রোমাঞ্চে ভরপুর স্টুডিও

চার দিক থেকে ভেসে আসে চিৎকার। ভয়, আতঙ্ক, কখনো বা উত্তেজনার। এই বুঝি মাথার ওপর ভেঙে পড়ল কোনো বাড়ি। কানের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে গুলি, কিংবা কোনো দানব এসে হানা দিচ্ছে গাড়িতে। নানা রকম উত্তেজনাপূর্ণ, মজাদার রাইড রয়েছে যে স্টুডিওতে তার নাম ইউনিভার্সাল স্টুডিও। যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসে অবস্থিত হলিউডের বিখ্যাত এই স্টুডিওটি। এটি বিশ্বের অন্যতম চমকপ্রদ থিমপার্ক। হলিউডের প্রাণ বলা হয় স্টুডিওটিকে। এই স্টুডিও নিয়েই আজকের আয়োজন। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

ইউনিভার্সাল পিকচার্সও আমেরিকাভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘এনবিসি ইউনিভার্সাল’-এর একটা সিনেমা প্রযোজনা সংস্থা। এর শুরুর নাম ছিল ইউনিভার্সাল ফিল্ম ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। শুরুর দিকে ইউনিভার্সাল প্রায় আড়াই শ’ নির্বাক ছবি নির্মাণ করে। ইউনিভার্সালের প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলোকে বলা হয়ে থাকে নাগরিক চলচ্চিত্র। ইউনিভার্সাল পিকচার্সের আওতাভুক্ত স্টুডিও হচ্ছে ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিও’। যা বিশ্বের সেরা স্টুডিওগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯১৫ সালে জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান ব্যবসায়ী কার্ল লেমলি এই স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। কার্ল লেমলি ইউনিভার্সাল পিকচার্সও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটা ১৯১২ সালে। ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চারটি থিম পার্ক রয়েছে বিশ্বব্যাপী। এর মধ্যে দুটি যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড আর অরল্যান্ডোতে, একটি জাপান আর অন্যটি সিঙ্গাপুরে।
স্টুডিও ট্যুর
স্টুডিওটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ঘুরে দেখানোর জন্য রয়েছে ট্যুর বাস। এই বাসে থাকে গাইড। তারা বর্ণনা করে কোন স্টুডিওতে, কিভাবে, কোন সিনেমার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। রয়েছে লাইভ শো। আর সেই লাইভ শো যদি হয় কোনো বিখ্যাত সিনেমার অংশ তবে তো মজা বেড়ে যায় আরও বহুগুণে। লাইভ শো দেখতে দেখতে হারিয়ে যেতে পারেন অন্য এক ভুবনে। রয়েছে বিখ্যাত সব সিনেমা অবলম্বনে তৈরি করা বিভিন্ন রাইড। পুরো স্টুডিও দুটি অংশে বিভক্ত। ‘ব্যাকলট’ এবং ‘ফ্রন্টলট’। বিশ্ববিখ্যাত সব মুভি যেমন সাইকো, ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস, ব্যাক টু দ্য ফিউচার, দ্য স্টিং, দ্য গ্রেট আউটডোর, হাই দ্য গ্রিনচ স্টোল ক্রিসমাসের দৃশ্য ধারণের ইতিহাস স্বচক্ষে দেখা যাবে এই ভ্রমণে। এই ট্যুরটির সময় লাগে ৪৫ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট। বাসে করে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হবে আরে এ দেখি নিউইয়র্ক শহর। বিভিন্ন সিনেমাতে নিউইয়র্কের দৃশ্যের শুটিং করার জন্য এ স্টুডিওটি নিয়মিত ব্যবহƒত হয়। এত চমৎকার করে খুব হালকা উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যা দেখলে যে কেউ অবাক হয়ে যেতে বাধ্য। হঠাৎ করে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সবাইকে। সেখান থেকে কোনো বাসের সবাই বেঁচে ফিরলে আবার হানা দিতে পারে তুষার ঝড়। পড়বেন ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের মধ্যে। চোখের সামনে দেখতে পাবেন আশপাশের সব কিছু ভেঙেচুরে যাচ্ছে। স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সেট রয়েছে সেখানে। ভাঙাচুরা, বিধ্বস্ত এক এলাকার মধ্য দিয়ে পাড়ি দিতে দিতে মনে পড়ে যেতে বাধ্য সেই বিখ্যাত সিনেমার দৃশ্যের কথা। শুধু স্পিলবার্গই নন, আলফ্রেড হিচকক, স্টিফেন সমার্স, পল গ্রিনগ্রাসের মতো অনেক পরিচালক কাজ করেছেন ইউনিভার্সালের সঙ্গে। পুরনো চলচ্চিত্র স্টুডিওগুলোর অন্যতম ইউনিভার্সাল। সেগুলোর আদলে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ছবির সেট। মামি, মি বিনস হলিডে, নাইট রাইডার, ব্যাক টু দি ফিউচার-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ব্যবহƒত গাড়িগুলোও নিজ চোখে দেখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেখানে। ঘুরতে ঘুরতে চলে যেতে পারেন রোমান্টিক সিনেমার দৃশ্য যে জায়গায় ধারণ করা হয় সেখানে। চার দিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে নিজেই রোমান্টিক হয়ে যাবেন সেই দৃশ্য দেখে। স্টুডিওটি ১৩টি ‘সিটি বøক’ নিয়ে চার একর জমির ওপর অবস্থিত।
থিম পার্ক
সাধারণ পার্কের সঙ্গে থিম পার্কের কিছু পার্থক্য থাকে। থিম পার্কে কোনো একটি থিম বা বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়। সেই অনুযায়ী পার্কটি তৈরি ও সাজানো হয়। পার্কে যেসব স্থাপনা ও রাইড থাকে সেগুলো সবই করা হয় সেই বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে রয়েছে তেমনি থিম পার্ক। এখানে বিভিন্ন বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সিনেমার আদলে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন থিম পার্ক।
এই পার্কটি দুইভাবে বিভক্ত। বা বলা যায় এর দুটো অংশ রয়েছে। একটি হলো আপার লট আরেকটি লোয়ার লট। এই পার্কে রয়েছে মোট ৯টি রাইড, সাতটি শো এবং শিশুদের জন্য বিশাল খেলার জায়গা। রয়েছে ৩০টিরও বেশি শপিংয়ের দোকান। রয়েছে ৩০টি খাবারের দোকান। ছয়টি নাইট ক্লাব। বাইরে য়েছে বিশাল আকারের ১৯টি বড় বড় স্ক্রিন ও মুভি থিয়েটার।

কিংকং ফিরেছে দুই বছর পর
২০০৮ সালে এই স্টুডিওতে আগুন লাগে। সেই সময় বেশ কিছু অংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জনপ্রিয় কিংকং থিম পার্ক।
তবে এর দুই বছর পর আবারও ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে ফিরেছে কিংকং। নতুন করে চালু হয়েছে লসএঞ্জেলেসে অবস্থিত ইউনিভার্সাল স্টুডিওর থিম পার্ক। নতুন কিংকং ফিরেছে উন্নততর থ্রিডি প্রযুক্তিতে। বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরনের ‘অবতার’ ছবিতে যে থ্রিডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিই এবার নিয়ে আসা হয়েছে কিংকং-এর থিমে। আড়াই মিনিটের এই রাইডে দর্শকরা চলে যাবেন সেই পুরনো জঙ্গলে। সেখানে তাদের চোখের সামনেই চলবে কিংকং ও ডাইনোসরের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই। কিংকং ছবির পরিচালক পিটার জ্যাকসন নতুন কিংকং থিমের ব্যাপারে বলেন, পাঁচ বছর আগে এই প্রযুক্তির কথা আমরা ভাবতেই পারতাম না। কিন্তু এখন কিংকং দেখে মনে হবে কেবল চোখের দেখাই নয়, শব্দ এবং এমনকি ছবির ঘ্রাণও যেন নিতে পারবেন রাইডের দর্শকরা।

হ্যারি পটার থিম পার্ক
হ্যারি পটার চলচ্চিত্র সিরিজটি ব্রিটিশ লেখিকা জে কে রাউলিং রচিত সাত খণ্ডের হ্যারি পটার উপন্যাস সিরিজের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত। সিরিজে বইয়ের সংখ্যা সাতটি হলেও, চলচ্চিত্র সংখ্যা আটটি। কারণ, সর্বশেষ বইটির কাহিনী অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ এবং জটিল হওয়ায় বইটি অবলম্বনে দুই
পর্বের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। চোখে গোল গোল চশমা লাগানো এক কিশোর। একটি গোপন স্কুলে জাদু শেখে সে। তার বাবা-মা নেই।
তবে আছে দুজন ভালো বন্ধু। তাদের নিয়েই শিহরণ জাগানো সব অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নেয় সে। নাম তার হ্যারি পটার। এই হ্যারি পটারকে নিয়ে থিম পার্ক বানিয়েছে ইউনিভার্সেল স্টুডিও। স্টুডিওগুলো হচ্ছে- অরল্যান্ডো, ফ্লোরিডা, হলিউড ও জাপানের ওসাকায়। স্টুডিওর নাম ‘দ্য উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড অফ হ্যারি পটার’। এতে রয়েছে বিভিন্ন অত্যাধুনিক রাইড এবং হ্যারি পটারে উল্লিখিত বিভিন্ন চরিত্রের বাস্তব রূপ। পার্কগুলোয় হগসমিড গ্রাম আর হগওয়্যার্টস ক্যাসল সৃষ্টি করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা একটি ‘জাদু বেঞ্চি’-তে চড়ে যা ঘুরে দেখতে পারেন। তবে এই বেঞ্চিতে চড়তে হলে অন্তত এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে।
জুরাসিক পার্ক
স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত ‘জুরাসিক পার্ক’। এই ছবির আদলে তৈরি করা হয়েছে থিম পার্ক। এখানে রয়েছে ডাইনোসরের বিশাল বিশাল মূর্তি। রয়েছে লেক ও গাছপালা দিয়ে সাজানো চমৎকার এক প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেই সঙ্গে রয়েছে চমকপ্রদ সব রাইড। এই সব রাইডে চলাকালীন হঠাৎ করে আক্রমণ করে বসতে পারে ভয়ংকর দানবীয় ডাইনোসর। সেখান থেকে বাঁচার বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে অবশেষে পৌঁছাতে পারবেন নিরাপদে। যারা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তারা জানেন এটা কতটা মজার। রাইডগুলোর পুরো আবহ এমনভাবে সৃষ্টি করা যেন জুরাসিক ওয়ার্ল্ডে হারিয়ে যাবেন নিমেষেই।
স্পেশাল ইফেক্ট স্টেজ
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে স্পেশাল ইফেক্ট স্টেজ। এখান থেকে চলচ্চিত্রে ব্যবহত বিভিন্ন স্পেশাল ইফেক্টের বিস্তারিত জানতে পারবেন দর্শনার্থীরা। কিভাবে পর্দায় থ্রিডি ফুটিয়ে তোলা হয়? সিজিআই কী? কিভাবে এর ব্যবহার করা হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি কেউ খুঁজতে যায় তবে তার অবশ্যই একবার এই স্টেজে ঢুঁ মারা উচিত। এ ছাড়া চলচ্চিত্রের অ্যাকশন দৃশ্যগুলো কিভাবে ধারণ করা হয়, কিভাবে ডাইনোসর পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ায় কিংবা কিভাবে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো হাঙরের হামলার মুখে পড়ে, কিভাবে গাড়ি চালনার নানা স্টান্ট ধারণ করা হয়, পর্দার পেছনের এসব কৌশল নিজ চোখে দেখে আসতে পারেন ইউনিভার্সাল স্টুডিও থেকে।
ওয়াটার ওয়ার্ল্ড
কেউ যদি সিনেমার দৃশ্যগুলো সরাসরি দেখতে চায় তবে এটিই মোক্ষম সুযোগ। এখানে রয়েছে ওয়ার্ল্ড জেট স্কি কৌশল, পাইরেটেকনিকস-সহ আরও অনেক কিছু। তবে এসব যে রাইডে চড়ে উপভোগ করবেন তার সামনে না বসাই ভালো। তা না হলে ভিজে যাওয়ার চান্স থাকে। এই ওয়াটার ওয়ার্ল্ড আসলে একটি স্টেইজ পারফরম্যান্স। যা সরাসরি চলে থাকে। ১৯৯৫ সালে কেভলিন রিনোল্ডাসের পরিচালনায় ব্যয়বহুল সিনেমা ওয়াটার ওয়ার্ল্ড-এর জনপ্রিয় অংশ নিয়ে এই শো চালু করা হয়। সিনেমার সেই দৃশ্যগুলোই ঘটবে চোখের সামনে। এ ছাড়াও রয়েছে রিভেঞ্জ অব দ্য মমি। সেখানে থাকে এক ঝাঁক ভূত। রাইডে শুরুর আগে থেকেই গা ছমছম শুরু হবে নানা রকমের ভৌতিক আওয়াজে। আর রাইডে যে কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জনপ্রিয় সিনেমা ট্রান্সফরমার হাই ডেফিনেশন থ্রিডি ফুটেজ এবং মুভিতে ব্যবহƒত ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, লাইট, সাইন ও অন্যান্য ফিচার দিয়ে তৈরি এ রাইড। এই রাইডটিও খুবই জনপ্রিয়। এর সবকিছুই মনে হবে বাস্তব। এক মুহূর্তের জন্যও মনে হবে না আপনি একটি রাইডে আছেন। হঠাৎ দেখা গেল আগুনের হল্কা এসে গায়ে লাগছে। পরমুহূর্তেই আবার ভিজে যাচ্ছেন। শাঁ শাঁ করে গুলি চলছে মাথার চারপাশ দিয়ে।
শিশুদের জন্য
কোথাও গডজিলা হাঁ করে আছে, আবার কোথাও এক সিংহ বুক টান করে দাঁড়িয়ে যেন হুঙ্কার ছাড়ছে আর শিশুরা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেই চমকে যাচ্ছে, শিহরিত হচ্ছে। শিশুদের জন্য সবথেকে জনপ্রিয় একটি অংশ হচ্ছে ইউনিভার্সাল এনিমেল অ্যাক্টরস-এর অংশ। এখানে রয়েছে প্রায় ২০ মিনিটের একটি শো। খুবই প্রশিক্ষিত এই প্রাণীগুলোর এই শো শিশুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই শো দেখার জন্য বাইরে থাকে বিশাল লম্বা লাইন। শিশুদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় শ্রেক। এই স্টুডিওতে দেখা যাবে শ্রেককে। তাও আবার থ্রিডি নয়, ফোর ডি। সত্যিকারের অনুভূতি পাওয়ার জন্য কখনো আপনার চেয়ার কাঁপতে থাকবে। কখনো বা পানির ঝাপটা এসে লাগবে চোখেমুখে। সিনেমায় ঘটা অংশগুলোই আপনার সঙ্গে ঘটতে থাকবে। মনে হবে আপনিও তাদেরই অংশ। শিশুদের কাছে শ্রেকের এই অংশগুলোও খুব জনপ্রিয়। এ ছাড়াও ‘সুপার সিলি ফানল্যান্ড’ রয়েছে। যা কি না সব বয়সের জন্য। এখানে পানি নিয়ে খেলার ৮০টি ভিন্ন রাইড।