁতার পল্লীর প্রতিভাবান সাঁতারুদের উত্তরোত্তর সাফল্যকে বিবেচনায় এনে সেখানে সরকার একটি আন্তর্জাতিকমানের সুইমিংপুল প্রতিষ্ঠা এবং সাঁতারুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ ও কোচদের উপযুক্ত সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা করে তাদের কর্মকা- আরও গতিশীল করবেÑ এ প্রত্যাশা সবার।