রাজনীতির এ কেমন মেরুকরণ

এ কে এম শাহনাওয়াজ

দুর্বল চায় তার মাথার ওপর ছায়াদার বটবৃক্ষ থাকুক। নিজেকে রক্ষা করার আচ্ছাদন যেন। আমাদের রাজনীতিতে এখন ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাজনৈতিক দলগুলোর মাথার ওপর ছায়া দেয়ার মতো বটবৃক্ষের খুব অভাব।
তাই টিকে থাকার দায়ে নানা অঘাটায় মাথা লুকাতে গিয়ে জাত-মান-আদর্শ সবই বিকিয়ে দিতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি লেখায় আমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে প্রচারিত ক্ষুদ্র দলের বড় নেতারা অগত্যা ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করবেন বলে মনে হচ্ছে। এ লেখাটি পড়ে আমার প্রবাসী বন্ধু প্রতিবাদ জানিয়ে টেলিফোন করেছিল।
গণফোরামের প্রতি, বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় ড. কামাল হোসেনের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বললেন, বৃহত্তর স্বার্থে হয়তো বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করেছেন এ প্রবীণ নেতা। তাই বলে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি বা তার দলের কেউ নির্বাচন করবেন, এটি ভাবা যায় না।
তাহলে আর এত দিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের থাকল কী এ তো বিএনপিতে আত্তীকরণের নামান্তর। আমি বললাম এমন করে ভাবছ কেন, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার মহান ব্রত নিয়ে তারা এ পথে পা দিয়েছেন।
সুদূর প্রবাস থেকে একটি অদ্ভুত হাসির শব্দ ভেসে এলো টেলিফোনে। জামায়াত-বিএনপির বলয়ে ঢুকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার অমন কথা কৌতুক বলে মনে হল এ প্রবাসী বন্ধুটির।
আমি ভাবছি ধানের শীষ তো আর বটবৃক্ষ নয় যে সেখানে ছায়ার আশায় মাথা লুকানো যাবে। একজন পরিচিত কলামিস্ট ও আমার সহকর্মী বললেন, ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতার নাকি এ ছাড়া উপায় ছিল না। একজনের নাকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের রোষানল থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি এমপি হওয়ার একান্ত বাসনা আছে।
নিজ দল থেকে নির্বাচন করলে জামানত হারানোর সমূহ সম্ভাবনা। নিজ পরিচয় হারিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করলে জিতে গেলে তো বহুত আচ্ছা, না হলে অন্তত জামানত বাঁচবে। আরেকজন নাকি বড় ধরনের ঋণখেলাপি।
একটু দেরি করছিলেন সরকার ঋণ মার্জনা করে কাছে টেনে নেয় কিনা। সে সম্ভাবনা নাকচ হয়ে গেলে নিজ দলের বিশেষ প্রতীক বাক্সবন্দী করে ধানের শীষেই আশ্রয় নিয়েছেন। দেখে মনে হলো নির্বাচনে বিএনপি যদি তেমন সাফল্য নাও পায়, তবু এটুকু অর্জন কম কিছু নয় বলে সান্ত¦না পেতে পারেন। অন্য দিকে ধানের শীষে নির্বাচন করার পর নিজ কূলে এসে তেমনভাবে গুছিয়ে বসতে পারবেন বলে মনে হয় না।
শেষ পর্যন্ত হয়তো তারেক জিয়া বা খালেদা জিয়ার কাছেই রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হতে পারে। শুনলাম দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত তারেক জিয়া নাকি ধানের শীষ প্রার্থীদের ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এখন ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের হাতে ধানের শীষ থাকায় তারেক জিয়ার কাছে তাদেরও কি সাক্ষাৎকার দিতে হবে?
অন্যদের নিয়ে নয়, আমার ব্যক্তিগতভাবে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে কষ্ট হচ্ছে, যার একটি উজ্জ্বল অতীত রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা। বঙ্গবর স্নেহভাজন। তিনি এ বয়সে চেনা মুদ্রার অন্য পিঠে থাকা বিএনপির অক্টোপাস বলয়ে কেমন করে আটকে গেলেন কারা তাকে এ পথে ঠেলে দিলো? তিনি হয়তো কোনো কঠিন বাস্তবতার মুখে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গণফোরাম গঠন করেছিলেন। হয়তো তিনি বিশাল জনপ্রিয় দল গঠন করতে পারেননি।
কিন্তু নিজ অবস্থানে থেকেই বর্তমানের নীতিহীন বিপন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে জাতির বিবেকের ভূমিকা পালন করতে পারতেন। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, এমপি না হয়েও কি জনগণের মুখপাত্র হওয়া যেত না।
এখন প্রায় সময়েই জবানবন্দীতে বলছেন জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তারা ঐক্যফ্রন্ট গড়েছেন। কিন্তু এ মহান লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তারা তাদের ডিঙি বেঁধেছেন বিএনপি নামের মরচেধরা জাহাজের গায়ে।
ডিঙির কি শক্তি দিকহারা জাহাজকে তীরে নিয়ে আসে আর যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ভোটের অধিকারের লড়াইয়ের কথা বলছেন, এ জাহাজের কি তেমন পূত-পবিত্র ঐতিহ্য রয়েছে? এ দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগকে যদি তপ্ত কড়াই মনে করেন, বিএনপি কি তবে জ্বলন্ত উনুন নয়? ইতিহাস অস্বীকার করে যদি চোখ বন্ধ রাখি তাহলে না হয় অন্য কথা।
এ কারণে এখন অনেকেই মন্তব্য করতে পারছেন আসলে ক্ষমতার তীরে পৌঁছা তাদের ডিঙ্গির কম্ম নয় বলে জাত বিচার না করে অমন জাহাজেই রশি বাঁধতে হয়েছে। যদি জাহাজ তাদের তীরে পৌঁছে দিতে পারে। ঐক্যের নামে পাশে থেকে যারা শক্তি জোগাচ্ছেন তারাও কি সমলোচনার বাইরে থাকতে পারছেন? আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, অতি বাম ডান হলে তার চেয়ে বড় ডান আর কেউ হয় না।
তাই বিপন্ন রাজনীতির পরিবেশে যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জাতির আশার প্রতীক হতে পারতেন তাদের আচরণে-কথায় মনে হচ্ছে, বিএনপিতে নিজেদের আত্তীকরণ সম্পন্ন করেছেন তারা।
ঋণ মওকুফের তাড়া আর ব্যক্তিগত স্বার্থে যদি রাজনৈতিক আশ্রয়ে যেতে হয় তাহলে গণতন্ত্র ফেরানোর বড় বড় বুলির মূল্য কোথায়? গত কয়েক দিন টেলিভিশনে দেশের নানা অঞ্চল থেকে আসা বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থীদের মন্তব্য প্রচারিত হচ্ছিল।
সবার প্রায় অভিন্ন কথা, তারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়যুক্ত হয়ে বেগম জিয়াকে মুক্ত করবেন। অর্থাৎ এ নির্বাচনে বিএনপি নেতাকর্মীদের একটিই উদ্দেশ্য নির্বাচনে জিতে বেগম জিয়াকে মুক্ত করা।
বিএনপি ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতাও অভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন সাংবাদিকদের সামনে। কোথায় তাহলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দর্শন? বিএনপি সফল এ জন্য যে খালেদা জিয়ার মুক্তির সংগ্রামে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে পেয়েছেন।
ধরে নেয়া যাক, নির্বাচনে বিএনপি তথা ঐক্য জোটের ফলাফল আশানুরূপ হল না, তাহলে কী দশা হবে জাত-পরিচয় বিসর্জন দেয়া দলগুলোর নেতাদের, যারা দলের প্রতীকী পরিচয় নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে ধানের শীষের ছায়ায় মাথা রেখেছেন?
এরপর নিজ প্রতীকে ফিরবেন কেমন করে? দলের হাতেগোনা কর্মী সমর্থকদের হতাশা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? একটিই পথ থাকবে- হয় বিএনপির উত্তরীয় গায়ে দেয়া; নয়তো ২০ দলীয় জোটের সংখ্যা বাড়ানো।
আমাদের রাজনীতিকগণ নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে সেখানে ব্যক্তি ইমেজের কোনো মূল্য নেই। তৃণমূলের পোড়খাওয়া সৎ রাজনীতিক ভোটারের কাছে ঠিক মূল্যায়নই পেতেন। কিন্তু অর্থ-বিত্ত আর পেশিশক্তি ছাড়া যোগ্যতার মানদ-ে তারা হেরে যাচ্ছেন।
এর সঙ্গে এখন যোগ হচ্ছে সেলিব্রেটি ইমেজ। রাজনীতির সঙ্গে কোনো অতীত যোগাযোগ নেই। সুখে-দুঃখে দলকে এগিয়ে নেয়ায় কোনো ভূমিকা কখন রাখেননি তেমন খেলোয়াড়, চিত্রজগতের মানুষ, সঙ্গীতশিল্পী সবাই মনোনয়নের দৌড়ে আছেন।
তারা মনোনয়ন পেলে নির্বাচনী এলাকার দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতারা নিজেরাই শুধু ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাবেন না, এলাকার মানুষও হতাশ হবেন। তরুণ ভোটারদের একটি অংশের ভোট হয়তো সেলিব্রেটি ইমেজের কারণে তারা পেতে পারেন। অন্য ভোটারের মন কি আমরা জানতে চেয়েছি?
সম্ভবত গত নির্বাচনের আগে (হতে পারে স্থানীয় নির্বাচন) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোনো এক জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে বলেছেন, আপনারা প্রার্থীর দিকে তাকাবেন না। প্রার্থীকে নয়, ভোট দেবেন মার্কাকে। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি প্রার্থীকে গুরুত্ব না দেয়ায় অনেকে কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন। এর সরল ব্যাখ্যায় গিয়ে আমি লিখেছিলাম বক্তব্যটিকে একটু অন্যভাবে দেখলে তেমন খারাপ লাগবে না।
বুঝতে হবে কথাটি প্রধানমন্ত্রী নন দলীয় নেতাকর্মীদের সামনে দলীয়প্রধান বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তিনি দলীয় সংহতি রক্ষার জন্য অমন বক্তব্য দেন। কারণ প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতর কোন্দল হয় বেশি। এ সূত্রে সংঘাত-ভাঙন এসব নানা উপদ্রব যুক্ত হয়।
তাই আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা দলীয় ঐক্যের স্বার্থে দলের মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিকে বিনাবাক্যে মেনে নিতে বলেছেন বলেই মার্কার কথাটি এসেছে।
কথাটি লিখেছিলাম বটে, তবে মনের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব আমার কাটেনি। প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এখন মার্কাতেই আটকে আছে। জাতীয় নির্বাচনে মার্কার বিজয় হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মার্কাকে প্রাধান্য দেয়ার আড়ালে রাজনীতি ক্রমাগতভাবে রাজনীতিকদের হাতছাড়া হচ্ছে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অর্থের কাছে। আমলা আর ব্যবসায়ীরা ভুঁইফোড় রাজনীতিক হচ্ছেন আর বিপন্ন করে তুলছেন গণতান্ত্রিক কাঠামোকে।
দিন কয়েক আগে টেলিভিশনের এক টকশোতে একজন গণফোরাম নেতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনারা প্রতীক বিসর্জন দিয়ে এই যে ধানের শীষে মিশে গেলেন, এতে কি দলীয় আদর্শে কোনো সংকট হবে না?’ উত্তরে অত্যন্ত বাস্তব সত্য বললেন তিনি।
বললেন, এখনও আমাদের প্রতীক জনগণের কাছে সুপরিচিত নয়। এ অল্পসময়ে তা পরিচিত করানোও সম্ভব নয়। তাই আমরা মনে করি, ধানের শীষে দাঁড়ালে ভোটারের কাছে পৌঁছতে পারব সহজে। এ সত্য ভাষণ শুনে মনের ভেতর যা ঘোর ছিল তা কেটে গেল। এখন তাহলে এ সত্যটিই নিশ্চিত করতে হবেÑ জাত-পরিচয় খুইয়ে হলেও ক্ষমতার সিঁড়িতে পা রাখতেই হবে।
কথাটি শুনে পনেরো শতকে বাংলার ইতিহাসের একটি দৃশ্যচিত্র এক ঝলক ছুঁওয় গেল আমাকে। সোনারগাঁওয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মারা গেলে সিংহাসনে বসার মতো সবল উত্তরাধিকারী ছিল না। সে সময় সুলতানের হিন্দু মন্ত্রী রাজা গণেশ হিন্দু রাজত্ব ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করেন। এ লক্ষ্যে সিংহাসন দখল করেন তিনি।
প্রবল মুসলিমবিদ্বেষী গণেশ মুদ্রা জারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নানা ব্যবস্থাপনায় মুসলিম সংস্কৃতির উচ্ছেদ করতে থাকেন। এমন অবস্থায় পা-ুয়ার সুফি নূর কুতুব আলম বিহারের কাছে জৌনপুরের একমাত্র মুসলিম সুলতান ইব্রাহীম শর্কীকে বাংলার মুসলিম রাজ্য রক্ষার অনুরোধ জানান। আবেদনে সাড়া দিয়ে ইব্রাহীম শর্কী সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। এ সংবাদে ভীত হয়ে পড়েন রাজা গণেশ।
সামরিক শক্তিতে তিনি দুর্বল ছিলেন। তিনি তার বারো বছরের ছেলে যদুকে নিয়ে সুফির দরবারে যান। বলেন, একজন মুসলমানের হাতে রাজক্ষমতা দিলে তো আপনার আর আপত্তি থাকবে না। আপনি তাহলে যদুকে মুসলমান বানিয়ে তার হাতে রাজদ- তুলে দেন। এই যদুই হলেন পরবর্তীকালের বিখ্যাত সুলতান জালালউদ্দিন মোহাম্মদ শাহ।
আসলে ক্ষমতার লোভে অথবা বিপদে পড়লে জাত-কুল মান অনেকেই বিসর্জন দিতে পারেন। মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে গণেশের হিন্দু জাতীয়তাবাদ উত্থানের আদর্শিক চিন্তা একটি ভান ছিল মাত্র।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়