রেমিট্যান্স প্রেরণে চ্যালেঞ্জের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের মানি এক্সচেঞ্জগুলো

ঠিকানা রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রে ইনফ্লাশন চলছে। মানুষের জীবনযাপনের খরচ বেড়েছে। আগের আয় দিয়ে চলা কঠিন হয়ে গেছে। স্বল্প আয়ের বেশির ভাগ পরিবার সংসারের বাজেট কাটছাঁট করেছে। এর পরও চলতে সমস্যা হচ্ছে। এত কিছুর পরও দেশে থাকা পরিবার, পরিজনকে এখান থেকে তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তবে রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানি এক্সচেঞ্জগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা বলেছেন, আমরা যে রেট দিচ্ছি, তার চেয়ে হুন্ডির বাজারে রেট বেশি। মানি এক্সচেঞ্জের চেয়ে হুন্ডিতে ডলারের বিপরীতে ব্যবধান প্রায় ৭-৮ টাকা। এ কারণে অনেকেই বৈধ পথে অর্থ না পাঠিয়ে হুন্ডিতে পাঠান। হুন্ডি বন্ধ করা হলে দেশে আরো বেশি পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠানো সম্ভব হতো। তারা আরো বলছেন, এখন চাইলেও আমরা বেশি রেট দিতে পারছি না। কারণ আমাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেট ধরেই কাজ করতে হচ্ছে। কোনো এক্সচেঞ্জ বেশি রেট দিলে দেশে অভিযোগ করা হয়। তখন ওই এক্সচেঞ্জকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এ কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে মানি এক্সচেঞ্জগুলোকে প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই চলতে হচ্ছে। গ্রাহক ধরে রাখার জন্য নানা পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ ওঠানামা করছে। গেল বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালে বিদেশ থেকে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রেমিট্যান্স পাঠানোর সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল জুলাই মাসে-২ হাজার ৯৬ কোটি ৩২ লাখ ডলার আর সর্বনিম্ন ছিল ফেব্রুয়ারিতে- ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৯ লাখ ডলার।
জানা গেছে, ২০২২ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা দেশে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্স পাঠান। ওই বছরের জুলাই মাসে ২ হাজার ৯৬ কোটি ৩২ লাখ ডলার, আগস্টে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৯৩ লাখ ডলার ও এপ্রিলে ২ হাজার ৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। এই তিন মাসে দুই হাজার কোটি ডলারের উপরে রেমিট্যান্স পাঠালেও আগে-পরে এই অঙ্ক কম ছিল। মে মাসে ১ হাজার ৮৮৫ কোটি ৩৪ লাখ ডলার, মার্চে তা আরো কমে ১ হাজার ৮৫৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, জুনে ১ হাজার ৮৩৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ১ হাজার ৭০৪ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার, নভেম্বরে ১ হাজার ৫৯৪ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৩৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার, অক্টোবরে ১ হাজার ৫২৫ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ও ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স যায় দেশে। অর্থাৎ বছরজুড়েই রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ ওঠানামা করে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি মালিকানাধীন মানি এক্সচেঞ্জগুলো থেকেও রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ ওঠানামা করছে। তারা বিভিন্নভাবে পুরোনো গ্রাহকদের ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন গ্রাহক তৈরি করতে চাইছে। এ জন্য দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জের ফিও মওকুফ করেছে। তবে যারা রেমিট্যান্স পাঠানোর ফি মওকুফ করেছে, তারা এক ধরনের রেট দিচ্ছে আর ফি দিয়ে পাঠালে অন্য ধরনের রেট অর্থাৎ এর চেয়ে বেশি রেট দিচ্ছে। এর পরও দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা তারা পূরণ করতে পারছে না।
এ ব্যাপারে একটি মানি এক্সচেঞ্জের সিইও বলেন, হুন্ডিতে রেমিট্যান্স প্রেরণে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। কারণ সেখানে মানি এক্সচেঞ্জের চেয়ে রেট বেশি। তাই অনেকেই দেশের কথা চিন্তা না করে কিছুু অর্থ বেশি পাওয়ার আশায় বৈধ পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে টাকা পাঠাচ্ছেন। কিন্তু প্রবাসে যারা আছেন, তাদেরকে চিন্তা করতে হবে, দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য হুন্ডির আশ্রয় না নিয়ে বৈধ পথে মানি এক্সচেঞ্জগুলোর মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর। এতে দেশের লাভ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে সোনালী এক্সচেঞ্জের সিইও দেবশ্রী মিত্র বলেন, আমরা এখন অনেকটাই চালেঞ্জের মুখে পড়েছি। আমরা চেষ্টা করছি সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে। তবে এখন ইনফ্লাশনের কারণে আমরা কাক্সিক্ষত পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছি না। আমরা নানা উপায় বের করেছি। সেই সব উপায়েও সফলতা আশানুরূপ আসছে না। তিনি বলেন, ২০২১ সালে ১৮৫ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলাম। ২০২২ সালে এটি ১২০ মিলিয়নে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে ছিল ১০২ মিলিয়ন। আমরা ২০২৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা এখনো ঠিক করতে পারিনি। স্বাভাবিক সময়ের মতো করেই ধরা হবে। মূলত দেখা যায়, যে বছর আমরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাই, এর চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি ধরে রেমিট্যান্স পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।
তিনি আরো বলেন, প্যান্ডামিকের সময় মানুষ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাওয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ বেশি ছিল। আমেরিকায় ইনফ্লাশনের কারণে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ এখন কিছুটা কমেছে। এটি আরো কমার শঙ্কা আছে। আমরা ফি ছাড়াই দেশে টাকা পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছি। এটি অব্যাহত থাকবে যত দিন পর্যন্ত আমরা রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ আরো বাড়াতে না পারছি। কাস্টমার ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে আমরা এটি করছি।
তিনি বলেন, আমরা সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি কাস্টমারদের সুবিধার জন্য অনেক কিছুুই করছি। ফি ছাড়া অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি বিকাশে সুযোগ রয়েছে। ব্লেজ সেবা রয়েছে। এর মাধ্যমে আগে সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকে টাকা পাঠালে সেটি পরের দিন নিতে পারত। এখন সেটি নেই। এখন দিনে দিনেই নিতে পারছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে সোনালী ব্যাংক ই-সেবা চালু করেছে। সোনালী ব্যাংক ই-ওয়ালেট চালু করেছে। আমরা কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনালী ব্যাংক ই-সেবা ও সোনালী ব্যাংক ই-ওয়ালেট চালু করব।
দেবশ্রী বলেন, আমাদের আরো একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে। এখানে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বেশি রেট দিলেও আমরা তা দিতে পারি না। আমাদেরকে দেশের সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কাস্টমারকে রেট দিতে হয়। সেই হিসেবে আমরা দেশের রেটেই এখান থেকে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছি।