রাজনীতিতে বিকল্প অনুসন্ধান

আবু সাঈদ খান : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে দুটি মূল্যায়ন শোনা যাচ্ছে। একটি হচ্ছে- খালেদা জিয়ার দুর্নীতির ব্যাপারটা কেউ আমলে নিচ্ছে না। এটিকে জনগণ রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে দেখছে। ফলে তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি বাড়ছে। অপরটি হচ্ছে- দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। বিএনপি এখন নেতৃত্বশূন্য। ক্রমেই দলটি দুর্বল হয়ে পড়বে, জনপ্রিয়তা হারাবে।
যুক্তির খাতিরে ধরে নিই যে, যদি ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ¦ী দল দুটির একটি অতিমাত্রায় হীনবল হয়ে পড়ে, তখন রাজনীতি নতুন সংকটে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারসাম্য। প্রকৃতিতে যেমন ভারসাম্য দরকার, তা দরকার সমাজ ও রাজনীতিতেও। আমরা বিশ্ব রাজনীতিতে দেখেছি, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই পরাশক্তি ছিল, তখন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য ছিল। তার সুফল পেয়েছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষ করে মুক্তিকামী জাতিগুলো; যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে মুক্তির নিশান উড়িয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান অনন্য। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো দিয়ে পাকিস্তানি বর্বরতা রুখে দিয়েছিল, সোভিয়েতের হুমকিই চট্টগ্রাম অভিমুখী যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের যাত্রা থামিয়ে দিয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর বৈশ্বিক রাজনীতি ভারসাম্য হারায়। অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। বিশ্ব অসহায়ের মতো দেখল, মিথ্যা অভিযোগ এনে ইরাক ও লিবিয়াকে ক্ষতবিক্ষত করা হলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা যখন সিরিয়ার দিকে থাবা বাড়াল, রাশিয়া তখন বিশ্বশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো, সিরিয়ার পাশে দাঁড়াল। ফলে সিরিয়া রক্ষা পেল, ইরানও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তবে আজকের রাশিয়াকে কোনোক্রমেই সেদিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থানে বসানো যায় না। সোভিয়েত ইউনিয়নের যে মানবিক আদর্শ ছিল; তা আজকের রাশিয়ার নেই। রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদের ধারক।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছিল। তখন মুসলিম লীগ একক দল। পাকিস্তান আর মুসলিম লীগ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কোনো কিছু পরোয়া করছিল না। তবে ১৯৪৯ সালে ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া দাপটের মুখে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে প্রধান করে আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করেছিল। কংগ্রেসের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির কথা ভেবেছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু। তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণকে বিরোধী দল দাঁড় করানোর অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, প্রতিপক্ষ না থাকলে কংগ্রেস কোনো কিছু মানবে না। সে যা-ই হোক, পূর্ব পাকিস্তানে তখন মুসলিম লীগের বিকল্প আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়েছিল। আর আওয়ামী লীগ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিল মূল শক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিকল্প শক্তি যদি অগ্রসর চিন্তার হয়; তবে ক্ষমতার পালাবদলে দেশ ও সমাজ এগিয়ে যায়। আর সেটি যদি পশ্চাৎপদতার ধারক হয়, তবে দেশ ও সমাজ পিছিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ ছিল মুসলিম লীগের চেয়ে অগ্রসর চিন্তার ধারক। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি অগ্রসর চিন্তার রাষ্ট্র কায়েম হয়। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।
স্বাধীনতা-উত্তর বামদেরই আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় এবং ভাসানী ন্যাপের নানামুখী তৎপরতায় তা হলো না। তখন আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য। তবে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে তরুণদের একাংশ বেরিয়ে এসে জাসদ গঠন করে। অল্পদিনেই দলটি ক্ষমতাসীনদের বিকল্প বলে প্রতিভাত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ত্রিদলীয় জোট ও জাসদ উভয়ই ছিল সমাজতন্ত্রপন্থী। তখন বিতর্ক হতো সমাজতন্ত্র প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দৃশ্যপট বদলে দেয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ক্যান্টনমেন্ট। ক্যান্টনমেন্টের ছত্রছায়ায় গঠিত হয় বিএনপি। একইভাবে অভিন্ন আদর্শে গঠিত হয়েছে জাতীয় পার্টি। জিয়া সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছেন। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র নির্বাসিত করেছেন। এরশাদ তাকে অনুসরণ করেছেন এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছেন। এ দুই জেনারেলই মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের এক ছাতার নিচে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ মিলিয়েছিলেন, যা দল দুটি এখনও ধারণ করছে। তবে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপির ভাবমূর্তি উজ্জ¦ল হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পরিণত হন আপসহীন নেত্রীতে। আর পতিত স্বৈরশাসক এরশাদ রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির হাত ধরে। আজ এরশাদ ভোটের বিচারে তৃতীয় শক্তি।পঁচাত্তর-উত্তর আওয়ামী লীগও বদলে গেছে। সমাজতন্ত্র অভিমুখী অর্থনীতির কথা আর বলছে না। এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারক। উভয় দলই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করছে। তারপরও দেশ ও জাতির জন্য আওয়ামী লীগের কাছে যা আশা করি, তা বিএনপির কাছ থেকে আশা করি না। আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির কাছে কিছু আশা করার প্রশ্নই ওঠে না। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, সংবিধান থেকে নির্বাসিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছে। এসবের কিছুই বিএনপির সরকার করত না। বরং এসবের উল্টোটাই করত। বিরোধী দলে থেকেও দলটি যে ভূমিকা পালন করেছে তা হতাশাব্যঞ্জক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন জানায়নি। উপরন্তু সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির নিন্দা জানিয়েছে। এমন বাস্তবতায় বামরা নিঃসন্দেহে ভালো বিকল্প। তবে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তা সত্ত্বেও সরকার জাতীয় পার্টি বা জামায়াতকে যতটুকু সহ্য করে, বামদের ততটুকু সহ্য করে না। তাদের প্রতি অতিমাত্রায় খড়্গহস্ত। বাম নেতাকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছে তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা আন্দোলনে, যৌন নির্যাতনবিরোধী মিছিলে কিংবা ছাত্র সংসদ গঠন দাবির জমায়েতে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ক্ষমতাসীনদের চাওয়া ভিন্ন। তাদের পছন্দ এমন বিরোধী দল- যাদের মুক্তিযুদ্ধের শত্রু বলে গালি দেয়া যায়। তারা চায় মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র শক্তি হয়ে থাকতে।
সে যা-ই হোক, এখন রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি। ভারসাম্য রক্ষায় বিএনপিকে রাজনৈতিক কর্মকা-ের অধিকার দিতে হবে- তা হরণ করায় মঙ্গল নেই। আমাদের ভুললে চলবে না, যে সমাজে বাহাস নেই, বিতর্ক নেই; সে সমাজ নিষ্প্রাণ। আর সেখানে প্রাণের আলো দিতে চাই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। যদি বিরোধী পক্ষ সরব না থাকে, সমালোচনা না করে, তবে সরকারের ভুলত্রুটি ধরা পড়ে না। তখন ভালো সরকারও খারাপ হয়ে যায়, কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হতে পারে- বিরোধী দল যদি রাষ্ট্রীয় আদর্শের বৈরী হয়, তখন সে দলকে কি মোকাবেলা করা যাবে না? নিশ্চয়ই যাবে। তবে তা করতে হবে আদর্শিকভাবে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে; দমন-পীড়ন করে নয়।
সর্বোপরি আমরা চাই একাত্তরের চেতনার বাংলাদেশ। যেখানে সরকার ও বিরোধী দল দুই-ই হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিতর্ক হবে না। বিতর্ক হবে, আলোচনা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে; মুক্তিযুদ্ধ-বৈরী কোনো কর্মসূচি নিয়ে নয়।
লেখক : সাংবাদিক।