রম্য: পটিয়ে-পিটিয়ে বামবধের চেষ্টা

মোস্তফা কামাল

রাজধানীতে বামদের এক পশলা পেটাল পুলিশ। সাধারণ মানুষও এতে কষ্ট পেয়েছে। ইশউশ করেছে। তবে পাশে দাঁড়ায়নি। কারণ পরিষ্কার। সবারই জানা, এ দেশের মানুষ বামদের বিশ্বাস করে। কিন্তু পছন্দ করে না। ভোট দেয় না। আবার ধড়িবাজ বুর্জোয়াদের বিশ্বাস করে না, পছন্দও করে না। কিন্তু ভোট দেয়।
সেদিন যে বামদের পুলিশ পিটিয়েছে, তারা নিরীহ। সংখ্যায় গুটিকয়েক। তারা মানুষের কথা বলে। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামাতে চায় না। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখে না। তবু তাদের পেটাতেই হবে? পিটিয়ে-পাটিয়ে হলেও তাদের কবজায় নিতে হবে। আওয়ামী লীগ বা সরকারবিরোধী তৎপরতা থেকে দূরে রাখতে হবে। ভাব-নমুনায় সরকার এতে কামিয়াবি হওয়ার আশা করছে। সরকারের একটি অংশের ধারণা, আপাতত মাইরই বামদের জন্য উত্তম মেডিসিন। মাইরের ওপর ওষুধ নেই বলে বাংলাদেশে একটা কথা চালু অনেক দিন থেকেই।
কেন বামদের এ দশা? কেন মানুষ তাদের আপন করে না? কিছু ইস্যুতে তাদের জাতভাই না হলেও কাছাকাছি দল আওয়ামী লীগও কেন তাদের পিটুনি দেয়? এসব প্রশ্নের জবাব বামদেরই খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্মৃতিচারণা পড়তে পারে। একটি একক আত্মসমালোচনা হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ছেচল্লিশের নৌবিদ্রোহের নায়কেরা কমিউনিস্ট পার্টিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ক্ষমতা নিতে। সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার বদলে পার্টির নেতারা হন্যে হয়ে ছুটছিলেন জিন্নাহ ও নেহরুকে খুঁজতে। এই সময়ক্ষেপণ ও সিদ্ধান্তহীনতা ব্রিটিশদের সুযোগ করে দিয়েছিল বিদ্রোহ দমনের।
এ-যাবৎ ইতিহাস ঘাঁটলে মনে হবে, বামরা কেবল সততা, ত্যাগ, তিতিক্ষার উদাহরণ হয়েই থেকেছে। ক্ষমতা দখল করতে হবে বা ক্ষমতা দখল করা সম্ভবÑএমন ভাবনা ও প্রস্তুতি তাদের কোনো দিন ছিল না। সে কারণে তারা সব সময়ই রাজনীতিতে সাইডলাইনের প্লেয়ার। আর এখন তো ক্ষমতার কথা না ভেবে কখনো হাসিনা, কখনো খালেদার জাকাতের এমপি-মন্ত্রী হয়ে দিন গুজরান করাটাই সবচেয়ে সার্থক রাজনৈতিক লাইন। বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো দিন বামদের এ দেশের বিকল্প রাজনৈতিক ধারা হিসেবে গ্রহণ করেনি, তার পেছনে বামদের এই মানসিক গঠন কি কম দায়ী?
সেলিম সাহেবদের সিপিবি, ইনু সাহেবের জাসদ, মেনন সাহেবের ওয়ার্কার্স পার্টি আর দিলীপ বাবুর সাম্যবাদী দলের মধ্যে মানুষ তেমন তফাত পায় না। আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গেও কি তাদের ফারাক অনেক? আওয়ামী লীগের ভোটাররা নৌকাতেই ভোট দেয়। বিএনপির ভোটাররা ধানের শীষেই ভোট দেয়। বাদবাকিরা স্থানীয় এমপি-নেতা-হাতা-ক্যাডারদের আমলনামা বিবেচনায় নিয়ে ভোট দেয়। হাল বুঝে একসময় কমিউনিস্টের রোমান্টিসিজমে বুঁদ হয়ে থাকা নির্বোধরা এখন চালু জব্বর হয়ে গেছে। তারা ক্ষমতার জেলি ফিশের জন্য আজ ডান-বামে একাকার।
কোনো একটা শ্রেণিকে টার্গেট করে উতাল দরদ, তাদের পক্ষে আবেগ জাগিয়ে তোলার পথে অটুট বামরা। বাস্তবতা হচ্ছে, এই দেশের বৃহত্তর সাধারণ জনসংখ্যা ধর্মের ব্যাপারে, মাদ্রাসার ব্যাপারে, দাড়ি-টুপির ব্যাপারে, কোরআনের হাফেজদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। বিশাল এ জনসংখ্যার হয়ে কথা বলার লাভ আওয়ামী লীগ-বিএনপি ঘরে তুলছে। জাতীয় পার্টিও কম যায় না। জামায়াতের বাজার কিছুটা মন্দা করে দিয়েছে সরকার।
বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর কাছে বামদের আদর নেই। এটা বুঝতে পেরে কিছু বাম আত্মপক্ষ ত্যাগ করেও ঢুকছে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির উঠানে। নিজেরা শক্তিতে রূপ নিতে পারছে না। তাই আর কত অত্যাচার সহ্য করবে, কর্মীদের এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন না কমরেড নেতারা। অবস্থা অনেকটা কৃষ্ণকাব্যের সেই মহান ছন্দ ‘মেরেছো কলসির কানা, তা বলে কি প্রেম দেব না?’-এর মতো। এর উল্টো চিত্র প্রতিবেশী ভারতে। ম্যাজিকটা গোপন নয়। সেখানকার বামশক্তি রাজ্যক্ষমতায় গেছে, পুঁজিবাদী রাজনীতির কানাগলিতে তারাও হাঁটতে শিখছে কমবেশি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।