রাজনীতির এপিঠ ওপিঠ

মাহমুদ রেজা চৌধুরী : তৃতীয় মাত্রা, এপিসোড-৬২১৩, যা বাংলাদেশে ৬ আগস্ট ও নিউইয়র্কে ৫ আগস্ট প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। সাথে ছিলেন তরুণ ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান (পার্থ)। বিষয়বস্তু, রাজনীতির টানাপোড়েন প্রসঙ্গ।
আমাদের দুজনের রাজনীতিকে দেখার প্রেক্ষাপটটাই ছিল মূল আলোচনার বিষয়। সূচনা বক্তব্যে উল্লেখ করছি, রাজনীতির ছাত্র এবং রাজনীতিবিদেরা মূলত রাজনীতিটাকে দেখেন একটা ক্ষমতার বলয়ে। সেই জায়গা থেকে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি রাজনীতিকে দেখি সমাজ অবকাঠামোর এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরবিন্যাসের ভেতর দিয়ে যে সমাজদর্শন তৈরি হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে। এই প্রেক্ষাপটের সাথে জড়িত আমাদের উৎপাদন সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বোধ এবং শিক্ষার মাত্রা এবং এর মান।
ব্যারিস্টার আন্দালিব মনে করেন, রাজনীতিতে ক্ষমতার বিষয়টি কোনো মন্দের বিষয় নয়, বরং রাজনীতিতে ক্ষমতার বিষয়টি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। ব্যারিস্টার আন্দালিবের মতে, ভোটারদেরও একটা গুণগত মান এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জনসম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আন্দালিব বয়সে তরুণ কিন্তু তার বক্তব্য স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ। আন্দালিবের কথা বলার একটি বিশেষ গুণ, তার বাচনভঙ্গি এবং সেটার উপস্থাপনায় বিনয় বোধ সাথে যুক্তি উপস্থাপনা, যেটা নিঃসন্দেহে চৌকস ও আকর্ষণীয়। এ রকম আলোচকদের সাথে বসে কথা বলতেও ভালো লাগে, কিছু শেখা যায় যেমন তেমনি বুঝতে সুবিধা হয় আমাদের আগামী প্রজন্ম রাজনীতির গুণগত দিক নিয়ে কী এবং সেটা কীভাবে ভাবছে। সেই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যারা এখন তরুণ নই, তাদের কিছু কিছু ভাবনা শেয়ার করার একটা সুযোগ অথবা অবকাশ থাকে।
আজকের আলোচনার আরেকটি বিষয় ছিল সেটা রাজনীতিকে রাজনীতিবিদেরা যেভাবে ক্ষমতার বেষ্টনে দেখেন, সেখানে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রাজনীতিকে ‘ক্ষমতা’ চত্বরে না দেখে বরং মনে করি, এটা ক্ষমতার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটাকে আমরা ‘দায়িত্ব’, এই দৃষ্টিবোধের আলোকেও দেখতে পারি।
তরুণ প্রজন্মের চৌকস রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আন্দালিব অভিমত প্রকাশ করলেন, ক্ষমতা ও দায়িত্ব এ দুটি তার চিন্তায় আলাদা কিছু নয় বরং এর একটি অপরটিকে ওভারল্যাপ করে।
আন্দালিব হয়তো-বা ঠিক বলেছেন, কিন্তু আমি সেটা মনে করি না। তৃতীয় মাত্রার আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে বিশদ কিছু বলার সুযোগ ছিল না সময়ের স্বল্পতার কারণে প্রধানত। তাই ফেসবুকের দেয়ালে বা কথার এই আন্তর্জাতিক শপিংমলে এসে দু-একটি কথা এ বিষয়ে পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে শেয়ার করি।
আমার সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলেছি, যেহেতু রাজনীতি একটি সেবামূলক দর্শন, সেখানে ক্ষমতার বিষয়টি এলে ক্ষমতার সাথে যে একটি শক্তি প্রয়োগের ব্যাপার থাকে, সেটা যুক্ত হয়ে যায় অথবা যেতে পারে। তখন ব্যক্তি তার দায়িত্ব এবং কর্তব্যের চাইতে ক্ষমতার অতিব্যবহার অথবা ক্ষমতার ‘অপব্যবহার’ করার একধরনের সুযোগ পেতে পারেন। ব্যারিস্টার আন্দালিব মনে করেন, একজন মন্ত্রীকে যদি বলা হয় এই কাজটি আপনি করবেন, তখন তিনি যদি কাজটিকে তার দায়িত্ব মনে করেন, তখন যেভাবে কাজটি তিনি করতে পারেন তার চেয়ে বেশি করতে পারবেন যদি সেটাতে তার ভেতরে একধরনের ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিকতা তাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
হয়তো-বা সত্য। সত্য হলেও সেখানে আরেকটি সত্যের যোগ করা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে রাজনীতিতে সাধারণত ব্যক্তি অনুপ্রাণিত হয় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অথবা তার রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সে সেই রাজনীতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তাই সে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়।
রাজনীতিতে কেউ কাউকে জোর করে আনতে পারে না এবং রাজনীতি কোনো পেশা নয়। এটা সেবা। মানুষের সেবা। সমাজের সেবা। রাষ্ট্রের সেবা। আমরা অনেকে হয়তো বলতে পারি, এটি একটি কাল্পনিক আদর্শের অথবা চিন্তার কথা। বাস্তবে এ রকম ঘটে না।
বাস্তব তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। বাস্তবতা আমাদের দ্বারাই সৃষ্টি। কল্পনাবিলাস সব ক্ষেত্রে বাস্তব না হলেও আবার সব ক্ষেত্রে যে হবে না, এটাও কি ঠিক? অনেক ক্ষেত্রেই সেটা নির্ভর করে সে রকম কিছু আমরা চাই কি না সবাই মিলে।
তাই যেকোনো কিছু পছন্দ না হলেই যদি সেটাকে একটি আদর্শিক বা কল্পনা অথবা বাস্তব-বহির্ভূত বলে চিহ্নিত করি বা করতে চাই, সেই বলা বা ভাবনাটা কতটা যুক্তিপূর্ণ?
সেবামূলক দর্শন থেকে যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কেউ, তখন ব্যক্তির প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা থাকা উচিত যে আমি এই ক্ষেত্রে যা করব সেটা প্রধানত কর্তব্যবোধ এবং দায়িত্ববোধ থেকে করব। এই কর্তব্যবোধ এবং দায়িত্ববোধে নিজে দায়িত্বের কার্যক্রমকে ক্ষমতা না ভেবে যদি সেবা মনে করতে পারি অথবা দায়িত্ব মনে করি। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনীতির গতানুগতিক সংস্কৃতির সংস্কার হতেও পারে।
এই সংস্কারে রাজনীতির হাজার বছরের কী ধারা ছিল বা এখনো রাজনীতি সেই একই ধারায় আবর্তিত হবে। এটাই মডেল বা চূড়ান্ত মনে করে চললে প্রগতিশীল রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনা কঠিন।
রাজনীতির বিভিন্ন গুরুজনেরা রাজনীতিকে সব সময়ই একধরনের বাহ্যিক চাওয়া-পাওয়া এবং বস্তুগত চাহিদা মেটানোর মধ্যে এবং ক্ষমতা বিষয় নিয়ে এর পরিধি বৃদ্ধির ব্যাপারে অধিক উৎসাহ এবং বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনে গুরুত্ব দেন এবং দিচ্ছেন। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র মনে করেন, ‘রেজিম ইন্টারেস্ট’ বনাম ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ পার্থক্য থাকবে। বোঝাতে চান রাজনীতিতে রেজিম ইন্টারেস্ট বাস্তবে বেশি।
এটা রাজনীতির ধ্রুপদি সংজ্ঞা। এই ধরনের কৌশলী রাজনীতির পরিবর্তনের সময় এখন। অবশ্য যদি আমরা রাজনীতিকে মানবসেবার কিংবা সমাজসেবার বড় ক্ষেত্র বলে মনে করি। আদর্শিক স্থান বলে মনে করি। সেখানে রাজনীতি ‘ক্ষমতা’ নয়, দায়িত্ব এবং মানব অথবা সমাজসেবা। এ রকম চিন্তায় অনুপ্রাণিত হওয়া প্রয়োজন বেশি।
এটা অনস্বীকার্য যে আমরা যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অথবা সংস্কৃতির কথা বলি, সেটাও কিন্তু আদলে সমাজ এবং রাষ্ট্রে ব্যক্তি ও শাসকগোষ্ঠীর সেবামূলক কাজের প্রতি ইঙ্গিত করে। আধিপত্যবাদ কিংবা ক্ষমতার প্রতি নয়। এখানে ক্ষমতার যেই অংশ থাকে সেটা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তার সমবণ্টন। এর মাধ্যমে এক ইনক্লুসিভ রাজনীতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়ার কথা। এই কাজটি এখন কে করবে। নিঃসন্দেহে আমাদের আগামী প্রজন্মের সৎ, নিষ্ঠাবান, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। চৌকস এবং শিক্ষিত রাজনীতিবিদেরা।
ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান এখন এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একজন। আন্দালিব রহমানের মতো সাহসী তরুণ রাজনীতিবিদেরা যদি ‘মাইন্ড সেট’ করে নিতে পারেন যে রাজনীতিতে ক্ষমতা থাকতে পারে বা ক্ষমতা একটি লক্ষ্য হতে পারে কিন্তু তার চেয়ে বেশি লক্ষ্য হবে অথবা লক্ষ্য থাকবে মানুষের সেবা, বৈষম্য মুক্তির মধ্য দিয়ে সমাজসেবাকে অগ্রগামী করা, অগ্রাধিকার দেওয়া, অনুপ্রাণিত করা ও উৎসাহিত করা। রাজনীতিতে পাওয়ার চেয়ে দেওয়ার আবেদনকে নাগরিকদের মাঝে পৌঁছে দিতে পারলে রাজনীতি অনেকটাই ভেজালমুক্ত হতে পারে।
এই সেবাটুকুন দিতে বা করতে পার্লামেন্টের সদস্য অথবা মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে চেনা। স্থান পরিবেশ এবং বাস্তবতার আলোকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত যারা সেই সাধারণ নাগরিকদের নাড়ির টানকে বোঝা তাদের স্বপ্ন এবং তাদের চাওয়াকে বোঝা। আগামী রাজনীতির মৌলিক লক্ষ্য এ রকম হলে রাজনীতির গুণগত সংস্কার আশা করা যায়। হয়তো তাহলে আমরা আমাদের ঘুণে ধরা পশ্চাৎমুখী রাজনীতির বলয় থেকে নিজেদের ভবিষ্যতের পথকে কিছুটা পরিষ্কার আলোতে দেখতে পারব।
পৃথিবী বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। এই বদলানোর সময় প্রায় শত বছর হতে চলল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমরা যে রাজনীতির স্বার্থপরতাকে লক্ষ করেছি, একবিংশ শতাব্দীতে সেই একই লক্ষ্যে পথ চলতে থাকলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে কি না সন্দেহের অবকাশ রয়েছে প্রচুর। আমরা যদি পারি অথবা পেছন দিকে যদি তাকাতে হয়, তাহলে আমরা যেন অতীত রাজনীতির গুণগত দিকটা মাথায় রাখতে পারি। ওই সময়ের রাজনীতিতে যেটুকুনি বা সমাজসেবার দীক্ষা ও প্রেরণা ছিল, বস্তুর চাইতে বিষয় প্রাধান্য পেত, আদর্শিক একটা মূল্যবোধ কাজ করত, আজকে সেটা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাই ক্ষমতার চাইতে মানুষের সেবা এবং সমাজের সেবা যেকোনো বৈষম্য মুক্তির প্রয়োজনে যেন ভাবতে পারি। এই ভাবনার সারথি হবে আমাদের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের আরো অংশগ্রহণ এবং তাদের দেশাত্মবোধের সচেতনতাবোধ।
এই ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে সময় এবং কালের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্ত করার কাজটির সূচনা হতে পারে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে একটি করে ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ এ রকম একটি কোষ বা বিভাগের কাজ দিয়ে। তারা রাজনীতির ফ্রন্টলাইনে কাজ করবে না। রাজনীতিতে সম্মুখে যারা থাকবেন, নেতৃত্ব দেবে। ওনাদের পরামর্শ দেবে।
তাদের অনুসন্ধানের বিষয়গুলো তাদের বলে দেবে জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে এবং সাধারণ নাগরিকদের চাওয়া-পাওয়ার কোন কোন বিষয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে।
সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনীতি যদি এর বড় পরিসরে কোনো ‘গণউন্নতি’ অথবা ‘গণকল্যাণ’ সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়, কন্টিনিউ করতে ব্যর্থ হয়, সেই রাজনীতি দলনীতি বা নেতার নীতি হতে পারে কিন্তু গণনীতি বা গণতন্ত্র হবে কি? গুণীজনেরা ভালো বলতে পারবেন।
-লেখক : সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক।
৭ আগস্ট ২০২০, নিউইয়র্ক।
Email: [email protected]