রম্য: প্রতিশ্রুতির ফলশ্রুতি

মোস্তফা কামাল

শুনতে অদ্ভুত হলেও নির্বাচনের মাঠে কোনো প্রতিশ্রুতিই ফেলনা নয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বুলি, ভাঁওতাবাজি ইত্যাদি নেগেটিভ শব্দে চিহ্নিত করা হলেও ভোটের মাঠে এগুলোর আলাদা ভ্যালু রয়েছে। সেটা বুঝে সেয়ান-চতুর প্রার্থীরা হাল ছাড়েন না। কে, কী বলল সেদিকে না তাকিয়ে তারা সমানে প্রতিশ্রুতি দিতেই থাকেন। এর সুফল-কুফল দুটোই অবধারিত। এ ধারা শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের বড় বড় দেশেও। বিশ্বসেরা এ ধরনের কয়েকজন প্রতিশ্রুতি এক্সপার্টের কথা উল্লেখ করা যায়।
উদ্ভট নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অগ্রদূত বলা হয়ে থাকে ফ্রান্সের ফার্দিনান্দ লপকে। ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি থেকে তিনি পদপ্রার্থিতার কার্যক্রম শুরু করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রথম নির্বাচনে দাঁড়ান ১৯৩৮ সালে। চল্লিশের দশকের শেষ পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। কখনো জিততে না পারলেও পার্সিয়ানদের কাছ থেকে পান ব্যাপক সমর্থন। তারা লপের নামানুসারে নিজেদের ‘লপুলার ফ্রন্ট’ বলে ডাকতেন। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রিন্সেস মার্গারেটকে বিয়ের ঘোষণা দেন, যার ফলে জেল খাটেন লপ।
এ ধারার মার্কিন ব্যক্তিত্ব ভারমিন সুপ্রিম। নিজের প্রকৃত নাম বাদ দিয়ে ‘ভারমিন লাভ সুপ্রিম’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছেন এ নামেই। আশির দশকের শেষের দিকে আমেরিকার জাতীয় নির্বাচনে বেশ কয়েকবার দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তার মতে, প্রত্যেক রাজনীতিবিদই পরজীবী কীট। অর্থাৎ ভারমিন। সেই কীটদের নেতা বলে তিনি ভারমিন সুপ্রিম। সকল মার্কিন নাগরিকের জন্য পনি ঘোড়ার ব্যবস্থা, দাঁত মাজার ওপর আইন প্রণয়ন, বেশি অসুস্থদের হাতে কানাডার বাস টিকিট ধরিয়ে দেওয়া, সময় পরিভ্রমণ বিষয়ক গবেষণার পেছনে অর্থ লগ্নি করা, মানুষের মাংস খাওয়া বৈধ করা, জম্বি অ্যাপোক্যালিপ্সের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির মতো বিচিত্র যত প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়ও হয়েছিলেন ভারমিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আজগুবি প্রতিশ্রুতিদাতার তালিকায় রয়েছেন একজন নারীও। অ্যাডেলিন জে জিও-ক্যারিস নামের এই প্রার্থী ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় থেকে নির্বাচন করেছিলেন রিপাবলিকান দলের মনোনয়নে। আজগুবি হলেও তার প্রতিশ্রুতি ছিল সোজাসাপ্টা। তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনে জিতলে তিনি ৫০ পাউন্ড ওজন কমাবেন। তার ধারণা ছিল, এর মাধ্যমে তিনি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন। ফলে ভিন্ন ভিন্ন স্টেটে গিয়ে সেখানকার ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাদের ইলিনয়ে আসতে রাজি করাতে পারবেন। কিন্তু পারেননি। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে হারেন ডেমোক্রেট প্রার্থী রোল্যান্ড বারিসের কাছে। অবশ্য তার ক্যারিয়ার এমনিতে বেশ সমৃদ্ধ ছিল। ইলিনয়ের রিপাবলিকান সিনেটর হয়ে কাজ করেছেন প্রায় ২৫ বছর।
হান্টার এস থম্পসন নামে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর এক সাংবাদিক ১৯৭০ সালে শেরিফ পদে নির্বাচিত হতে ‘ফ্রিক পাওয়ার’ নামের একটি অদ্ভুত ক্যাম্পেইন করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যাসপেন শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘ফ্যাট সিটি’ রাখা, পুলিশ এবং ডেপুটিদের অস্ত্রবিহীন চলাফেরার আইন প্রণয়ন, মাদক বিক্রেতাদের শেয়ার কেনার অনুমতি দেওয়া, শহরের সব পাকা রাস্তা গুঁড়িয়ে দিয়ে কেবল পায়ে হাঁটা আর বাইসাইকেল চালানোর নিয়ম করা ইত্যাদি।
মজার ব্যাপার, নির্বাচনে হান্টার পরাজয়বরণ করেন খুবই সামান্য ব্যবধানে। এটি তার কাছে ছিল প্রায় জয়ের মতোই। তার এই বিচিত্র ক্যাম্পেইনকে কেন্দ্র করে ‘হাই নুন ইন অ্যাসপেন’ নামের একটি ডকুমেন্টারিও নির্মিত হয়েছে। তার বই ‘ফিয়ার অ্যান্ড লোথিং ইন লাস ভেগাস’ এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জনি ডেপ, ব্যক্তিগত জীবনেও তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর রাজনীতিবিদ ডেনিস কুসিনিচ ১৯৭৭-৭৯ সাল পর্যন্ত ক্লেভল্যান্ডের মেয়র ছিলেন। ২০০৪ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ডেমোক্রেটিক দলের হয়ে প্রেসিন্ডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর মনোনয়নের আবেদন করে ব্যর্থ হন। একাধিকবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করার চেষ্টা করে গেছেন। দিয়েছেন গ্রেপ্তারের হুমকিও। তিনি বারবার বুশ প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন এ ব্যাপারে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর আসামিদের যেই ‘মিরান্ডা রাইটস’ শোনানো হয়, সে সম্পর্কেও ভালোমতো জেনে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যান্য প্রতিশ্রুতিকে ছাপিয়ে এই বিষয়টিই হয়ে উঠেছিল তার ক্যাম্পেইনের মূল প্ল্যাটফর্ম।
উদ্ভট প্রতিশ্রুতির রাজনীতিকের তালিকায় আসে অ্যান্ডি ক্যাফ্রের নামও। তিনি ২০১২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসের পদপ্রার্থী ছিলেন। মূলত পরিবেশদূষণ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তার। তবে একবার সভায় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসেন, নির্বাচনে জিতলে ক্যাপিটাল হিলে সবার সামনে মারিজুয়ানা সেবন করবেন। এ নিয়ে স্থানীয় মিডিয়ায় সাড়া পড়ে যায় দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট নির্বাচন নিয়ে। ক্যাফ্রে পরে স্বীকার করেন, এটাই তার উদ্দেশ্য ছিল। জাতীয় পর্যায়ে মেডিকেল মারিজুয়ানার বৈধতাকরণের ইচ্ছাও ছিল তার। নিজেদের এই অধিকার আদায়ের জন্য জেল খাটতেও রাজি ছিলেন তিনি। তার এমন দৃঢ়তায় মুগ্ধ হন অনেকে। কিন্তু জিততে পারেননি নির্বাচনে।
যুক্তরাষ্ট্রে একাধারে রেডিও উপস্থাপক, ব্যবসায়ী এবং কলাম লেখক ছিলেন হারম্যান কেইন। সব তিনি চাইতেন কম কথায় কাজ শেষ করতে। সেই আলোকে তিনি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে বলেন, ৩ পৃষ্ঠার থেকে লম্বা কোনো বিল তিনি সংসদে পাস করতে দেবেন না। পরবর্তী সময়ে অবশ্য যৌন হয়রানি বিষয়ক বিতর্কিত কিছু কারণে রিপাবলিক পার্টি থেকে অস্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল তাকে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন