রম্য: বাঙাল হাইকোর্ট দেখতে বাধ্য

মোস্তফা কামাল

কে যে বলেছিলেন ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখিয়ে লাভ নেই। বাঙাল হাইকোর্টে ভয় পায় না’। সময় পাল্টেছে। ভয় পাক, না পাক বাঙালকে এখন হাইকোর্ট দেখতে হচ্ছে। শিখতে হচ্ছে আইনও। তাদের হালনাগাদে আইন জানা হলো-মাতাল অবস্থায় খুন-ধর্ষণ-অপরাধ করলে শাস্তি কম হয়। শাসকদলের হোমরাচোমরা বা তাদের সন্তান হলে খুন করেও গুরুদ- থেকে আইনগতভাবেই নাজাত পাওয়া যায়। যদিও বছর কয়েক ধরে আজব কিসিমের প্রবাসী এক ফেসবুক তারকা শিফাত উল্লাহ ওরফে শেফুদা নিয়মিত বলে আসছেন, মদ খা বাঙালি মানুষ হবি। তার এই বচন বেশ আলোচিত এ জেনারেশনে।
আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি পিনু খানের ছেলে রনি ডাবল মার্ডার করেও ফাঁসি থেকে বেঁচে গেল মদের সুবাদে। ডাবল মার্ডার করেও মৃত্যুদ-ের বদলে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তাকে। মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় খুন করায় মৃত্যুদ-ের পরিবর্তে তাকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। এ যাবজ্জীবন থেকেও বাঁচার ব্যবস্থা রয়েছে। মহামান্যের সাধারণ ক্ষমায় খালাসের জন্য একটু অপেক্ষা করতেই হয়।
কেউ কেউ রসিকতাচ্ছলে বলছেন, এমন রায়ে এখন থেকে খুন করার আগে মদে মাতাল হয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রাখার একটা প্রেরণা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, ড্রাইভার কমিউনিটি লুফে নিতে পারে চান্সটা। সড়ক-মহাসড়কে গাড়িচাপায় মানুষ মেরে বলতে পারবে, মাতাল ছিলেন তিনি। শোনা যায়, পোস্টমর্টেম করার আগে ডোমেরা মদ খায় আচ্ছামতো। ময়লা ফেলার আগে মেথররাও তা করে। আবার ফাঁসির জল্লাদকেও প্রয়োজনে মদ খাওয়ানো হয়। দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে সম্পাদন করাতেই এমন মদ্যপান। কারও কারও মতে, এগুলো রঙ্গভরা বঙ্গদেশের টুকটাক রঙ্গ। আইনাঙ্গনও এর বাইরে নয়। কার্যত এ বঙ্গে আইন যে সবার জন্য সমান নয়, এ ধরনের ঘটনা তারও প্রমাণ।
বাঙাল এমন নিয়মিত আইন শিখছে। হাইকোর্ট দেখছে। ফিল্টারিং হলেও এগুলোর টুকটাক খবর আসছে গণমাধ্যমে। সুনামগঞ্জের ভিক্ষুক তারা মিয়া, ঘাটাইলের আজিজ মুন্সিদের কোর্ট-কাছারি চেনার জেরে তাদেরও চিনছে মানুষ। নইলে জানা হতো না প্রতিবন্ধী হয়েও রামদা, হকিস্টিক এবং লোহার রড দিয়ে সুনামগঞ্জে পুলিশের ওপর প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক তারা মিয়ার হামলার খবর। এ মর্মে পুলিশ মামলা ঠুকে দিয়েছে প্রতিবন্ধিটার বিরুদ্ধে। জামিন নিতে হাইকোর্ট দেখেছে তারা মিয়া। আতর বিক্রেতা হাতকাটা ইউসুফও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। গায়েবি মামলায় এ ধরনের বাঙালদেরও প্রতিপক্ষ করে হাইকোর্ট দেখিয়ে ছাড়তে সরকার তথা পুলিশ সফল হয়েছে।
তাদের কেউ বয়সে কাবু, ভিক্ষা বা দিনমজুরের কাজ করে। কারও চলাফেরার সামর্থ্যই নেই। খেপে সংগঠিত হয়ে কিছু করার চিন্তাও অবান্তর। যদিও সংখ্যায় তারা মিয়া, আজিজ মুন্সি, ইউসুফরা শয়ে-শ, হাজারে-হাজার, কাতারে কাতার। এখানে আবেগ-অনুভূতির ফাংশন একেবারে ভোঁতা। হাইকোর্ট চেনা তাদের অবধারিত। অনিবার্য নিয়তি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন