রাজনীতিতে পলিটিক্স ঢুকে পড়েছে

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-৩১)


শামসুল আরেফিন খান

কথায় বলে ধারে না কাটলে ভারে কাটে। একটা হ’ল গুণগত ব্যাপার। অন্যটা পরিমাণগত। বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে ধারও লাগে ভারও লাগে। ধারালো ব্লেড দিয়ে বট গাছ কাটা যায়না। তার জন্যে ধারযুক্ত এবং ভারযুক্ত করাত লাগে। তলোয়ার দিয়ে তেমনি গলা কাটা যায় কিন্তু দাড়ি কাটা যায়না। যুদ্ধ এবং রাজনীতিতে বিষয়টা আরও প্রাসঙ্গিক।
রাজনীতিতে যুদ্ধ আছে। যুদ্ধের রাজনীতি আছে। আরও গভীরে গেলে দেখা যায় যুদ্ধের পুরোটাই রাজনীতি। রাজনীতিও শতভাগই যুদ্ধ। রাজনীতিকে তাই বলা চলে রক্তপাতহীন যুদ্ধ। যুদ্ধকে বলা হয় রক্তপাতময় রাজনীতি। জনবল ধনবল অস্ত্রবল মন্ত্রবল ও সূক্ষ্ম রণকৌশল এবং অটল মনোবলই হলো যুদ্ধের সব চেয়ে বড় সম্বল। রাজনীতির উপাদানও এখন তাই। জীবন প্রারম্ভে শুনেছিলাম জেনেছিলাম ও বুঝেছিলাম যে আত্মত্যাগ ও জীবন উৎসর্গই রাজনৗতির সব থেকে বড় চাওয়া। প্রধান চাহিদা এবং সেরা দীক্ষা। মণিসিং, অমল সেন, মওলানা ভাসানি ও শেখ মুজিবুর রহমান বড় দৃষ্টান্তরূপে ভাস্বর ছিলেন। অনুকরণীয়, বরণীয় ও স্মরণীয় ছিলেন আরও শত শত ত্যাগী মানুষ। তাঁদের কথা শুনেছি। তাঁদের কথা পড়েছি। তাদের অনেককে দেখেছি কৈশোরে ১৫ বছর বয়সের অনধিক একমাস কারাজীবনে। আন্দামান ফেরত অনেক আজীবন কারাবাসীর সান্নিধ্য পেয়েছি সে সময় জেল হাসপাতালে সংক্ষিপ্ত অবস্থানে। সেখানে তাঁদের মাঝে খুঁজেছিলাম আমার কুন্তলদাকে। মনোজবসুর বিবরণে অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষদের মধ্যে সেই প্রিয় মানুষটির সন্ধান পেয়েছিলাম।” ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেলো যারা জীবনের জয়গান, কুন্তলদা ছিলেন তাঁদেরই একজন। তাঁর বাল্যসাথী নীরব প্রেয়সীর বুকফাটা ক্রন্দন : “ আজও তোমাকে ভুলিনি কুন্তলদা= , তোমাকে ভুলবো না কোনদিন। ” আমার তরুণ মনে ছিল অনুখন সেই বোবা কান্নার অনুরণন। সে সুর হারিয়ে গেছে।
এখন সে সব সূত্র ও সংজ্ঞা বদলে নতুন সূত্র ধরে রাজনীতি পথ চলছে। বলা যায় সেই ত্যাগের রাজনীতি ইদানিং চন্ডনীতিতে পরিণত হয়েছে। তখন জেনেছিলাম যে যত বড় ত্যাগী সে ততো বড় নেতা। এখন দিন শেষে শুনছি যে যতবড় ভন্ড দুর্বৃত্ত সেই গডফাদার। এ কথাই হোসেন মহাম্মদ এরশাদ আমাকে তার সাথে ঘটে যাওয়া প্রথম ও শেষ সাক্ষাতকারে নরম সুরে চড়া গলায় বলেছিলেন,“লেখেন ভালো, বলেন ভালো, জানেন ভালো, কিন্তু একটা কথা বুঝেন না যে, একশ’হুন্ডা, দু ‘শগুন্ডা না হলে ভোট জোটে না। সে জন্যেই আমার আমলে বার বার জেল খেটে সৎ থেকে নির্বাচন জিততে পারলেন না”।
দুর্জনে যাই বলুক না কেন, রাজনীতির একটা বাড়তি চাহিদা হ’ল চরিত্রবল ও দার্শনিক দিকনির্দেশনা। ত্যাগ ও উৎসর্গের চাহিদা দুটোতেই সমান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের মরণসঙ্গী গোয়েবলস আর একটি নতুন উপাদান যোগ করেছেন তাতে। সেটা তার নামেই খ্যাত। আমরা তাকে চিনি গোয়েবেলসীয প্রপাগান্ডা নামে। ইদানিং মিডিয়া তার বিকল্প। পণ্যের কাটতি ঘটে প্রচারে বটে। যুদ্ধে জয় হয় প্রপাগান্ডায়। একটা মিথ্যা দশবার বললে সেটাই সত্য হয়ে ওঠে। প্রপাগান্ডার আর এক নাম তাই মিথ্যাচার। এই তত্ত্বের জনক গোয়েবলস যিনি মিথ্যার রাজা।
সত্যের সাথে ভন্ড রাজনীতি বা নষ্ট পলিটিক্স ঢুকে পড়লে সেখানেও মিথ্যাচার ঘর বানায়। মিথ্যার অনুপাত ও অনুপ্রবেশ যতই অকিঞ্চিতকর হোক না কেন তা সত্যের অপলাপ বই কিছুনা। মহাভারতে সত্যের রাজা ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির নতুন প্রজন্মের মহাবীর অভিমন্যুর প্রাণ বাঁচাতে নিরুপায় হয়েই বিন্দুবত মিথ্যাচার করেন। সে জন্যেই তাঁকে সশরীরে স্বর্গ যাত্রার পথে এক পলক নরক দর্শন করতেই হয়।
গোয়েবলস শিখিয়েছেন সেই মিথ্যাচার যা লাগাতার উচ্চারণে সত্য বলে ভ্রম হয়। সোভিয়েত বাহিনী তখন বার্লিন ঘিরে ফেলেছে। হিটলার নিজের বাঙ্কারে কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে রেখেছেন। সদ্য পরিণীতা প্রেমিকা -পতœী ইভা বিষপান করে অম্লান বদনে চিরনিদ্রায় শায়িত। তখনই জার্মান রেডিওতে ঘোষণা শোনা গেলো, গোয়েবলস বলছেন, ফুরোর হিটলার স্বয়ং সম্মুখ সমরে। ‘হানাদেরদের পরাজয় সময়ের ব্যাপারমাত্র’। অথচ পাশের ঘরেই তখন গোয়েবলস স্বয়ং তার পতœী ও চার শিশুকন্যাকে মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করে নিজেও প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। স্ত্রী ও মেয়েরা বাঁচতে চেয়েছিল। গোয়েবলস নাকি বলেছিলেন, ‘যে পৃথিবীতে ফুরোর হিটলার জীবিত থাকবেন না সেখানে আমার কন্যারা বেঁচে থাকুক সেটা আমি চাই না ‘। দলের প্রতি, দর্শনের প্রতি, দলপতির প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার এমন নজির সত্যিই বিরল। যুদ্ধ ও রাজনীতি তখন একসাথে ক্রিয়াশীল ছিল্। বুঝে বা না বুঝে নির্বোধরা অনেকেই বলে থাকে ‘রাজনীতিতে পলিটিক্স ঢুকে পড়েছে। ভাবটা এমন যে রাজনীতি একটা সত্য, সৎ ও নীতিনিষ্ঠ সরল রেখা। আর পলিটিক্স হ’ল অসাধু লক্ষে একটা এবড়ো খেবড়ো কন্টকিত পথচলা।
আমাদের দেশে যেটা দৃশ্যমান, অন্য দেশে হয়ত সেটা অদৃশ্য বাস্তবতা। এ আলোচনার যেমন কোন শেষ নেই, তেমনি দৃষ্টান্তেরও কোন অভাব নেই।
আমি ভাবছিলাম একটা তারিখের কথা। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেটা দুবার লেখা হয়েছে মোটা লাল দাগে। রক্তের রেখায়। সেই তারিখটা হল ২৪ জানয়ারি। একবার সেই রক্তস্নাত দিবস এসেছিল ১৯৬৯ সালে। আর একবার আসলো ১৯৮৮ সালে। মহান আত্মত্যাগের ইতিহাসে দুটো দিবসই মহিমান্বিত। কিন্তু কার্যতঃ দুটো তারিখই নষ্ট পলিটিক্সের ক্যাপসুলে ঢুকে রাজনৈতিক দিনপঞ্জী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমি ভেবেছিলাম রাজনৈতিক পরম্পরায় প্রাসঙ্গিক হওয়ায় ২০১৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ২৪ জানুয়ারি রক্তস্নাত শহীদ দিবস হিসাবে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালিত হবে। কিন্তু পরম বিস্ময় ও গভীর মর্মতাপের সাথে লক্ষ্য করলাম যে দিবসটি সরকারিভােেবই পালিত হয়েছে যথেষ্ট আড়ম্বরে সাথে, তবে শহীদ দিবস হিসাবে না। পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হিসাবে। প্রজন্ম জানেই না ১৯৬৯ এর ২৪ জানুয়ারিই কী ঘটেছিল ? আর ১৯৮৮ সালেই বা কী হয়েছিল ? প্রজন্মের জানা উচিত ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কী গুরুত্ব রাখে। জানা উচিত গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি মহান স্বাধীনতা অর্জন করেছে। জানা উচিত গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদুজ্জামান, শহীদ, মতিউর রহমান এবং মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খা ভাসানীর অবদানের কথা। জানা উচিত ৬-দফা, ১১ দফা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং আগরতলা মামলার সাথে গণঅভ্যুত্থানের প্রাসঙ্গিকতার ইতিহাস। বিশেষভাবে জানা উচিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘রাজনীতির কবি’ অভিধা প্রাপ্তি এবং তাঁর পিতৃতুল্য রাজনৈতিক গুরু ভাসানীর ‘প্রোফেট অফ ভায়োলেন্স বা ধ্বংসের নবী’ উপাধি লাভের তাৎপর্য ও গুরুত্বের কথা। প্রজন্ম জানে জাতির জনক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ বন্দী ছিলেন। প্রজন্ম জানে সে মামলার আসল কথা। কিন্তু প্রজন্মের জানা উচিত ‘ষড়যন্ত্র মামলা’ না ‘মামলার ষড়যন্ত্রের’ কথা। বিশেষভাবে জানা উচিত ৬-দফা এবং ১১-দফার রাখি বন্ধনে যে ‘প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ঐক্য’ গড়ে উঠেছিল তার কথা। তবেই প্রজন্ম জানবে ও বুঝবে কেন এবং কীভাবে ৯ মাসে ‘রুশ-ভারত সহায়তায়’ ১৬ ডিসেম্বর ‘৭১ মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ফিরে গিয়েছিল মার্কিন ৭ম নৌবহর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণ মাত্র কয়েকঘন্টা বিলম্বিত হলেই মার্কিন সমর্থনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ হত। তাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হওয়া অবধারিত ছিল। অবশম্ভাবী ছিল ভারতের পূর্বাঞ্চলে আর একটি আজাদ কাশ্মীর সৃষ্টি হওয়া। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরণ সিং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের খবর বলার সাথে সাথে অপেক্ষমান পাকিস্তানী বিশেষ দূত ‘ মরদে মোমিন’ শাহ আজিজুর রহমান মাথার চুল ছিঁড়তে শুরু করেছিলেন। নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ফাইল ছিঁড়ে কান্না করে বেরিয়ে এসেছিলেন। এসব না হলে জাতির জনক কী ১০ জানুয়ারি’৭২ সপ্রাণ বাংলার মাটিতে ফিরে আসতেন ?
১৫ আগস্ট ৭৫ এরপর ২১ বছর ইতিহাস বিকৃতির ঝড়ে প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়েছে। অনেক অবান্তর প্রশ্নে বাহুল্য বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি জাতির যে সমূহ ক্ষতিসাধন করেছে সেটা আর পূরণ করা সম্ভব না। ১৬ ডিসেম্বর ৭১ জাতিসংঘে যে নাটকটা মঞ্চে ওঠার আগেই ফ্লপ মারলো তার কুশীলবরাই যে ১ ৫ আগস্ট ট্রাজেডির প্রযোজক উপস্থাপক ও পরবর্তী ইতিহাসের খলনায়ক সে কথা আজ আর কারও অজানা নেই। তবে তাদের জ্যোতিষী কুষ্টিনামা বা হরোস্কপ এবং তাদের জন্মলগ্নে বৃহস্পতির সংযোগ সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই প্রজন্মের। তাদের ‘ফ্যামিলি ট্রি’র উৎস, বিকাশ ও বিস্তার সম্পর্কে সবার ধারণা পরিষ্কার না। ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের সোনালী ফসল জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের উজ্জ্বল উদ্ধার এবং বঙ্গবন্ধু নামখচিত মনিহার প্রাপ্তি। “হীরা মুক্তা মাণিক্যের ঘটা যেন ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা “। চিরন্তন মুজিবের‘ বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা এবং সেই মণিহার থেকে ১১ দফার চুনিপান্না হারিয়ে যাওয়া অনেক তাৎপর্য ভরা একটা গম্ভীর ঘটনা। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু মুজিব দৃশ্যমান ছিলেন না তাঁর নির্দেশনায় সৃজিত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। সেই সুযোগে কোলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে বসে ধনবান জহুরুল কাইয়ুম ও খন্দকার মুশতাক যৌথভাবে লিখলেন নতুন নাটকের পান্ডুলিপি। হেনরি কিসিঞ্জার দিলেন দিক নির্দেশনা। এখনও তারই পর্যায়ক্রমিক ও ধারাবাহিক মঞ্চায়ন চলছে। কখনও অলক্ষে। কখনও প্রকাশ্যে। একথা কী জানে প্রজন্ম?
রাজনীতি যখন রাজা রাজড়াদের হাতের ক্রীড়নক ছিল তখন তাতে শঠতা ছিল, ভ্রষ্টাচার ছিল। ভাওতাবাজি ছিল। তাজমহল যেমন একটা ‘পবিত্র প্রেমের নামে সম্রাট শাহজাহানের রাজকীয় ভাওতাবাজি ’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত তাতে ধোঁকা খেয়েছেন। সম্রোটের প্রেমে আস্থা রেখে শাহজাহান কবিতায় মনের চিন্ময় আবেগ ঢেলে দিয়েছেন।“তাজমহলের পাথর দেখেছ/ দেখেছ কী তার প্রাণ/ অন্তরে তার মমতাজ নারী/ বাহিরেতে শাজাহান”.।” কিন্তু হালে প্রজন্ম জেনেছে শাহজাহানের ভন্ড প্রেমের ইতিকথা ও ইতিকথার পরের কথা। তার ১৪টা বিয়ে করার কথা এবং মমতাজের মৃত্যুর পর কালবিলম্ব না করে তার রূপসী বোনকে নিয়ে শিষ্টাচারহীন ফষ্টিনষ্টির কথা।
একজন খুব নামকরা ঘরাণার নামজাদা ভাগ্নার কথা মনে পড়ে। বুদ্ধিজীবী হওয়ার বাসনা নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার সুযোগ চেয়েছিল। মাণিক মিয়া তাকে একটা বিষয় নির্বাচন করে দিয়ে সম্পাদকীয় লিখতে দিলেন। সে সময় মাণিক মিয়ার চার জন সহসম্পাদকই ছিলেন নামকরা কম্যুনিস্ট। কিন্তু মাণিক মিয়ার কাছে তারা নখ-দন্তহীণ পোষা বাঘ। সার্কাসের বাঘের মত। হাঁকডাক ও ‘হালুম’টাই ছিল। থাবা ছিল ভোতা। ভাগ্নার কথা ছিল, “কম্যুনিস্ট পুষতাছেন মামা। হেগো বিশ্বাস কী?”
হামবড়া ভাগ্নার কথায় মাণিক মিয়া একটু মাথা চুলকালেন। তারপরে বললেন, দেখি তো কী লিখলি ৫ ঘন্টায় ? লেখাটা পড়ার পর মাণিক মিয়ার গ্যাস্ট্রিক -ব্লাড প্রেসার বড়ে গেলো। হাঁক ডাক শুরু করলেন। তারপর ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, যা ওনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়। সে বেচারির স্বপ্নভঙ্গ হ’ল। চরম বাম বিদ্বেষী মাণিক মিয়া বলতেন আমার তো পরিমাণগত জঞ্জাল দরকার নেই। আমার দরকার গুণগত উৎকর্ষ। একমণ লোহা দরকার নেই। আমার দরকার একবিন্দু কাচকাটা হীরে।।
৬৯ সালের বামগণতান্ত্রিক মেরুকরণ মুছে ফেলতে অবদান রেখেছিলেন সেই ‘বিফল মনোরথ ভাগ্নে। তারই পরিণাম ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ইতিহাস। ২০০১ নভেম্বর থেকে ২০০৭ এর রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট। হাসিনাকে টার্গেট করে ২১ এপ্রিল ২০০৪ এর পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ এর লালদিঘীর গণহত্যাও হয়ত কাইয়ুম- মুশতাকের রূপকল্পেরই অংশ। সে সময় ক্ষমতায় ছিলেন স্বৈরাচার এরশাদ। শেখ হাসিনার ১৫ দল থেকে বাম শরীকরা বেরিয়ে গিয়ে ৫ দল গঠন করেছে। ৮৬ সালে সামরিক শাসন রেখে এরশাদের দেয়া সংসদ নির্বাচন তারা বর্জন করেছে। হারাধনের ৭ ছেলে নিয়ে আওয়ামি লীগ নেত্রী “দিল্লীকা লাড্ডু ” খেয়ে পস্তাচ্ছেন। “দিল্লীকা লাড্ডু জো খায়া উয়ো ভি পস্তায়া, জো নেহী খায়া উয়ো ভি পাস্তায়া”। ১৯৮৬ সালের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিজয়ী ১০০ সাংসদ ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করায় সংসদ ভেঙ্গে গেলো। এরশাদের ‘স্বাদ না মিটিল আশা না ফুরিল ‘ গানের প্রেক্ষায় ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ চট্টগ্রাম লালদিঘী ময়দানে আওয়ামি লীগের নিবেদিত নেতা কর্মীরা জীবনবাজি রেখে মুহুর্মুহু গুলির মুখে মানব ঢাল রচনা করে শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি থেকে রক্ষা করলো।
ভোট থাক আর নাই থাক, বামশক্তিই আওয়ামি লীগের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক মিত্র।‘একলা চলো’ নীতি আওয়ামি লীগকে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বার বার মিত্রহীন করে ফেলেছে। ৫৭ সালে বামশক্তিকে বিতাড়িত করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেবল ক্ষমতাই হারাননি, ধনে প্রাণে নিঃশেষ হয়েছেন। ৭১ সালে বামগণতান্ত্রিক ঐক্যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ৭৩ সালে বুর্জোয়া সাথীদের নিয়ে একলা চলার পরিণাম ১৫ আগস্ট ‘৭৫ এর করুণ ইতহাস রচনা করেছে। সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় আওয়ামি লীগ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বার বার বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটিয়ে অপশক্তির ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে প্রলয়সঙ্গী হয়েছে।
ভারতের কংগ্রেস নেহেরু -ইন্দিরা উত্তর যুগে বামবিচ্ছেদে চূড়ান্ত সর্বনাশের মুখ দেখেছে। পশ্চিম বাংলায় তিনযুগ ক্ষমতাসীন সিপিএম সরকারের পতন ঘটিয়ে ভারতীয় কংগ্রেস খাল কেটে কুমির এনেছে। সোনিয়া গান্ধী বিজেপিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। সিপিআইর কোন ভোট ছিলনা। তবু তারাই ছিল কংগ্রেসের অকৃত্রিম মিত্র। ইন্দিরা যেখানে যেতেন নির্বাচনী সফরে, সেখানেই গাই-বাছুরের ছবি ওয়ালা পোস্টারে সয়লাব হয়ে যেত। সচিত্র পোস্টারে লেখা থাকতো-“দিল্লী থেকে এলো গাই, সাথে বাছুর সিপিআই”। এতে কংগ্রেস বা সিপিআইর কোন মানহানী বা লজ্জার কারণ ঘটেনি। মিত্র মিত্রই। শিকারির জালে ফেসে থাকা সিংহকে জাল কেটে মুক্ত করে যে পরম মিত্র শিশুতোষ গল্পে উপমা হয়েছে সে তো অতি ক্ষুদ্র প্রাণী মুষিক। পরিমাণগত অবয়ব বিবেচনায় রেখে যে তার মূল্যায়ন করবে সে অতি মূর্খ বই কিছু নয়। একাত্তরে মনিসিং ও প্রফেসার মোজাফ্ফর আহমদ সোভিয়েত দূতাবাসে দৌড়াদৌড়ি করে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদেরও ভোট ছিল না। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে সপরিবারে নিজের ব্যক্তিগত মেহেমান হিসাবে দিল্লী নিয়ে গেলেন। তাঁর চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা করলেন। পিতা জওহররাল নেহেরুর ব্যক্তিগত বন্ধু বলে কথ্া। পাকিস্তানের পদলেহী শরমেয় যাদুমিয়া প্রচার করলেন মওলানা সাহেবকে সন্তোষ থেকে হাইজ্যাক করে এনে দিল্লীতে আটকে রাখা হয়েছে। আসলে এ কথা ঠিক যে, যাদু মিয়া এবং রাও ফরমান আলী ২৫ মার্চ মধ্যরাতে সন্তোষে পৌঁছে মওলানা সাহেবের কুড়েঘরে ঢোকার আগেই ভাসানী তাঁর সমস্ত পরিবার সমেত যমুনা নদীতে নৌকা ভাসিয়ে শত শত নৌকার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ায় ভূট্টো-যাদুর বাড়া ভাতে ছাই পড়েছিল্। মওলানা সাহেব আসাম সীমান্তে ঢুকেই যে অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তাতে তিনি হকচকিয়ে যাননি। কারণ মুজিব যাবেন পিন্ডি আর ভাসানী যাবেন দিল্লী সেটাতো আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। মুজিব আশঙ্কা করেছিলেন এবং ভূট্টো আশা করেছিলেন যে ভারতের হস্তক্ষেপ রুখে দেয়ার জন্যে চীনের পিপীলিকা বাহিনী হিমালয় দিয়ে পিল পিল করে নেমে আসবে। সেই স্বপ্ন নিয়ে বেকুব ইয়াহিয়া ৩ ডিসেম্বর ৭১ পশ্চিম ভারতে বিমান হামলা করে ইতিহাসের যে গভীর খাদে লাফিয়ে পড়েছিল সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। বার্তাটি পেয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন,“বেকুবটা ঠিক তাই করেছে যা আমি ভেবেছিলাম।” ইন্দিরা তখন কোলকাতার কাজ সেরে দিল্লীর পথে বিমানে ছিলেন। তাঁর একান্ত সচিব এসব লিখেছেন। আমিও দুয়ে দুয়ে চার এর অংক মিলাতে পেরেছিলাম। কারণ ১ ডিসেম্বর ভোরে আমি বিশেষ ব্যবস্থায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী অংশের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম আসামের করিমগঞ্জ থেকে। মুক্তিবাহিনীর ৪ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর সি আর দত্ত এবং এমএনএ ফরিদ গাজী সেই গোপন অভিযানে আমার সহযাত্রী ছিলেন।
আসলে ভাসানী-ইন্দিরা কলকাঠি নাড়ায় পাকিস্তানী হানাদারদের আশার গুড়ে বালি পড়েছিল তাদের অজান্তে। মশিউর রহমান যাদুমিয়া কমান্ডো সাথে নিয়ে উন্মুক্ত সীমান্তপথে ভারতে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু মওলানা সাহেবকে ছুতে পারেন নি। কারণ তিনি তখন ইন্দিরার ব্যক্তিগত মেহেমান হিসেবে দুর্ভেদ্য ছিলেন। এটাও ওপেন সিক্রেট। তবে রাজনীতিতে পলিটিক্স ঢুকে পড়ায় ইতিহাসের অনেক সোনালী সন্দেশ ষড়যন্ত্রের পাথরের তলায় চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু সত্যতো এটাই যে সত্য চিরকাল চাপা থাকেনা। একসময় না একসময় বেরিয়ে আসে।
২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ লালদিঘী ময়দানে সুবৃহৎ এক জনসভায় ২৪হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একাত্তরের চেতনায় শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলো।গুরুতর আহত হল শতাধিক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। সেটা কোন মামুলি ঘটনা হতে পারেনা। এটা তো একাত্তরেরই খন্ড চিত্র। তাই তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত। ধর্ম নিরপেক্ষতার সংগ্রাম আমাদের ইতিহসের সোনালী দিগন্তরেখা। দিবস পালনের মধ্যদিয়ে সেই তাৎপর্য তুলে ধরা দরকার।
২০ ও ২৪ মার্চ ১৯৬৯ বড়ই ঐতিহ্যবাহী দিন। মামুলি দলীয় কীর্তি বহনকারি যুগল দিবস না। শেখ মুজিবুর রহমানসহ “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তদের জেলের তালা ভেঙ্গে বের করে আনার শপথ উচ্চারণ করেই মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর তৈরি ইস্পাতের ফাওলাদ শিবপুরের বিপ্লবী কৃষক নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লবী ছাত্র ইউনিযন নেতা আসাদুজ্জামান মিসিলের অগ্রভাগে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর খুব কাছে ছিলেন ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতিদের একজন। তিনিই আমাকে ১৯৯৭ সালে বলেছেন সাবেক অওয়ামি লীগ নেতা মুজাফ্ফর হোসেন পল্টুর দৈনিক প্রভাত অফিসে বসে, যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা মাত্র হাত কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে নিজের পিস্তল তাক করে আসাদের বুকে গুলি মেরেছিল। তাঁর বর্ণনামতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিল তখন নওয়াবপুর রোডের রথখোলা মোড় অতিক্রম করছিল্। আসাদের আগে আর কোন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী বুক পেতে রাজপথের সংগ্রামে মৃত্যু বরণ করেছ বলে আমার জানা নেই। আসাদের মৃত্যুঝড়ে বক মরার মত ন্ া কিন্তু এখন কারও কারও লেখায় পড়ছি একথা যে মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে ঘটেছিল সেই গুলিবর্ষণের ঘটনা, যেমনটি ঘটেছিল ২১ ফেব্রুয়ারি ৫২। এতটুকু তথ্য বিভ্রাটও ইতিহাস বিকৃতির সহায়ক হতে পারে। আমি একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যকেই সত্য বলে মানবো। তবে ইতিহাসের রেকর্ড শুদ্ধ রাখার দায়িত্ব পালন করেন যারা তারা বিষয়টি দেখবেন বলে আমি আশা করি। আমি মনে করি, ঐতিহাসিক দিবস পালন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তার ভিতর দিয়েই প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায় ইতিহাসের সঠিক বার্তা।
৯১ নির্বাচনে ক্ষমতার সোনার হরিণ বেগম জিয়ার খোয়াড়ে আটক হল। অনেক চড়াই উৎরাই ডিঙ্গিয়ে ১৯৯৬ সালে মুজিব কন্যা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন। মিত্রশক্তির সহায়তা ছিল উভয় ক্ষেত্রেই প্রবল। ১৯৮৮ সালের ২৪ মার্চ হাসিনাকে মেরে ফেলতে পারলে ১৫ আগস্টের জল্লাদদের বিচার শেষ হ’ত না। কারও ফাঁসিও হ’ত না। আসল খুনিকে খুঁজে বের করার কোন প্রয়াসও কেউ পেতনা। হাসিনা ২০০১ অক্টোবরে ক্ষমতায় ফিরতে পারলেন না। ২০০৯ সালেও যদি তাঁর ক্ষমতায় ফেরা আটকে দেয়া যেত তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়ত কোনদিনও হতে
পারতো না। ইতিহাস তো আসলে পেঁয়াজের মত খোসায় খোসায় ঠাসা। একটা একটা করে পরতা সরিয়ে তার অন্তরে প্রবেশের প্রয়াস রাখলেই ফোঁটা ফোঁটা হয়ে অশ্রু ঝরে আর মধুর হারানো সুরগুলো শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে।