রাজনীতির ভুল শুধরানো যায় না

আজিজুর রহমান প্রিন্স : আগে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে কর্মী জোগাড় করতেন। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্টদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল, কমিউনিস্ট কর্মীরা নাস্তিক। তাই লেখাপড়া জানা নাহলে তাদের জায়গা হতো না বেশির ভাগ ঘরেই। যিতেন বোস নামের এক কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন, প্রায়ই আমাদের গ্রামে আসতেন। আমাদের গ্রামটি ছোট হলেও শিক্ষিত এবং আধুনিক হিসেবে পরিচিত ছিল মূলত দুটি কারণে। এক. ছেলেরা সংখ্যায় বেশি আর দুই. বেশির ভাগই তখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সময় শিক্ষিত ছেলেদের ন্যাপের প্রতি (সমাজতন্ত্র) আকর্ষণ ছিল নিজেকে শিক্ষিত প্রমাণ করার জন্য।
কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম অবিভক্ত ভারতে। দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানেও কমিউনিস্টরা তথ্য প্রচারে ব্যস্ত ছিল এবং তাদের গণভিত্তি মজবুত ছিল। যিতেন বোস ছিলেন উচ্চপর্যায়ের একজন কমিউনিস্ট নেতা এবং জ্যোতি বসুর (ভারতের) সহপাঠি। চিরকুমার যিতেন বোস কাঁধে একটি কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে চষে বেড়াতেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। রাত হলে শুয়ে পড়তেন যেখানে জায়গা মেলে। মাঝেমধ্যে কোনো বাড়ির গরুর ঘরেও খড় বিছিয়ে নির্বিঘ্নে নিদ্রা যাপন করেছেন। ছেলেদের পেলেই জড়ো করতেন আর রাজনীতির ক্লাস করাতেন। বোঝাতেন রাজনীতি কী আর কমিউনিস্ট দল কেমন দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মাঝেমধ্যে আমার বয়সীদেরও চকলেট দিয়ে আকর্ষণ করতেন। এমনই এক রাজনৈতিক ক্লাসে যিতেন বোস বললেন, ‘স্কুলের পরীক্ষায় ৩৩ পেলেই পাস করা যায়, কিন্তু রাজনীতিতে ৯৯ পেলেও ফেল হয়ে যাবে।’
যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক হতে হবে, ভুল হলে তা শুধরানোর সুযোগ নেই। ভুল করলেই ছিটকে পড়তে হয় লক্ষ্য থেকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কোনো ভুল করেননি, কিন্তু একটি ভুল তিনি করেছেন-বিশ্বাসঘাতক আর বেইমানদের চরিত্র জেনেও তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু আঘাতে নয়, ভালোবাসা দিয়ে বন্ধু করতে চেয়েছিলেন। সেই ভুলেই বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়েছেন সপরিবারে। অনেক তুখোড় নেতা ভুল করেছেন, দলের সাথে বেইমানি করে মন্ত্রী হয়েছেন। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি, আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ভুলের অমোঘ নিয়মে।
দল হিসেবে ভুল করেছে বিএনপি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাস করেছে, আগুন-সন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করেছে। নির্বাচনের ধারা থেকে সরে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্তে ছিটকে পড়েছে রাজনীতি থেকে। ভুল বুঝেও বদলায়নি, বরং তাদের নীতিকেই সঠিক প্রমাণ করতে আবার ভুল করেছে রাজনীতিতে। তা করেই দলটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বড় দলের এমন হটকারী সিদ্ধান্ত কর্মী বাহিনীকে হতাশ করে দূরে ঠেলে দেয়। বিএনপি এখন সেই ভুলেরই মাশুল গুনছে প্রতিদিন। জামায়াতের সাথে জোট বাঁধার খেসারতটি কম নয়, এখন বুঝেও সরাতে পারছে না জামায়াতকে। জামায়াতই এখন বিএনপিকে গ্রাস করে ফেলেছে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই ভুল করেননি। যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, কিন্তু ভুলে যাননি। এখনো যারা গোপনে/আবডালে স্বার্থের রাজনীতি করে, তাদেরকেও চিহ্নিত করে ফেলেছেন। স্বার্থপরদের সরিয়ে প্রকৃত জননন্দিত নেতৃত্বকে তুলে আনতে কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। করোনায় নৃত্য শুরু হয়েছিল দলে ঢোকা দুর্নীতিবাজ নেতাদের। দু-এক জায়গায় হানাও দিয়েছিল তারা, ধরা পড়ে গেছে। এখন লালঘরে সরকারি দানা হজম করছে নীরবে। বন্যার দুর্যোগে রা-টি করতে পারেনি দুর্নীতিবাজেরা। এখন শুধু ঘরের ইঁদুর মারছে, ইঁদুর বাইরেও আছে। ঘর পরিষ্কার করে খোঁজ পড়বে সবারই, তাই সাবধান। মুখেই গরম দেখান, ভেতরে দুরুদুরু অবস্থা সবারই।
-টরেন্টো, কানাডা।