রং-তুলির বাংলাদেশ

ড. নাফসানিয়াত ফাতেমা :

অনেক ছোটবেলায় যখন শিশু একাডেমিতে ছবি আঁকতাম, তখন আমার কাছে বাংলাদেশ ছিল মনের মতো রংতুলি দিয়ে আঁকা রঙিন এক দেশ! বিভিন্ন রূপে বাংলাদেশ ধরা দিত আমার রংতুলিতে : সবুজ গ্রাম, নদী, খালবিল, কৃষক, কুঁড়েঘর, খড়ের গাদা, ভোরের সূর্য কিংবা সূর্যাস্ত, মেঘলা আকাশ কিংবা ঝুমবৃষ্টি, কখনো কলসি নিয়ে গায়ের বধূর পানি তুলতে যাওয়ার দৃশ্য, কখনো নৌকাবাইচ, নদীতে পালতোলা নৌকা, গ্রামের হাটবাজার, ধান বোনা বা ধান তোলার দৃশ্যÑএ রকম আরও কত দারুণ সব বিষয়! প্রতিটা ছবিতেই প্রাণান্ত চেষ্টা থাকত কীভাবে দেশটাকে একদম সত্যিকারের মতোই সুন্দর করে রংতুলি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যায়! বাচ্চামানুষের মন, মনে হতো এই ছবিটাই আমার দেশ! ছবিটা দেশের মতোই সুন্দর বা দেশটা আমার আঁকা ছবির মতোই সুন্দর!

ছোটবেলার নিষ্পাপ শিশুর চোখে দেখা ছবির মতো সুন্দর দেশ হারিয়ে গেছে! এখন পরিণত বয়সের পরিণত চোখে শুধু দেশের হাজারো ক্ষত চোখে পড়ে! ১৯৭১-২০২৩Ñস্বাধীনতার/বিজয়ের এত বছর পরেও আমরা কি বুক ফুলিয়ে বলতে পারব আমরা স্বাধীন জাতি? আমাদের কথা বলার, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার স্বাধীনতা কি আছে? আমাদের প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি রাজনীতির নোংরা জালে বেষ্টিত নয়? এই নোংরামি থেকে কি কখনো আমাদের সোনার বাংলাদেশ বের হয়ে আসতে পারবে?

আস্তে আস্তে বড় হতে হতে ইতিহাস পড়তে গিয়ে অনেক কিছু জানলাম! ইতিহাস খুবই বিরক্তিকর সাবজেক্ট ছিল আমার কাছে! কোনো রকম পরীক্ষা পাসের জন্য যা জানা প্রয়োজন, ওইটুকুই শিখতাম আর বইয়ের প্রতিটা কথা সত্য বলেই ধরে নিতাম! মজার বিষয় হলো যখন স্বৈরাচারের পতন হলো, তখন স্কুলে পড়ি। আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার রুটিনে ম্যাথ পরীক্ষার আগের দিন বন্ধ ছিল না, টিচারকে অনেক বলেকয়েও রুটিন চেঞ্জ করা যায়নি। তাই মন খারাপ ছিল। পরে ওই পরীক্ষার দিন হঠাৎ করে হরতাল ঘোষণা হলো। পরীক্ষা পিছিয়ে গেল! স্বৈরাচার কী জিনিস বা স্বৈরাচারের পতন হলে কী হবে, ভালো করে বুঝতাম না। তবে পরীক্ষা পেছানোয় বেশ খুশি লাগছিল, আবার খারাপ লাগছিল এরশাদের জন্য! টিভিতে দিনে-রাতে বেচারার বন্যার গানগুলো শুনতে শুনতে বেচারাকে ভালোই মনে হতো, কিন্তু আব্বু প্রায়ই এরশাদকে খারাপ বলতে শুনতাম। তাতে মনে হতো, এরশাদ হয়তো ভালো নয়! মোটকথা, আমার স্বল্প জ্ঞানে এরশাদ লোকটা ভালো না খারাপ, তখন ঠিক বুঝতাম না!

ওই সময়ে আসলে হরতাল-ধর্মঘট হতো, পেপার-টিভিতে নিউজ হতো, ওইসব দেখেই দেশের ইতিহাস বা দেশের চিত্রটা আমার কাছে বদলাতে শুরু করল! তখন বুঝতে শুরু করলাম, নাহ্্, দেশটাকে আমি ছবির মতো যতটা সুন্দর আর সরল ভাবি, দেশটা আসলে এত সুন্দর নয়! এখানে অনেক খারাপ মানুষ আছে, অনেক গোঁজামিল আছে!

আরেকটু বড় হলাম, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম, হলের জীবন শুরু হলো। ওমা! দেখলাম অনেক কিছুই মিলছে না, একজন এক কথা বলে তো আরেকজন আরেক কথা বলে! চোখের সামনে একটা ঘটনা ঘটে, তখন একটা পলিটিক্যাল গ্রুপ একভাবে বর্ণনা করে তো আরেকটা গ্রুপ আরেকভাবে বর্ণনা করে! গালাগালি করে, মারামারি-খুনোখুনি করে! আমার ছবির দেশের ওপর শুধুই ময়লা পড়া শুরু হলো! অবাক ব্যাপার হলো, ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার পরই কোনো কারণ ছাড়াই আমি ছবি আঁকা একদমই ছেড়ে দিলাম! যেই ছবি আঁকা আমার নেশা ছিল, সেটা লাইফ থেকে পুরোপুরি মাইনাস হয়ে গেল! মনে হয়, এর সঙ্গে সঙ্গেই আমার ছবির সুন্দর বাংলাদেশটাও হারিয়ে যেতে শুরু করল!

শুরু হলো চাকরিজীবন! ওমা, ওখানে আরও নোংরা! চরম শিক্ষিত মানুষেরা নিজের স্বার্থের জন্য কী না করতে পারে, কতটুকু যে নিচে নামতে পারে, সেগুলো দেখতে দেখতে মনটা বিষিয়ে ওঠা শুরু হলো! তত দিনে বুঝে গেছি, ইতিহাস সবই তো মানুষেরই লেখা, যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল তারা তাদের মনের মতো করে দেশের ইতিহাস কাটাকুটি করেছে! দেশকে, দেশের ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানা খুবই কঠিন!
দেশ ছেড়ে বিদেশে এলাম। দেশের জন্য মায়া আরও বাড়তে লাগল! উন্নত দেশের যেকোনো ভালো জিনিস দেখলেই মনে হয়, ইশ্্ যদি নিজের দেশে এ রকম করা যেত! ইশ্্ আমাদের দেশের সিস্টেম যদি এ রকম সুন্দর হতো! কিন্তু শুধুই হতাশা আর হতাশা! এত সুন্দর একটা দেশ, এত যোগ্য মানুষ এখানে, কিন্তু যোগ্য মানুষের কোনো মূল্যায়ন নেই, দেশের আজকালকার খবর শুনলে মনটা একদম বিষিয়ে ওঠে! নোংরা রাজনীতি যে একটা দেশকে, দেশের রাজনীতিবিদদের কে কত নিচে নামাতে পারে, তা এখনকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু ঘোরাঘুরি করলেই পরিষ্কার হয়ে যায়! এই যুগে চোখকান বন্ধ রেখে থাকারও তো কোনো উপায় নেই!

আমি আসলে আমার ছোটবেলাকে, আমার আঁকা ছবির দেশ বাংলাদেশকে খুব মিস করি! ইশ্্ যদি আবার রংতুলি নিয়ে বসে দেশকে আগের মতোই সুন্দর করে আঁকতে পারতাম আর এইটাই যদি হতো সত্যিকারের বাংলাদেশ।

লেখক : গবেষক, শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন ম্যাডিসন।